তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিরপেক্ষ হবে?
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিরপেক্ষ হবে?।
  •  জুলাই সনদের বাছাইপ্রক্রিয়া বনাম উচ্চকক্ষের স্পিকারকে প্রধান করার প্রস্তাব
  •  সাংবিধানিক বৈধতা, রাজনৈতিক ঐকমত্য ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সংসদের উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাব। প্রস্তাবটির পক্ষে যুক্তি হলো, উচ্চকক্ষের স্পিকারকে কেন্দ্র করে একটি আগাম নির্ধারিত সাংবিধানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক দরকষাকষি ও অনিশ্চয়তা কমতে পারে। তবে এর বিপরীতে বড় প্রশ্ন উঠেছে- রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত একজন স্পিকার কিভাবে দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে নির্বাচনকালীন সরকারের নেতৃত্ব দেবেন?
সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, এর সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি, স্পিকার নিয়োগে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের প্রক্রিয়া- সব মিলিয়ে প্রস্তাবটি এখন সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু কে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন, তা নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং নিয়োগপদ্ধতি, প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের বিধানও স্পষ্ট করতে হবে।
গত ২৪ ও ২৫ অক্টোবর সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের একাধিক বিকল্প উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে- সংসদের উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা, সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচন, উচ্চকক্ষের মাধ্যমে ঐকমত্যের ভিত্তিতে উপদেষ্টা নিয়োগ এবং নিম্নকক্ষের সাথে উচ্চকক্ষের মেয়াদের পার্থক্য রাখা। বিকল্প হিসেবে স্পিকার বা ভাইস প্রেসিডেন্টকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান করার ধারণাও আলোচনায় এসেছে।
বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্যদিকে, জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের জন্য সংসদীয় বাছাইপ্রক্রিয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ফলে উচ্চকক্ষের স্পিকারকে প্রধান করার ধারণাটি বিদ্যমান প্রস্তাবের বিকল্প, নাকি এর সাথে সমন্বিত নতুন কাঠামো-তা এখনো স্পষ্ট নয়।
উচ্চকক্ষ গঠনেই নিরপেক্ষতার প্রশ্ন
প্রস্তাবটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে উচ্চকক্ষ কতটা প্রতিনিধিত্বশীল ও দলীয় প্রভাবমুক্তভাবে গঠিত হচ্ছে, তার ওপর। জুলাই জাতীয় সনদে জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের ধারণা রয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপি আসনসংখ্যার অনুপাতকে গুরুত্ব দিয়েছে। উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে এই মতপার্থক্য নিষ্পত্তি না হলে সেখান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্বাচনের প্রস্তাবও নতুন বিতর্কের মুখে পড়তে পারে।  উচ্চকক্ষের মেয়াদ নিম্নকক্ষের চেয়ে আলাদা রাখার পক্ষে যুক্তি হলো, জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের মেয়াদ শেষ হলেও উচ্চকক্ষ বহাল থাকতে পারে। এতে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের জন্য একটি কার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পাওয়া সম্ভব। কিন্তু উচ্চকক্ষের সদস্যরাও যদি দলীয় হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে নির্বাচিত হন এবং দলীয় নেতৃত্বের প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন, তাহলে কেবল দ্বিতীয় একটি কক্ষ গঠন করলেই নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হবে না।
স্পিকার নির্বাচনের পদ্ধতিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় স্পিকার নির্বাচিত হলে তার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচনের বিধান থাকলে কোনো পক্ষ সমঝোতায় রাজি না হওয়ার কারণে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, সমঝোতার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও সেই সমঝোতা নিশ্চিত করার কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
এখানে নিরপেক্ষতা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে নির্বাচিত হওয়া একজন ব্যক্তি গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারেন; কিন্তু প্রশাসন, পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের ওপর তার নেতৃত্ব কতটা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হবে, তা নির্ভর করবে সাংবিধানিক ক্ষমতা, আইনি সীমা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ওপর।
স্পিকার মডেলের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি
প্রস্তাবটির সমর্থকরা মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগের পদ্ধতি আগে থেকেই সংবিধানে নির্ধারিত থাকলে নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমবে। উচ্চকক্ষের মেয়াদ পৃথক হলে নির্বাচনকালীন সময়ে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সক্রিয় থাকবে। পাশাপাশি সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার এবং উপদেষ্টা নিয়োগের ব্যবস্থা করা গেলে একক দলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।
নিয়োগ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটিও সংবিধানে নির্দিষ্ট করা সম্ভব। এতে শেষ মুহূর্তের দরকষাকষি কিংবা নিয়োগসংক্রান্ত অচলাবস্থা মোকাবেলায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি হতে পারে।
তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, স্পিকারকে একই সাথে সংসদীয় দায়িত্ব ও নির্বাচনকালীন নির্বাহী নেতৃত্বের দায়িত্ব দিলে ভূমিকার সঙ্ঘাত তৈরি হতে পারে। স্পিকার সাধারণত সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে তাকে নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে হলে দুই ধরনের দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলে সেখান থেকে নির্বাচিত স্পিকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। সরকার ও বিরোধী দল প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগে একমত হতে না পারলে বিকল্প নিয়োগপদ্ধতি কী হবে, তা-ও নির্ধারণ করা জরুরি। রাষ্ট্রপতি বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষকে শেষ সিদ্ধান্তের ক্ষমতা দেয়া হলে সেই কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষতা নিয়েও নতুন বিতর্ক দেখা দিতে পারে।
অতএব, স্পিকার মডেলের সাফল্য শুধু নিয়োগপদ্ধতির ওপর নির্ভর করবে না; বরং স্পিকারের যোগ্যতা, রাজনৈতিক ভূমিকা, স্বার্থের সঙ্ঘাত, মেয়াদ, অপসারণ এবং নির্বাহী ক্ষমতার সীমা কতটা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, তার ওপরও নির্ভর করবে।
জুলাই সনদের বাছাইপ্রক্রিয়ার সাথে পার্থক্য
জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের জন্য সংসদীয় বাছাই কমিটির প্রস্তাব রয়েছে। এই পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে নাম আহ্বান এবং কমিটির আলোচনার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের কথা বলা হয়েছে।
দুই পদ্ধতির মৌলিক পার্থক্য হলো, স্পিকার মডেলে সংসদীয় একটি পদে নির্বাচিত ব্যক্তিই পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারেন। অন্যদিকে, বাছাই কমিটির পদ্ধতিতে স্পিকার হওয়া বাধ্যতামূলক নয়; নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে প্রার্থী বেছে নেয়ার সুযোগ থাকে।
স্পিকার মডেলে স্পিকার নির্বাচন ও উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ। বাছাই কমিটির মডেলেও ঐকমত্য প্রয়োজন হতে পারে, তবে সেখানে প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য পৃথক প্রক্রিয়া থাকে। ফলে উভয় ব্যবস্থারই সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
স্পিকার মডেলে প্রধান ঝুঁকি হলো, স্পিকারের দলীয় পরিচয় ও নির্বাহী দায়িত্বের মধ্যে সঙ্ঘাত তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, বাছাই কমিটির মডেলে প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে মতবিরোধ এবং একাধিক ধাপে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে অচলাবস্থার আশঙ্কা থাকে। তাই যে পদ্ধতিই গ্রহণ করা হোক, ঐকমত্যে পৌঁছানোর সময়সীমা, বিকল্প প্রার্থী বাছাই এবং সমঝোতা ব্যর্থ হলে করণীয় সংবিধানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
‘সংবিধান সংশোধন ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সম্ভব নয়’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের প্রশ্নে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল। পরে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বিলুপ্ত করা হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের পক্ষে রায় দেন।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী এ প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃসংযোজন করতে সংশোধনী প্রয়োজন। তার মতে, আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করতে হলে আগে সংবিধানে এ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যে ১৭টা সংশোধনী হয়েছে, তার প্রতিটি এক একটি সংবিধান।’ তার বক্তব্য, আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে সংবিধানে প্রয়োজনীয় বিধান যুক্ত করতে হবে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই আইনজীবী। তার মতে, নির্বাচনের আগে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করা হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো একই কাঠামোর মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হতে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের দেয়া ম্যান্ডেট কার্যকর থাকা অবস্থায় সংবিধান সংশোধনের জন্য নতুন কমিটি গঠনের ভিত্তি ও ম্যান্ডেট কী।
আবু হেনা রাজ্জাকীর মতে, শুধু কে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন, তা নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; বরং এমন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন, যাতে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, ব্যবস্থাটি তাকে নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখে।
উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, স্পিকার বা ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত কোনো ব্যক্তির অধীনে নির্বাচন হলে আগের বিতর্ক থেকে কিভাবে আলাদা পরিস্থিতি তৈরি হবে। তার মতে, নির্বাচন আয়োজন ও ফলাফল ঘোষণার বাইরে নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব সীমিত রাখা এবং জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া নতুন সঙ্কটের আশঙ্কা
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক নয়া দিগন্তকে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছয় থেকে সাতটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। তার মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সেই ঐকমত্যের ভিত্তি থেকে সরে যাওয়া উচিত হবে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর এ প্রশ্নে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। ফলে ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার পর এমন কোনো কাঠামো  তৈরি করা উচিত নয়, যেখানে দলীয় ব্যক্তিরা নির্দলীয় পদে বসে একই ধরনের বিতর্কের জন্ম দেন।
ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিকের মতে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো নিয়ে আস্থা ও ঐকমত্য থাকা জরুরি। বিশেষ করে কে প্রধান উপদেষ্টা হবেন, উপদেষ্টারা কিভাবে নিয়োগ পাবেন এবং নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো কেমন হবে- এসব বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর সুস্পষ্ট ভূমিকা থাকা উচিত।
তিনি বলেন, ‘এটা শাসক দলের ওপর ছেড়ে দেয়াটা ‘ওয়াইজ’ হবে না।’ তার মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে; এককভাবে ক্ষমতাসীন দলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
নিয়োগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার সীমা
সংশ্লিষ্ট বক্তব্য ও প্রস্তাবগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিতর্কটি কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, তা নিয়ে নয়। এর সাথে জড়িত রয়েছে নির্বাচনকালীন সরকারের ক্ষমতার সীমা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থা এবং সংবিধানের কার্যকারিতা।
উচ্চকক্ষের স্পিকারকে প্রধান করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে সংবিধানে অন্তত কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: স্পিকার বা প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের কর্তৃপক্ষ কে হবে; প্রার্থীর যোগ্যতা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার শর্ত কী হবে; মেয়াদ ও অপসারণের নিয়ম কী হবে; উচ্চকক্ষ কার্যকর না থাকলে বা মেয়াদ শেষ হলে বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে; নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ওপর প্রধান উপদেষ্টার ক্ষমতার সীমা কতটুকু থাকবে; এবং নির্বাচন শেষে ক্ষমতা হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা কী হবে।
নিয়োগ বা ক্ষমতা প্রয়োগ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে আদালতের পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে কোনো রাজনৈতিক পক্ষ সমঝোতা প্রত্যাখ্যান করলে কিভাবে অচলাবস্থা কাটানো হবে, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সবশেষে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন এবং নির্বাচনকালীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরভাবে নিরপেক্ষ রাখার ওপর। উচ্চকক্ষের স্পিকারকে প্রধান করার ধারণা একটি বিকল্প কাঠামো হতে পারে, কিন্তু উচ্চকক্ষের গঠন, স্পিকার নির্বাচনের পদ্ধতি ও নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নিয়ে সুস্পষ্ট বিধান না থাকলে এই প্রস্তাবও নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
তাই মূল চ্যালেঞ্জ শুধু একজন গ্রহণযোগ্য প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন নয়; বরং এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রধান ভরসা হয়ে উঠবে।

Advertisement