
‘আসলে ফ্রি ভিসা বলতে অফিসিয়ালি এই নামে কোনো ভিসাই নেই। এটা ¯্রফে প্রবাসে থাকা স্থানীয় বাংলাদেশী ও তাদের এদেশীয় দালালদের বানানো একটি নাম। তারপরও প্রলোভনে পড়ে এই ভিসাতেই প্রতিদিন সৌদি আরব, কাতার, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শত শত শ্রমিক পাড়ি দিচ্ছেন। তিন মাস মেয়াদি এই ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই তাদের আসল বিপদ শুরু হয়। তখন উপায় না পেয়ে কাউকে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আসতে হচ্ছে, আবার কাউকে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেল (সফর) খেটে খালি হাতেই দেশে ফিরে আসতে হচ্ছে। তখন এই শ্রমিকরাই বিদেশে অবস্থানের সময় নতুবা দেশে থাকা তাদের পরিবারকে দিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক বা প্রসেসিং করা এজেন্সির বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকা অভিবাসনব্যয় হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ দিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা দাবি করছে।
গতকাল রোববার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অভিবাসন ব্যয় সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করছেন এমন একাধিক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে নাম না প্রকাশের শর্তে এসব তথ্য জানান।
এ প্রসঙ্গে জানতে গতকাল দুপুরের আগে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মোখতার আহমেদের বক্তব্য নিতে তার দফতরে গেলে তার একান্ত সচিব (সিনিয়র সহকারী সচিব) মো: তরিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তের প্রতিবেদককে জানান, স্যার সকাল থেকে মিটিংয়ে আছেন। এই মুহূর্তে স্যারের সাথে দেখা করানো যাচ্ছে না।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনাল সংশ্লিষ্ট ও প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক সূত্রে জানা গেছে গত এক মাসে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে, মালয়েশিয়া, ইরাক ও ইউরোপে সাগরপথসহ নানাভাবে পাড়ি জমানো কর্মীরা দেশে ফিরেছেন। তারা বিমানবন্দরে নেমে তাদের এজেন্সি ও দালাল দ্বারা প্রতারিত হওয়ার গল্প গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরছেন। এর মধ্যে কেউ দাবি করেছেন, লিবিয়া গিয়ে কিডন্যাপারের খপ্পরে পড়ে ৪০ লাখ টাকা খরচ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব, আবুধাবি, কুয়েত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যে এমনকি ইউরোপের দেশ সার্বিয়া, মলদোভাসহ অন্যান্য দেশগুলোতে কর্মী যাওয়ার হার গত বছরের তুলনায় অনেক কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মী কমার অন্যতম কারণ হচ্ছে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হওয়া। যদিও প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর চাচ্ছেন, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ শ্রমবান্ধব দেশগুলোতে দক্ষতা অর্জনের পর কর্মী কম যাক, তবুও যাতে অতিরিক্ত বা উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ে কেউ কোনো দেশে না যায় সেটি তিনি নিশ্চিত করতে চাচ্ছেন। ইতোমধ্যে তিনি তার মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ সবাইকে নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ‘ফ্রি ভিসার’ নামে যা হচ্ছে সে বিষয়ে বলেন, আমরা এখানে দায়িত্বে আসার আগে সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার উইংয়ে কাজ করেছি। তখন দেখেছি ফ্রি ভিসার নামে কিভাবে বাংলাদেশীদের জন্য বাাংলাদেশী পুরনো শ্রমিকরা ভিসা সংগ্রহ করতেন। মূলত এই ভিসাটা সৌদি সরকার দিচ্ছে তার দেশের নাগরিকদেরকে। কিন্তু একটা সময় এই ভিসাকে সৌদি নাগরিকরা ব্যবসা হিসাবে গ্রহণ করে। যেমন সৌদি আরব সরকার তার দেশে একজন নাগরিকের জন্য কাজের সুবিধার্থে চারজন কর্মচারী নিয়োগের কোটা দেয়ার কার্যক্রম চালু করে। কিন্তু তারা এই কর্মী কোথায় পাবে? তখন তারা এটার নাম দিলো ‘ফ্রি ভিসা’। ফ্রি ভিসা তো বিক্রি করা যাবে না। তখন এই ভিসা সৌদি আরবে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদেরকে টাগের্ট করে তাদের কাছে বিক্রি শুরু করে সৌদিয়ানরা। যদিও এই ভিসা সংগ্রহের নিয়ম হচ্ছে ‘ফাস্ট ব্লাড’ যারা শুধু তাদের জন্য। যেমন বাবা, ছেলে, মেয়ে বা পরিবারের নামে ভিসা ইস্যু হবে। এটিকেই আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশীরা সৌদি নাগরিকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট দামে কিনে নিয়ে সেটি বিক্রি করে বেশি দামে। সেই ভিসাই বাংলাদেশে আসার পর নাম হয়ে যাচ্ছে ‘ফ্রি ভিসা’। এরপরই এ ভিসা নিয়ে দালালরা যে যেভাবে পারছে কর্মী পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকার ব্যবসা করছে। মূলত সৌদি সরকার তিন মাসের জন্য তার দেশ ভ্রমণ করার জন্য অনলাইন ভিসা ইস্যু করছে। তিন মাস পর ওই ভিসাধারী বিদেশীদের অবশ্যই নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু তারা সেখানে যাওয়ার পর ফিরে না এসে কাজ শুরু করে দিচ্ছে। এই অনলাইন ভিসাকেই দালালরা ওয়ার্ক ভিসা বলে চালিয়ে দিচ্ছে। আর এই ভিসায় (একক) যেতে জনশক্তি ব্যুরোর বহির্গমন ছাড়পত্র পেতে কোনো অসুবিধা হয় না। এই সুযোগে ফ্রি ভিসার নামে প্রসেসিং করে শত শত কর্মী দেশটিতে প্রতিনিয়ত পাড়ি জমাচ্ছে। যাওয়ার পর তাদের বেশির ভাগই আকামা নবায়ন করাতে হিমশিম খাচ্ছে। কাজ পাচ্ছে না। কাজ পেলেও প্রকাশ্যে কাজ করতে পারছে না। লুকিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। এসব কর্মীই সেখানে থাকা অবস্থায় জনশক্তি ব্যুরোতে আবার অভিযোগ করছে। তারা অভিযোগে উল্লেখ করছে, কর্মীকে ভুল বুঝিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে তাদেরকে বিদেশে পাঠিয়েছে। তখন সব দায় এসে পড়ে মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে। যোগ করেন তারা। এই চিত্র শুধু সৌদি আরব নয় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে।
গতকাল রোববার প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট অনুবিভাগের যুগ্মসচিব মো: হাফিজুর রহমানের সাথে তার দফতরে দেখা করে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত না জানিয়ে শুধু বলেন, বিদেশগামীদের সাথে যারাই প্রতারণা করছে আমরা তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছি। গতকালও মিরপুরে অভিযান চালিয়ে তিন প্রতারককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, জনশক্তি ব্যুরো থেকে অভিযুক্ত এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন এলে তখন আমরা দায়ী এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রাথমিক ব্যবস্থা হিসাবে সার্ভার লক করছি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আজকে পর্যন্ত বিদেশগামীদের সাথে প্রতারণার সাথে জড়িত এমন আড়াই শ’ রিক্রুটিং এজেন্সির সার্ভার লকড করা হয়েছে। তাদের বিষয়ে শুনানিও চলমান রয়েছে।
এর আগে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান শাখার একজন উপসচিব নয়া দিগন্তকে শুধু বলেন, সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে পাড়ি জমানো কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কিভাবে কমিয়ে তাদেরকে স্বচ্ছভাবে পাঠানো যায় সেটি নিয়ে কাজ করছে। সেই লক্ষ্য পাঁচ সদস্যর একটি অভিবাসনব্যয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির একাধিক মিটিং হয়েছে। অভিবাসন ব্যয় কমাতে কমিটিতে পরামর্শ এসেছে এজেন্সি মালিক ও কর্মীদের মধ্যে বিদেশ যাওয়া নিয়ে আসলে কত টাকার মধ্যে অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করা হলো সেটি যাতে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া চুক্তির বিষয়টি ওইপির সার্ভারে অন্তর্ভুক্ত থাকে। এখন তো নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে কর্মীর সাথে এজেন্সি মালিকের চুক্তি হওয়ার কথা উল্লেখ থাকে। তখন ওইপির সার্ভারে দুই পক্ষের টাকা লেনদেনের তথ্য উল্লেখ থাকবে। তখন কোনো শ্রমিক যদি বিদেশে গিয়ে প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরে আসেন আর যদি তিনি অভিবাসনব্যয় নিয়ে কমপ্লেন করেন তখন মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির সার্ভারে (ওইপি) সার্ভার বের করে তাদের দেখানো হবে। এভাবে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে দেখা যাক আরো কোনো নতুন প্রক্রিয়া পাওয়া যায় কি না।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








