বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবেলায় কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন আনছে আইএমএফ


আশরাফুল ইসলাম, ব্যাংকক থেকে
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবেলায় নিজেদের কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সাথে স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে সহায়তা তিনগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের তৃতীয় দিনে গ্লোবাল পলিসি এজেন্ডা বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
জর্জিয়েভা বলেন, করোনা মহামারীর অভিঘাত কাটিয়ে ওঠার পর মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। এর সাথে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এ পরিস্থিতিতে দেশগুলোকে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে এবং সঙ্কট মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে।
আইএমএফ প্রধান বলেন, অর্থনীতিতে বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি হওয়ার আগেই সরকারগুলোকে রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি ব্যয় যৌক্তিক  পর্যায়ে নিয়ে আসা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি। একই সাথে পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
সংস্থাটি মনে করে, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর। তাই মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবেলায় নির্বিচারে ভর্তুকি বা ব্যাপকভিত্তিক সহায়তার পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট ও সাময়িক সহায়তা দেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। এতে সীমিত সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানো সম্ভব হবে।
স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে সহায়তা তিনগুণ বাড়ানোর উদ্যোগও বর্তমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এসব দেশের অনেকেরই রাজস্ব আয় সীমিত, ঋণের চাপ বেশি এবং বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবেলার সক্ষমতা তুলনামূলক দূর্বল। ফলে জ্বালানি ও খাদ্যের বাড়তি ব্যয় সামাল দেয়া এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো, প্রয়োজনীয় সংস্কারে সহায়তা দেয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে আইএমএফ।
বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর আরো চাপ তৈরি হতে পারে। তাই সঙ্কট মোকাবেলায় আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
ডিজিটাল অর্থায়নে সাইবার জালিয়াতি ঠেকাতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ‘ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্ট’
ডিজিটাল আর্থিক সেবায় সাইবার জালিয়াতি প্রতিরোধ, শনাক্ত ও মোকাবেলায় দেশগুলোকে সহায়তা করতে ‘ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্ট’ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। ব্যাংক অব থাইল্যান্ডের সাথে সমন্বয়ে তৈরি এ কাঠামোতে জালিয়াতি মোকাবেলায় ১২টি মূল বিবেচ্য বিষয় এবং পাঁচটি কৌশলগত স্তম্ভ তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ, আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা ও ভোক্তা সুরক্ষার মাধ্যমে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থা বাড়ানোই এর লক্ষ্য।
গতকাল বুধবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় এ ব্লুপ্রিন্ট প্রকাশ করা হয়। ১২ অক্টোবর শুরু হওয়া এ সম্মেলন চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। এতে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও অংশ নিচ্ছেন।
ব্লুপ্রিন্টে বলা হয়েছে, ডিজিটাল আর্থিক সেবা মানুষের অর্থায়নের সুযোগ, উদ্ভাবন ও কর্মদক্ষতা বাড়িয়েছে। তবে একই সাথে জালিয়াতির ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, বড় পরিসরে সংঘটিত হওয়া এবং অত্যাধুনিক কৌশল ব্যবহারের ঝুঁকিও বেড়েছে। এসব অপরাধ ক্রমেই আন্তসীমান্ত সংঘবদ্ধ অপরাধের সাথে যুক্ত হচ্ছে। ফলে শুধু একটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ ঝুঁকি মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ব্যাংক অব থাইল্যান্ডের গভর্নর ভিতাই রাতানাকর্ন বলেন, সাইবার জালিয়াতি এখন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, যা কোনো একক দেশ বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার, আস্থা বৃদ্ধি এবং সবার জন্য নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল আর্থিক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার যৌথ অঙ্গীকারের প্রতিফলন এ ব্লুপ্রিন্ট।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, আস্থাই যে কোনো আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি। ডিজিটাল অর্থব্যবস্থার বিস্তারের সাথে সাথে সাইবার জালিয়াতি মোকাবেলা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে সহায়ক প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে দেশগুলোকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
‘ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্ট’-এর পাঁচটি মূল স্তম্ভ হলো- কৌশলগত ও আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠা, জালিয়াতি প্রতিরোধের পুরো প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা, বিদ্যমান ঝুঁকি হ্রাস ও আইন প্রয়োগের কাঠামো কাজে লাগানো, অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা বাড়ানো এবং ভোক্তা সুরক্ষা ও সক্ষমতা জোরদার করা।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা অংশুলা কান্ত বলেন, উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে ডিজিটাল আর্থিক সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মানুষ যাতে নিরাপদে ও আস্থার সাথে এসব সেবা ব্যবহার করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে জালিয়াতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
ব্লুপ্রিন্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ই-কমার্স ও টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংঘটিত জালিয়াতির ঝুঁকিও গুরুত্ব পেয়েছে। এ ধরনের অপরাধ মোকাবেলায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সুস্পষ্ট জবাবদিহি এবং দ্রুত সহযোগিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
থাইল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী একনিটি নিটিথানপ্রাপাস বলেন, ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা যত বেশি আন্তঃসংযুক্ত হচ্ছে, জালিয়াতি মোকাবেলার উদ্যোগও তত বেশি সমন্বিত হওয়া প্রয়োজন। নাগরিকদের সুরক্ষা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রতি আস্থা বাড়াতে এ ব্লুপ্রিন্ট কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ব্লুপ্রিন্টের ১২টি বিবেচ্য বিষয়কে নিজস্ব আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও বাজার পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগের জন্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাগুলো। তাদের লক্ষ্য, ডিজিটাল আর্থিক সেবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই প্রবৃদ্ধি বাড়ানো।

Advertisement