
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর কাকরাইলের নাইটএঙ্গেল মোড়ে হামলায় তার ভাই মো: উবাইদুল হককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ডান পায়ের রগ কেটে দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন বোন মোছা: রোকসানা আক্তার। গুরুতর আহতাবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ভাই মারা যান।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেয়া জবানবন্দীতে এ কথা বলেন তিনি। ভাইয়ের ওপর হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন রোকসানা। তিনি তার ভাইসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের হত্যার বিচার দাবি করেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বাড্ডাসহ আশপাশের এলাকায় ২৩ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এ দিন সাক্ষ্য দেন রোকসানা আক্তার। মামলায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন আসামি। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কামরুল ইসলাম ও রাশেদ খান মেনন বিভিন্নভাবে উসকানি ও ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন।
জবানবন্দীতে রোকসানা আক্তার বলেন, তার ভাই উবাইদুল হক পেশায় গাড়িচালক ছিলেন। পাশাপাশি ১৪ থেকে ১৫ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে বাসা থেকে বের হয়ে বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। সারাদিন আন্দোলনে অংশ নিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ওই এলাকায় বহু মানুষের আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেন। সেদিন কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছেন বলেও জানান ভাই।
রোকসানার ভাষ্য অনুযায়ী, পরদিন ২০ জুলাই বেলা ১১টার দিকে তার ভাই আবার বাড্ডা এলাকায় আন্দোলনে যোগ দেন। সেদিনও বাসায় ফিরে বহু মানুষের হতাহত হওয়ার কথা জানান তিনি। ভাইকে তখন খুব আতঙ্কিত মনে হচ্ছিল। আগের দুই দিন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুলি চালিয়েছেন বলে ভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছিলেন রোকসানা। এসব ঘটনা শুনে তিনি নিজেও ভয় পেতেন এবং ভাইকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করতেন। তবে তার কথা না শুনে ভাই গোপনে আন্দোলনে যোগ দিতেন।
জবানবন্দীতে রোকসানা বলেন, ৪ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে তার ভাই অসংখ্য দলীয় নেতাকর্মীর সাথে নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে আন্দোলনে যোগ দেন। বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে কাকরাইলের নাইটিঙ্গেল মোড়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ সদস্যরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রোকসানার অভিযোগ, হামলার সময় তার ভাইয়ের কপাল ও হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। ডান পায়ের গোড়ালিতে কোপ দেয়ায় পায়ের রগ কেটে যায়। পিঠের ডান পাশেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। এ পর্যায়ে জবানবন্দী দিতে গিয়ে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।
আঘাতে অচেতন হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকলে ভাইয়ের সাথে থাকা লোকজন তাকে কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। রোকসানা জানান, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে তার ভাইয়ের ফোন ব্যবহার করে রাত আনুমানিক ৩টার দিকে তাকে কল দেয়া হয়েছিল। ঘুমিয়ে থাকায় তিনি ফোন ধরতে পারেননি। পরদিন ফজরের সময় মিসড কল দেখে ফিরতি ফোন করলে ভাইয়ের গুরুতর অবস্থার কথা জানানো হয় এবং তাকে হাসপাতালে যেতে বলা হয়।
খবর পেয়ে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে জরুরি বিভাগের আইসিইউতে ভাইকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান বলে জানান রোকসানা। তার ভাষ্য, ভাইয়ের নাক ও কান দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল, দুই চোখ কালো হয়ে ফুলে গিয়েছিল এবং কপালে ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল। হাসপাতালের মেঝেতে অসংখ্য গুলিবিদ্ধ লাশ ও আহত মানুষ দেখেছেন এবং মেঝে রক্তে ভেসে ছিল বলেও জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন তিনি।
রোকসানা বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২ আগস্ট দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে তার ভাই মারা যান। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ বিএনপির কার্যালয়ের সামনে নেয়া হলে সেখানে নামাজে জানাজা হয়। পরে তেজগাঁও থানার পেছনে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ১৩ আগস্ট রাত আনুমানিক ১১টার দিকে তারা লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। রাত আনুমানিক ৩টার দিকে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে পারিবারিক কবরস্থানে ভাইকে দাফন করেন।
জবানবন্দীতে রোকসানা আরো বলেন, পরবর্তী সময়ে টেলিভিশনের সংবাদে তিনি দেখেছেন, ১৯ জুলাই শেখ হাসিনার বাসভবনে ১৪ দলের একটি বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকে ওবায়দুল কাদের, কামরুল ইসলাম, রাশেদ খান মেননসহ আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে কারফিউ জারি এবং ছাত্রদের দেখামাত্র গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে তিনি টেলিভিশনের সংবাদে দেখেছেন। জবানবন্দীর সময় আসামিদের ডকে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করেন বলেও উল্লেখ রয়েছে।
ভাইসহ অন্যদের মৃত্যুর জন্য শেখ হাসিনা ও ওই বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিদের দায়ী করেন রোকসানা। তার অভিযোগ, তাদের নির্দেশে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও পুলিশ সদস্যরা তার ভাইসহ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছেন। তিনি ভাইসহ নিহত ব্যক্তিদের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন। শহীদদের সরকারি গেজেটে তার ভাইয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যার নম্বর ৬৪৩ বলেও জবানবন্দীতে জানান তিনি। মামলায় প্রসিকিউশনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হিসেবে কামরুল ইসলাম ও রাশেদ খান মেনন নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি কারফিউ জারিতে প্ররোচনা দেন। তাদের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড ও ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয় এবং এতে রাজধানীর বাড্ডাসহ আশপাশের এলাকায় ২৩ জন নিহত হন বলে অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন। এ ঘটনায় আরো অনেকে আহত হয়েছেন বলেও দাবি রাষ্ট্রপক্ষের।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








