
কারণ :
- কর্মপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থান বাড়ছে না সমতালে
- শিক্ষিত বেকারত্ব ও দক্ষতার অমিল
- বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের দুর্বলতা
- প্রযুক্তি, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও কাজের ধরন বদলে যাওয়া
বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এক দিকে শিক্ষিত তরুণদের জন্য উপযুক্ত চাকরির অভাব, অন্য দিকে বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা, শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চাপ- সব মিলিয়ে শ্রমবাজারে তৈরি হয়েছে বহুমুখী সঙ্কট। এর সাথে যুক্ত হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নারীদের কর্মসংস্থানের বাধা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের অনিরাপদ কাজ। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান নীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মূল্যায়ন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদে’ বলেছে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে, বিনিয়োগ দুর্বল রয়েছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে; আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সঙ্কট ও রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতাকে অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
আইএমএফের মূল্যায়নে উঠে এসেছে শিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত কাজের সঙ্কট এবং শিক্ষা ও চাকরির চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য। অন্য দিকে এডিবি কারিগরি শিক্ষা, শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিন প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নের অভিন্ন বার্তা হলো, কেবল প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে বা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালিয়ে কর্মসংস্থান সঙ্কটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, শিল্পের বৈচিত্র্য, দক্ষতার সাথে চাকরির সংযোগ এবং বাস্তবে কতটি নতুন কাজ সৃষ্টি হচ্ছে তার নির্ভরযোগ্য হিসাব।
শ্রমবাজারের সঙ্কট কতটা গভীর?
বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকে শুধু বেকারত্বের হার দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। শ্রমবাজারের ওপর একই সাথে চারটি দিক থেকে চাপ তৈরি হচ্ছে- নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিহীনতা, শিক্ষিত তরুণদের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতার অভাব, বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যাওয়া। এর সাথে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আধিক্য (প্রায় ৮৪%) এবং বিদেশে শ্রমবাজারের অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে সঙ্কটটিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
এ পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো- অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি কি পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষের জন্য নিয়মিত, উৎপাদনশীল ও সম্মানজনক কাজ তৈরি করতে পারছে?
প্রথম চাপ : কর্মপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থান বাড়ছে না সমতালে
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রবেশ করছেন। কিন্তু নতুন কর্মপ্রার্থীদের তুলনায় উৎপাদনশীল ও নিয়মিত চাকরি তৈরির গতি অত্যন্ত ধীর। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এক কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করলেও নতুন চাকরি যুক্ত হয়েছিল মাত্র ৮৭ লাখ; অর্থাৎ নতুন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশের জন্য সমপরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি।
এখানে সঙ্কট শুধু চাকরি না পাওয়ার নয়, কাজের মানেরও। বিপুলসংখ্যক কর্মী অস্থায়ী কাজ করছেন, কেউ বাধ্য হয়ে স্বল্প আয়ের স্বনিয়োজনমূলক কাজে যুক্ত হচ্ছেন, আবার কেউ যোগ্যতার চেয়ে নিম্নমানের কাজ করছেন। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে তারা ‘কর্মরত’ হিসেবে গণ্য হলেও আয়, কর্মঘণ্টা ও কাজের নিরাপত্তার বিচারে তারা চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
দ্বিতীয় চাপ : শিক্ষিত বেকারত্ব ও দক্ষতার অমিল
শিক্ষা বিস্তারের ফলে দেশে উচ্চশিক্ষিত কর্মপ্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু অর্থনীতিতে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর উপযোগী চাকরির বাজার সেই অনুপাতে প্রসারিত হয়নি। আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্ব পুরুষদের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
এই ব্যবধানের প্রধান কারণগুলো হলো : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমের সাথে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চাহিদার অসামঞ্জস্য; কারিগরি, ডিজিটাল, যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ঘাটতি; অভিজ্ঞতাহীন নতুন স্নাতকদের জন্য প্রবেশপর্যাযের চাকরির সীমাবদ্ধতা; নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, অপ্রাতিষ্ঠানিক বাধা ও স্বজনপ্রীতি।
এর ফলে পরিবারগুলো শিক্ষায় বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেও প্রত্যাশিত আয় পাচ্ছে না। দীর্ঘকাল বেকার থাকার ফলে তরুণদের অর্জিত দক্ষতার অপচয় ঘটছে, যা তাদের মানসিক হতাশা ও আর্থিক নির্ভরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তৃতীয় চাপ : বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের দুর্বলতা
কর্মসংস্থানের মূল চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। কিন্তু নতুন কারখানা স্থাপন, ব্যবসার প্রসার ও সেবাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপ্তি না ঘটলে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হওয়া কঠিন।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী- দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান বাধা। এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (ঝগঊ) খাতগুলো অর্থায়ন সঙ্কট, দুর্বল অবকাঠামো ও জটিল নিয়ন্ত্রক বিধিমালার কারণে গতি পাচ্ছে না।
অন্য দিকে তৈরী পোশাকশিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। আইএমএফের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সেবা ও উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও এসব খাতে কর্মসংস্থানের অনুপাত কমেছে এবং কৃষিতে কর্মসংস্থানের নির্ভরতা সাময়িকভাবে বেড়েছে; অর্থাৎ অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হলেই যে সমপরিমাণ চাকরি তৈরি হবে- এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আধুনিক প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে অনেক ক্ষেত্রে কম শ্রমিক দিয়েই বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
চতুর্থ চাপ : প্রযুক্তি, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও কাজের ধরন বদলে যাওয়া
ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও), স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা এবং অনলাইন সেবা এক দিকে যেমন নতুন সুযোগ উন্মোচন করছে, অন্য দিকে প্রচলিত অনেক কাজের চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে পুনরাবৃত্তিমূলক প্রশাসনিক কাজ, সাধারণ তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সনাতন গ্রাহকসেবার কাজগুলো ঝুঁকিতে পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সুযোগ : সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডিজিটাল সেবা, লজিস্টিকস, আধুনিক কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তিভিত্তিক উৎপাদনে নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। ঝুঁকি : দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তির সাথে নিজেদের দক্ষ করতে না পারলে কম দক্ষ কর্মীরা বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন।
এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হ্রাস পাওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ওঠানামা শিল্প খাতের ব্যয় ও বিনিয়োগকে প্রভাবিত করতে পারে।
সঙ্কটের সাথে যুক্ত অতিরিক্ত দু’টি ঝুঁকি
নারীর কর্মসংস্থানে বাধা : নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থার অভাব, প্রতিকূল কর্মপরিবেশ, শিশুযতেœর (ঈযরষফপধৎব) সুবিধার ঘাটতি এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণকে সঙ্কুচিত করছে।
আয় ও নিরাপত্তার সঙ্কট : অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মীর কোনো সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যবীমা বা অবসরকালীন সুবিধা নেই। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় কর্মরত মানুষও আর্থিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
এডিবির পথ : দক্ষতা, শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ
এডিবির কর্মসূচিতে কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধানে দক্ষতা উন্নয়নকে শিল্পের বাস্তব চাহিদার সাথে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ সরকার ও এডিবি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা উন্নয়নে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করে।
এই কর্মসূচিতে যন্ত্রকৌশল, বিদ্যুৎ ও ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ এবং খাদ্য ও কৃষিভিত্তিক খাতে দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসূচির লক্ষ্য, অন্তত ১০ হাজার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষকের দক্ষতা বাড়ানো, যার মাধ্যমে আড়াই লাখের বেশি শিক্ষার্থী উপকৃত হতে পারেন।
সরকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা : বাস্তবতা কতদূর?
কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারের দৃশ্যমান পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ উন্নয়ন, ব্যবসায়িক সেবা সহজীকরণ, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ। ১৬ মার্চ ২০২৬ চারটি বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট সংস্থার জন্য ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করা এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগের পাইপলাইন সম্প্রসারণ।
ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ ২২ সেপ্টেম্বর কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি প্রকাশ করে জানায়, সম্ভাব্য বিনিয়োগের পাইপলাইন দাঁড়িয়েছে ১.৩ বিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বা বাস্তবায়ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে ১.৩ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ এবং এক লাখের বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশার কথাও জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া বন্দর আধুনিকায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এসব পদক্ষেপের সম্ভাব্য সুফল রয়েছে। নতুন শিল্পাঞ্চল, বন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো কার্যকর হলে উৎপাদন, রফতানি, পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা এবং সেবা খাতে কাজের সুযোগ বাড়তে পারে। কিন্তু সম্ভাব্য বিনিয়োগের অঙ্ককে বাস্তবে বিনিয়োগকৃত অর্থ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। একইভাবে প্রকল্পের সম্ভাব্য চাকরিকে বাস্তবে তৈরি হওয়া চাকরি হিসেবে দেখানোও সঠিক নয়।
একটি বিনিয়োগ প্রকল্পের কয়েকটি পৃথক ধাপ রয়েছে- আগ্রহ প্রকাশ, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত, অর্থ ছাড়, নির্মাণ, উৎপাদন শুরু ও কর্মী নিয়োগ। কর্মসংস্থানের প্রকৃত ফলাফল জানতে হলে প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি আলাদাভাবে প্রকাশ করতে হবে। সরকারের জন্য তাই বিনিয়োগের পাইপলাইন সম্প্রসারণের পাশাপাশি কতটি প্রকল্প চালু হয়েছে, কতজন নতুন কর্মী নিয়োগ পেয়েছেন এবং কতটি স্থায়ী চাকরি তৈরি হয়েছে- এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা জরুরি।
প্রবৃদ্ধি বাড়লেই কি চাকরি বাড়বে?
বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রবৃদ্ধি ও চাকরি সৃষ্টির সম্পর্ক। উৎপাদন বাড়লেও যদি উৎপাদনশীল খাতে কর্মসংস্থানের অংশ না বাড়ে, তাহলে নতুন কর্মপ্রার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি নাও হতে পারে।
প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন কিছু ক্ষেত্রে শ্রমের প্রয়োজন কমাতে পারে, আবার নতুন পেশা ও বাজারও সৃষ্টি করতে পারে। আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে বিভিন্ন পেশায় নিয়োগের চাহিদা পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তবে এ থেকে বাংলাদেশে কতটি চাকরি হারাবে বা সৃষ্টি হবে, তা সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না।
বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে প্রযুক্তিকে কর্মসংস্থানের বিকল্প হিসেবে না দেখে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা। এর জন্য শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা, প্রযুক্তি পরিচালনা এবং নতুন শিল্পে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
কর্মসংস্থান নীতিতে এখন কী করা প্রয়োজন?
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির মূল্যায়ন একত্র করলে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি অগ্রাধিকার সামনে আসে : ১. কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক বিনিয়োগ: তৈরী পোশাকের পাশাপাশি কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, পর্যটন ও ডিজিটাল সেবা খাতে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করা।
২. শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মেলবন্ধন : শিল্পের চাহিদানুযায়ী পাঠ্যক্রম সংস্কার, কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিস (অঢ়ঢ়ৎবহঃরপবংযরঢ়) কর্মসূচি এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া যৌথ উদ্যোগ বৃদ্ধি করা।
৩. ক্ষুদ্র ও মাঝারি (ঝগঊ) খাতের বিকাশ : সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে ছোট ব্যবসাগুলোকে দাঁড়াতে সাহায্য করা।
৪. নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি : নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সাশ্রয়ী শিশুযতœ কেন্দ্র স্থাপন এবং বৈষম্যহীন স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
৫. প্রযুক্তিগত রূপান্তরের প্রস্তুতি : শ্রমিকদের পুনরায় প্রশিক্ষণ প্রদান করা, যাতে প্রযুক্তি কর্মীর বিকল্প না হয়ে কর্মীর উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর হাতিয়ার হয়।
৬. কর্মসংস্থানের বস্তুনিষ্ঠ পরিমাপ : শুধু বেকারত্বের হার নয়; নিয়মিত নতুন চাকরি সৃষ্টির সংখ্যা, প্রকৃত মজুরি, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমশক্তি ও উচ্চশিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের সঠিক তথ্য প্রকাশ করা।
শেষ কথা
বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সঙ্কটের সমাধান শুধু শ্রমবাজারে আরো মানুষকে প্রবেশ করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রয়োজন উৎপাদনশীল, স্থায়ী ও সম্মানজনক কাজের সুযোগ বাড়ানো। বিশ্বব্যাংক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দুর্বলতাকে সামনে এনেছে, আইএমএফ শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব ও শিল্পের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার ওপর জোর দিয়েছে, আর এডিবি দক্ষতা উন্নয়ন ও শিল্পের চাহিদার মধ্যে সংযোগ তৈরিতে সহায়তা করছে।
সরকারের বিনিয়োগ ও প্রশিক্ষণ উদ্যোগ কর্মসংস্থানের ভিত্তি তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। তবে সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হবে- কতজন নতুন কাজ পেলেন, তাদের আয় ও কর্মপরিবেশ কতটা উন্নত হলো এবং শিক্ষিত তরুণ ও নারীদের জন্য কতটা টেকসই সুযোগ তৈরি হলো।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের বাস্তব উন্নতিতে রূপান্তর করতে পারলেই বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হবে; অন্যথায় শিক্ষিত তরুণদের প্রত্যাশা, বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান থেকেই যাবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








