
সাকিবুল হাসান
বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকরের মৃত্যু ঘিরে তদন্ত শুরু করেছে গোয়া পুলিশ। তার মৃত্যুর ঘটনায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এদিকে পুনেতে পরিবারের খামারবাড়িতে গভীর রাতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ছেলে মালহার পাটেকর। অন্যদিকে, অভিনেতার মৃত্যুর পর তাকে ‘অশুভ’ বা ‘দানব’ বলে মন্তব্য করে নতুন বিতর্কে জড়িয়েছেন অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত। তার মন্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
গত ৮ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে মারা যান নানা পাটেকর। গোয়ার দোনা পাওলায় নিজের বাসভবনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সফল হননি। তার মৃত্যুর পর বলিউডের বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শোক প্রকাশ করেন।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা আইএএনএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নানা পাটেকরের মৃত্যুর ঘটনায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ১৯৪ ধারায় একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা করেছে গোয়া পুলিশ। মামলাটির তদন্ত করছেন পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর নিতিন নায়েক।
পানাজিতে নথিভুক্ত মামলার তথ্য অনুযায়ী, গোয়ার দোনা পাওলার ওশান পার্ক এলাকা থেকে নানা পাটেকরকে বাঁবোলিমের মণিপাল হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য খতিয়ে দেখবে পুলিশ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, অভিনেতাকে হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। এ ধরনের ঘটনায় প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পুলিশকে জানানো এবং মামলা নথিভুক্ত করা প্রয়োজন। পরে তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গোয়া মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
মণিপাল হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক শেখর সালকার জানান, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বলে মনে হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নানা পাটেকর আগে থেকেই হৃদ্রোগে ভুগছিলেন এবং চিকিৎসাধীন ছিলেন। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ।
নানা পাটেকরের শেষকৃত্য বৃহস্পতিবার রাতে পুনের ডোঞ্জে গ্রামের পারিবারিক খামারবাড়িতে সম্পন্ন হয়। সূর্যাস্তের পর সাধারণত শেষকৃত্য না করার প্রচলন থাকায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া বক্তব্যে ব্যাখ্যা দেন তার ছেলে মালহার পাটেকর।
মালহার জানান, মৃত্যুর সময় পরিবারের সদস্যরা গোয়ায় ছিলেন। সেখান থেকে মরদেহ পুনের পারিবারিক খামারবাড়িতে নিয়ে আসতে বেশ সময় লেগে যায়। তার বাবা দিনের প্রথম ভাগেই মারা গিয়েছিলেন। মরদেহ পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় এবং এরই মধ্যে অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ায় পরিবার বৃহস্পতিবারই শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বাবার মৃত্যুতে শোক প্রকাশের পাশাপাশি মালহার বলেন, নানা সাহেবের মতো মানুষেরা তাদের কাজ ও অবদানের মধ্য দিয়ে মানুষের মনে অমর হয়ে থাকেন।
পুনের ডোঞ্জে গ্রামের পারিবারিক খামারবাড়িতে নানা পাটেকরকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষবিদায় জানানো হয়। এ সময় পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে তিন দফা গান স্যালুট দেওয়া হয়।
শেষকৃত্যে উপস্থিত হয়ে অভিনেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান বলিউডের অভিনেতা জ্যাকি শ্রফ, পরিচালক অনিল শর্মা ও আনিস বাজমি, প্রযোজক ফিরোজ নাদিয়াদওয়ালাসহ চলচ্চিত্র জগতের একাধিক পরিচিত মুখ। কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে সেখানে উপস্থিত হন।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর হিন্দি চলচ্চিত্রে শক্তিশালী অভিনয় এবং ব্যতিক্রমী পর্দা-উপস্থিতির জন্য পরিচিতি পেয়েছিলেন। তার মৃত্যুতে চলচ্চিত্র অঙ্গনের পাশাপাশি ভক্তদের মধ্যেও শোকের আবহ তৈরি হয়।
নানা পাটেকরের ছেলে মালহার জানিয়েছেন, তার বাবার উদ্যোগে পরিচালিত সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ হবে না। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের মারাঠওয়াড়া অঞ্চলে নাম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে যে কাজ চলছে, তা অব্যাহত রাখার বিষয়ে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
মালহার জানান, এ বিষয়ে তিনি মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন। ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গণেশ থোরাটের তত্ত্বাবধানে এসব কার্যক্রম আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। খরা, কৃষকদের দুরবস্থা এবং গ্রামীণ এলাকার সঙ্কট মোকাবিলায় কাজ করার জন্য নাম ফাউন্ডেশন পরিচিত। বাবার মৃত্যুর পরও এই উদ্যোগের কাজ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে মালহার বুঝিয়ে দিয়েছেন, নানা পাটেকরের সামাজিক দায়বদ্ধতার উত্তরাধিকার ধরে রাখতে চায় পরিবার।
নানা পাটেকরের মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত। তার বক্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ২০১৮ সালে নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে তোলা যৌন হয়রানির অভিযোগ, যা ভারতে ‘হ্যাসট্যাগ মিটু’ আন্দোলনের সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
তনুশ্রীর অভিযোগ ছিল, ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ ছবির শুটিংয়ের সময় নানা পাটেকর তার সঙ্গে অনুপযুক্ত আচরণ করেছিলেন। সেই অভিযোগকে কেন্দ্র করে সে সময় চলচ্চিত্র অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। নানা পাটেকর অবশ্য এসব অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান জানিয়েছিলেন। অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য ঘিরে বিতর্কটি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।
নানা পাটেকরের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন তনুশ্রী। সেখানে তিনি জানান, কাজের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তার লখনৌ যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল এবং তিনি নিজের কাজের দিকে মনোযোগ দিতে চেয়েছিলেন। তবে ভিডিওতে তার ব্যবহৃত ‘ইভিল ডেড’ মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জন্ম দেয়।
অনেক ব্যবহারকারী তার মন্তব্যকে শোকের সময়ে অসংবেদনশীল বলে আখ্যা দেন। অল ইন্ডিয়া সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশনও (এআইসিডব্লিউএ) তার বক্তব্যের সমালোচনা করে।
সমালোচনার জবাবে ৯ অক্টোবর ইনস্টাগ্রামে আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করেন তনুশ্রী। সেখানে তিনি দাবি করেন, ‘হ্যাসট্যাগ মিটু’ আন্দোলনের পর থেকে তাকে কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা অনেকেই জানেন না।
তনুশ্রীর অভিযোগ, ওই ঘটনার পর থেকে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়ে ছিলেন। তার দাবি, বিভিন্ন জায়গায় তাকে অনুসরণ করা হতো এবং ২০২৪ সালে তার গাড়ির ব্রেকও কেটে দেওয়া হয়েছিল। এসব ঘটনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভয়, মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তনুশ্রী আরো বলেন, ২০১৮ সালে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর তার জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে, বিশেষ করে ২০২০ সালের পর পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে ওঠে। নানা পাটেকরকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ‘দানব’ বলে উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় শুধু একজন ব্যক্তি জড়িত ছিলেন না; তার চারপাশে আরো অনেক মানুষ ছিলেন।
তবে তনুশ্রীর এসব বক্তব্য তার নিজস্ব অভিযোগ। এগুলোর সত্যতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে মন্তব্য করার কারণে যারা তাকে নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছেন, তাদেরও সমালোচনা করেন তনুশ্রী।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








