এআই নির্ভর প্রবৃদ্ধিতে আর্থিক বাজারে বড় অস্থিরতার শঙ্কা

হামিদুল ইসলাম সরকার ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে

Advertisement

বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এ প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরকারি ঋণ বৃদ্ধি এবং ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়া নতুন অর্থনৈতিক সঙ্কটের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। একই সাথে এআই খাতে প্রত্যাশিত মুনাফা না এলে আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে উন্নয়নশীল দেশগুলো। বুধবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা ঘিরে প্রকাশিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও আর্থিক স্থিতিশীলতা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকি গুরুত্ব পেয়েছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির এই পূর্বাভাসের আড়ালে রয়েছে একাধিক অনিশ্চয়তা।
জুবিলি ইউএসএ নেটওয়ার্কের গতকাল প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক এরিক লেকম্পটে বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতির সামনে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আশাবাদী। তার মতে, এআই বিনিয়োগ নিয়ে প্রত্যাশা অতিরিক্ত আশাবাদী হলে বিনিয়োগ ও আর্থিক বাজারের পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এআই বিনিয়োগে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার এবং ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রযুক্তি খাতের এই সম্প্রসারণ বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও বাণিজ্যে গতি আনছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আইএমএফের উদ্বেগ হলো, এআই খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত আয় ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি না ঘটলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে। তখন প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের মূল্য কমে যাওয়া, বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে। এআইভিত্তিক প্রবৃদ্ধির সুবিধাও সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না। উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল অবকাঠামো রয়েছে- এমন দেশগুলো তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাচ্ছে। বিপরীতে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও বিনিয়োগের ঘাটতি থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলো পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ঋণের সুদ বাড়লে বাড়বে অর্থায়নের সঙ্কট
বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো সরকারি ঋণ ও ঋণ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে বিনিয়োগকারীরা সরকারকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বেশি সুদ দাবি করলে নতুন ঋণ নেয়া এবং পুরনো ঋণ পুনঃঅর্থায়ন- দু’টিই ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
এর প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজেটে সরাসরি পড়তে পারে। ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দের ওপর চাপ বাড়ে। যেসব দেশের রাজস্ব আয় কম এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি, তাদের পরিস্থিতি আরো কঠিন হতে পারে।
খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের চাপ
ঋণ ও সুদের পাশাপাশি খাদ্য এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য বিশ্ব অর্থনীতির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়ে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির সাথে আয় বৃদ্ধির অসামঞ্জস্য থাকলে নি¤œ ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। একই সাথে সরকারকে জ্বালানি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবেলায় অতিরিক্ত ব্যয় করতে হতে পারে। অথচ ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়লে এসব কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে।
এরিক লেকম্পটের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ ঋণ, মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্য ও জ্বালানির বাড়তি দাম মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব অর্থনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা
বৈশ্বিক অর্থনীতির এই ঝুঁকিগুলো বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণের সুদ ও পুনঃঅর্থায়ন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি দেশের আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সরকারি বাজেট ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর দিকে নজর দিলেই হবে না; প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াচ্ছে এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা জোরদার করছে- সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সাথে এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, সাইবার নিরাপত্তা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতার ঝুঁকি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
অর্থপাচার ও দুর্নীতি প্রতিরোধে নতুন তহবিল 
আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অর্থপাচার, দুর্নীতি, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও অবৈধ আর্থিক প্রবাহ মোকাবেলায় নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ লক্ষ্যে সংস্থাটি চালু করছে অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং অ্যান্ড অ্যান্টি-করাপশন থিমেটিক ফান্ড (এএমএলএসি)। বুধবার ব্যাংককে চলমান মহাসম্মেলনে আইএমএফ শীর্ষ কর্তারা জানান। এর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোকে আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতিজনিত অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলায় সহায়তা দেয়া হবে।
‘আইএমএফ সদস্য দেশগুলোর জন্য সক্ষমতা উন্নয়ন সহায়তার সম্প্রসারণ’ শীর্ষক আলোচনায় এই তথ্য প্রকাশ করে সংস্থাটির ফার্স্ট ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ড্যান কাটজ এতে বক্তব্য রাখেন।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই উদ্যোগের গুরুত্ব কয়েকটি জায়গায় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন শনাক্তকরণ, কর ফাঁকি ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ মোকাবেলা এবং দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কমানো। দেশ থেকে অর্থপাচারের ঝুঁকি মোকাবেলায় শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। আর্থিক লেনদেনের কার্যকর নজরদারি, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, তদন্তের সক্ষমতা এবং অপরাধলব্ধ সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের বিদ্যমান আর্থিক সততা কর্মসূচিতে এসব ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোকে কারিগরি সহায়তা দেয়ার নজির রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য আইএমএফের এই নতুন উদ্যোগের তাৎপর্যতাই শুধু আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি বাড়ানো এবং অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে দেশীয় সংস্কার কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।