সৌদি তুরস্ক পাকিস্তানের সাথে বৈঠকে ইরান

 নয়া দিগন্ত ডেস্ক

Advertisement

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশীদার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের একটি যৌথ প্রতিনিধি দল তেহরানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে বৈঠকে বসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান হাউছি হামলা ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার মধ্যে আঞ্চলিক সমন্বয়ের লক্ষ্যে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গতকাল সোমবার রয়টার্স এই খবর জানিয়েছে। বৈঠকে সৌদি আরবের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের পক্ষে অংশ নেন সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসীম মুনীর এবং তুরস্কের প্রতিনিধিত্ব করেন গোয়েন্দা প্রধান ইব্রাহিম কালিন। যৌথ প্রতিরক্ষা জোট গঠনের পর এই তিন দেশীয় ব্লকের সাথে ইরানের এটিই প্রথম উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠক।
সৌদি পাবলিক ডিপ্লোমেসির ডেপুটি মিনিস্টার রায়েদ ক্রিমলি সামাজিক মাধ্যম এক্সে জানান, ‘এই  সফরটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় মক্কা চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর মূল ভূমিকা এবং তা অর্জনে অঞ্চলের সব রাষ্ট্রের সাথে কাজ করার প্রতিশ্রুতিকে তুলে ধরে।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন, চলমান সঙ্কট প্রশমন ও কূটনৈতিক সমাধানের অংশ হিসেবেই এই আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ইরানের উচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের সহ-সম্পাদক আলী বাকেরি-কানি নিশ্চিত করেছিলেন, প্রতিনিধি দল তেহরানে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সাথে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনা করবে। গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসীম মুনীর ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে সাক্ষাতের সময় এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের প্রস্তাবটি ওঠে।
কানি এবং কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টায় গত জুনে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হলেও তা স্থায়ী হয়নি। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দিলে তার বিপরীতে ইরানও কড়া জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই আঞ্চলিক সঙ্ঘাত কমাতে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করল দেশগুলো।
ইরানে হামলার চাপ নেতানিয়াহুর, সায় দেননি ট্রাম্প
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা চালাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছিলেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হামলার অনুমোদন দেননি ট্রাম্প। ইসরাইলের এক নিরাপত্তা সূত্র সিএনএনকে জানান, নির্বাচনের আগেই ইরানে যৌথ হামলা চালানোর জন্য ট্রাম্পকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন নেতানিয়াহু। কিন্তু ট্রাম্প এতে সবুজ সঙ্কেত দেননি।
এর একটি কারণ হিসেবে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান এয়াল জামিরের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছেন ওই সূত্র। যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনকে জামির জানিয়েছিলেন, এ সময় ইরানে হামলা চালালে ইসরাইলের নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তা পিছিয়ে দেয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সিএনএনের আরেকটি সূত্রের দাবি, গত সপ্তাহেও ইরানে নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইসরাইল। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টাও চলছিল। তবে ট্রাম্পসহ জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরাইলকে আপাতত হামলা স্থগিত রাখতে বলেন। একইসাথে ভবিষ্যতে দুই দেশ যৌথভাবে অভিযান চালাতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তারা। সূত্রগুলোর মতে, ইসরাইল আপাতত হামলার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব্য যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হতে পারে। নেতানিয়াহু সম্প্রতি এক সামরিক অনুষ্ঠানে বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোই ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতি তার নির্দেশনা। তবে নতুন হামলার বিষয়ে ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।
রোববার মিশিগানে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে হোয়াইট হাউজ ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ইরানে হামলা চালানো হবে কিনা, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি উত্তর দিতে চান কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তার উত্তর হলো- না, কোনো হামলা হবে না। এর আগে রোববার দিনের প্রথম ভাগে ইরানকে লক্ষ্য করে আলটিমেটাম দেন ট্রাম্প। ওই বক্তব্যে একই দিনে দেশটিতে হামলার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের সাথে চুক্তি করা হবে, নাকি দেশটিকে পুরোপুরি নির্মূল করা হবে- এটাই এখন একমাত্র প্রশ্ন। এর আগে শনিবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে, অথবা দেশটির সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে ওয়াশিংটন। তবে তেহরান সম্ভাব্য কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।  
প্রস্তুত মার্কিন বাহিনী
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশ পাওয়ার ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা বাহিনী। দেশটির সামরিক কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন। সম্ভাব্য অভিযান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এবার হামলা হলে তা শুধু ইরানের রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র ও সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক স্থাপনা ও পারমাণবিক কেন্দ্র। এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘এটি বড় ধরনের অভিযান হবে।’ সংশ্লিষ্ট বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তার ধারণা, ট্রাম্প সামরিক অভিযানের অনুমোদন দেবেন কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- কবে তিনি সেই নির্দেশ দেবেন। তাদের ধারণা, চলতি বছরের শেষ হওয়ার আগেই অভিযান শুরুর নির্দেশ আসতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এ সম্ভাবনা বেশি।
পাল্টা হামলার আশঙ্কা
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের সামরিক বাহিনী এখন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি জানে। ফলে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা মার্কিন বাহিনীর জন্য কঠিন হতে পারে। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ও পেন্টাগন বিস্তৃত লক্ষ্যবস্তুর তালিকা তৈরি করছে। সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নতুন করে হামলা চালালে ইরান এবং ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীরা পাল্টা আঘাত হানতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও স্থাপনা ছাড়াও অন্য অঞ্চলে হামলার আশঙ্কা রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান মার্কিন কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি দেশে হামলার পরিকল্পনা উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও জানানো হয়েছে।
আলোচনায় আন্তরিক নয় যুক্তরাষ্ট্র : ইরান
ইরানের সাথে আলোচনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তেহরান। দেশটির অভিযোগ, কূটনৈতিক সমাধানের কথা বললেও ওয়াশিংটন বারবার নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। একইসাথে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন অভিযোগকে সামরিক আগ্রাসনের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে তেহরান। গতকাল সোমবার সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই। তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে। বাকাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার মিথ্যা দাবি করে আসছে। ২০২৫ সালের জুনে ইরানে মার্কিন হামলার কিছুদিন আগেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এটাকে আপনারা কী বলবেন? এই আচরণের মধ্যে কি কোনো সদিচ্ছা দেখতে পান?’ ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকারও সমালোচনা করেন ইরানের এই মুখপাত্র। তিনি জানান, রাজনৈতিক বিবৃতি ছাড়া আলোচনার বিষয়ে ইউরোপের পক্ষ থেকে নতুন কোনো প্রস্তাব পায়নি তেহরান।