
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইয়েমেনের হাউছিরা সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পরিবহন পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশন ও রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা চালানোর দাবি করেছে। গতকাল সোমবার গোষ্ঠীটি এ দাবি করে।
এর আগে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাজধানী সানায় দু’টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি কেন্দ্র থেকে রিয়াদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল বলে দাবি করে জোটটি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশেই প্রতিহত করা হয়েছে। তবে হাউছিদের দাবি করা হামলার বিষয়ে সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিশ্চিত বক্তব্য দেয়নি। খবর আলজাজিরার, রয়টার্স, আনাদোলুসহ বিভিন্ন সূত্রের।
ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা হাউছিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, বন্দর ও তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব বৃহত্তর আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের মধ্যে চাপের মুখে পড়েছে।
হাউছিরা আরো দাবি করেছে, তারা রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলা চালিয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে গোষ্ঠীটির দাবি করা এক হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার পর বিমানবন্দরটির দু’টি টার্মিনালে রোববার আবার কার্যক্রম শুরু হয়। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে ওই হামলাকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাতিল ৪ হাজারেরও বেশি ফ্লাইট
ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের লাগাতার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সৌদি আরবের রাজধানীর আকাশসীমা প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়েছে।
বিমান চলাচলসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘সিরিয়াম’-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৮ থেকে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নির্ধারিত চার হাজার ৭৩৬টি ফ্লাইটের মধ্যে চার হাজার ৭১টি; অর্থাৎ প্রায় ৮৬ শতাংশ ফ্লাইটই বাতিল করা হয়েছে। চলতি মাসে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি করেছে হাউছি। জেদ্দার পর সৌদির দ্বিতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বারবার হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে গত ১০ অক্টোবরের হামলায় ১৩ জন নিহত হন, যা গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। ১০ অক্টোবর থেকে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর রোববার শর্তসাপেক্ষে আংশিকভাবে তা আবার চালু করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
হাউছিদের পাঁচ সুড়ঙ্গ ও চার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে সৌদির হামলা
এ দিকে হাউছিদের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। এতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণের পাঁচটি সুড়ঙ্গ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের চারটি প্ল্যাটফর্ম ধ্বংস করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে জোট জানায়, সৌদি আরব ও ইয়েমেনে হাউছিদের অবকাঠামোয় হামলার পর হুমকির উৎস নিষ্ক্রিয় করতে এ সামরিক অভিযান চালানো হয়।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, হাউছিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্রের গুদামেও হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোর মধ্যে সরবরাহব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইয়েমেনের সম্মুখ সারিতে হাউছিদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, সদস্যদের সমাবেশস্থল এবং সামরিক সরঞ্জামও অভিযানের লক্ষ্যবস্তু ছিল বলে জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও দেশটির উত্তরাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায় হাউছিরা। একই সাথে ভবিষ্যৎ সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে এবং নিজেদের রাজনৈতিক স্বীকৃতি পেতে চায় তারা। নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর খুলে দেয়া, বাইরের সামরিক চাপ কমানো এবং ইয়েমেনের প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর প্রতি সৌদি সমর্থন সীমিত করাও তাদের লক্ষ্য। বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কাছে নিজেদের অবস্থান কাজে লাগিয়ে সামরিক শক্তি ও দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চায় তারা। সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা দেখানোর পাশাপাশি ইরানের সাথে কৌশলগত সম্পর্কও বজায় রাখতে চায় হাউছিরা। ইরানের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা পেলেও ইয়েমেন নিয়ে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে।
সৌদি আরবের প্রচলিত সামরিক শক্তির সাথে সরাসরি পাল্লা দিতে চায় না হাউছিরা; বরং দেশটির অর্থনীতিতে আঘাত হানা এবং স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য। বিমানবন্দর, তেলের পাইপলাইন, শোধনাগার ও জাহাজে তেল ওঠানো-নামানোর টার্মিনাল সৌদি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব স্থাপনায় হামলায় বিমান চলাচল ব্যাহত হতে পারে, নিরাপত্তা ব্যয় বাড়তে পারে এবং বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারেন। একই সাথে জ্বালানি রফতানিও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
১০ অক্টোবরের প্রাণঘাতী হামলার পর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। শনিবার হাউছিরা ইয়ানবু ও রাবিগের আশপাশের স্থাপনা এবং পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনসহ বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার দাবি করে। সৌদি কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। তবে এসব হামলায় স্থাপনাগুলোর কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হাউছিদের হামলা ঠেকাতে সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে স্থাপনাও বন্ধ রাখতে হয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








