
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর উত্তরায় মীর মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হাবিব হাসানসহ ২৬ জনের বিচার শুরু হয়েছে। গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেছেন এবং মামলায় প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৪ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন।
ঢাকা-১৮ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিব হাসানসহ ২৬ জন এ মামলার আসামি। তাদের মধ্যে আটজন গ্রেফতার রয়েছেন। রোববার তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অন্য আসামিরা পলাতক রয়েছেন।
ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। শুনানিতে গ্রেফতার আট আসামির উপস্থিতিতে তাদের বিরুদ্ধে আনা দু’টি অভিযোগ বাংলায় পড়ে শোনান বিচারপতি নজরুল ইসলাম। অভিযোগ শোনানোর পর আসামিদের কাছে তারা দোষী নাকি নির্দোষ, তা জানতে চাওয়া হয়। এ সময় তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন এবং ট্রাইব্যুনালের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। পরে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উত্তরায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আশপাশের এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতার আন্দোলন দমনে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) এমবিএ শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ সাতজন নিহত হন বলে প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, উবারচালক মোখলেছুর রহমান ওরফে দুর্জয়কে পুলিশের সাঁজোয়া যান- এপিসির চাকায় পিষ্ট করে হত্যার পর তার লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে তুরাগ নদীতে ফেলে দেয়া হয়। একই ঘটনায় মেহেদী হাসানসহ আরো পাঁচজনকে হত্যাচেষ্টার উদ্দেশ্যে গুলি করে গুরুতর আহত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগটি ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের ঘটনা নিয়ে। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন উত্তরায় আন্দোলনকারীদের ওপর আবারো নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে রিদোয়ান শরীফ রিয়াদ জয়সহ চারজন নিহত হন। এ ছাড়া রাইসুল রহমান রাতুলকে হত্যাচেষ্টার উদ্দেশ্যে গুলি করে গুরুতর আহত করার অভিযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশন বলেছে, ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ের এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন অপরাধ ছিল না; বরং পরিকল্পিত, ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। রোববার অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচার শুরু হয়েছে; আসামিদের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়।
এ মামলায় গ্রেফতার আটজনকে রোববার সকালে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মির্জা সালাহউদ্দিন, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: মজিবুর রহমান, আজমপুর পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক কনস্টেবল মো: হোসেন আলী, উত্তরা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনোয়ার ইসলাম চৌধুরী রবিন, যুবলীগ সভাপতি মো: দেলোয়ার হোসেন রুবেল, আওয়ামী লীগ নেতা মো: সোহেল রানা, ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি মো: শাহ আলম এবং তুরাগ থানা এলাকার আওয়ামী লীগ কর্মী মো: ইরফানুল হক গাজী। অভিযোগ গঠনের সময় তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। এরপর ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ করেন।
মামলার বাকি ১৮ আসামির মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য হাবিব হাসান, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির উত্তরা বিভাগের সাবেক উপকমিশনার কাজী আশরাফুল আজীম, উত্তরা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো: তোহিদুল ইসলাম এবং সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার সুমন কর। এ ছাড়া পলাতক আসামিদের তালিকায় রয়েছেন উত্তরা পশ্চিম থানার সাবেক ওসি বিএম ফরমান আলী, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশনস) মাহমুদুল হাসান, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক কনস্টেবল মো: আবু ছায়েম, আওয়ামী লীগ নেতা মো: আলাউদ্দিন আল সোহেল, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর হোসেন, মো: ফরিদ আহমেদ, ডিএম শামীম, মো: আনিছুর রহমান নাঈম এবং মো: আফছার উদ্দিন খান।
তালিকার অন্য আসামিরা হলেন- উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক উপপরিদর্শক খালেদ আনোয়ার, সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক মো: রোকনুজ্জামান, উত্তরা পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মুরতাফা বিন ওমর এবং তুরাগ থানা আওয়ামী লীগের যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচার সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে এগোবে।
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর মামলাটিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দেয়ার জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ অসুস্থ থাকায় সেদিন কার্যক্রম পিছিয়ে দেয়া হয়। পরে রোববার, ১১ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের দিন নির্ধারণ করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় রোববার ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। আগামী ৪ নভেম্বর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন এবং সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে। শুনানিতে প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মার্জিনা রায়হান, তারেক আবদুল্লাহ, মঈনুল করিম ও সহিদুল ইসলাম সরদারসহ প্রসিকিউশনের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। আসামিপক্ষে আইনজীবী সুলতান মাহমুদ, আবুল হাসান এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা ছিলেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে করা মামলাটিতে এখন সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের পালা। আগামী ৪ নভেম্বর থেকে সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর বিচারিক মূল্যায়ন শুরু হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








