হামলা মামলা আস্থাহীনতার চাপে পুলিশ
  • ৯ মাসে ৪৪২ পুলিশ আহত  
  • ২১ মাসে আহত ১ হাজার ৪৩ পুলিশ

মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা কমছেই না। কখনো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে যখম করা হচ্ছে তাদের। আবার  প্রকাশ্যে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। সড়কে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়েও বারবার মারধরের শিকার হতে হচ্ছে তাদের। 
এসব হামলায় সবচেয়ে বেশি মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে পুলিশ আহত হয়। এর মধ্যে অনেক পুলিশ সদস্য ‘মব’ সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। অনেক পুলিশ সদস্য শারীরিকভাবে গুরুতর জখম হন। 
পুলিশ সদর দফতরের মাসিক অপরাধমূলক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে পৃথক হামলার ঘটনায় ৪৪২ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। সেই হিসাবে প্রতি মাসে আহত হন ৪৫ জন। প্রতিদিন একজনের বেশি হামলার শিকার হয়েছেন। সম্প্রতি নিশংসভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন এক পরিদর্শক। 
এভাবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক হাজার ৪৩ পুলিশ সদস্য আহত হয়। এর মধ্যে গত বছরে হামলায় আহত হন ৬০১ পুলিশ সদস্য। 
হামলার ঘটনা তদন্তে পুলিশ সদর দফতর আলাদা অনুসন্ধান চালায়। এতে জানতে পেরেছে, সবচেয়ে বেশি মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে পুলিশ আহত হয়। এর মধ্যে অনেক পুলিশ সদস্য ‘মব’ সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। অনেক পুলিশ সদস্য শারীরিকভাবে গুরুতর জখম হন। এরই মধ্যে হামলার ঘটনায় সম্প্রতি নিশংসভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন এক পরিদর্শক । 
সর্বশেষ গত শনিবার রাজধানীর উত্তরা এলাকায় গার্মেন্টশ্রমিকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় ১৯ জন পুলিশ আহত হয়। এর মধ্যে দুই পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেয়া হয়। আগের দিন গাজীপুর জয়দেবপুর রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে দুই পুলিশ সদস্যকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে যখম করা হয়। মাদকসহ আটক দুই আসামি ছিনিয়ে নিতে এ হামলা চালানো হয়। এর কয়েকদিন আগে খুলনায় দায়িত্ব শেষে ফেরার পথে এক পুলিশ পরিদর্শককে চাপাতি দিয়ে কোপানো হয়। তার আগে নোয়াখালীতে মামলার তদন্তে গিয়ে হামলায় আহত হন পাঁচ পুলিশ সদস্য। এমনকি কয়েকদিন আগে বরিশালে থানায় ঢুকে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে আহত করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এসব ঘটনার পাশাপাশি সাভারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক আলতাফ হোসেনকে হত্যার ঘটনা পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করে তুলেছে। 
খুলনায় কর্মরত অবস্থায় ছিনতাইকারীদের হামলায় আহত পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো: শাহ আলম বর্তমানে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাকে দেখতে গত শুক্রবার ওই হাসপাতালে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) মো: আলী হোসেন ফকির। 
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, পুলিশের ওপর হামলা, ৫ আগস্ট পরবর্তী পুলিশের মধ্যে এক ধরনের হযবরল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি কিছু সদস্য দুর্নীতি, মাদক কারবার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে। এসব কারণে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ গ্রেফতারও করা হচ্ছে। 
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পুলিশ যদি হামলার শিকার হন তাহলে তার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরও পড়ে। এতে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থার সঙ্কট দেখা দিতে পারে। পুলিশকে হত্যা, রক্তাক্ত করা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। সেটা চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হতে। তা নাহলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে উঠতে পারে। 
এ বিষয়ে আইজিপি মো: আলী হোসেন ফকির গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশের হামলাকারীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে বিশেষ অভিযান চলছে। আমাদের একজন পুলিশ সদস্য খুলনায় দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার উভয় হাতের রগ কেটে যায়। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। 
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক বৈঠক হয়েছে। পুলিশ বাহিনীকে আরো গতিশীল এবং কার্যকর ও জনবান্ধব করতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনেরও উদ্যোগ নেয় সরকার। 
পুলিশ সদর দফতরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রাষ্ট্রদ্রোহ, ঘুষ, দুর্নীতিসহ পুলিশে মাদক সম্পৃক্ততার বদনাম ঘোচাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। সাম্প্রতিক সময়ে মাদকাসক্তির পরীক্ষায় ধরা পড়ে এর মধ্যে ১৬৫ জনের বেশি পুলিশ সদস্য বিভাগীয় শাস্তির আওতায় এসেছেন। 
শুধু সাম্প্রতিক সময়েই নয়, এর আগেও পুলিশের বিরুদ্ধে নানান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১৬ হাজার ৪১৮, তার আগের বছর ২০২০ সালে ১৫ হাজার ২১২,  ২০১৯ সালে ১৪ হাজার ৫১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে।

Advertisement