নিকাহ, ঢাবি, ছাত্রী, ধর্ম
নিকাব পরা ছাত্রী নিয়ে আপত্তি শুধু ধর্মের নয়, ক্ষমতা অপব্যবহারেরও প্রশ্ন। সাবিকুন নাহার তামান্না

 

Advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিকাব পরা এক ছাত্রীকে নিয়ে শিক্ষকের আচরণের অভিযোগকে কেবল ধর্মীয় পোশাকের প্রশ্ন নয়; বরং শিক্ষার্থীর মর্যাদা, অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয় হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর নির্বাহী সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য সাবিকুন নাহার তামান্না। তার মতে, পোশাক নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু কাউকে অপমান বা চরমপন্থার সাথে যুক্ত করার ইঙ্গিত দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। 
তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা, পরীক্ষার খাতা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন এবং অভিযোগকারীদের অ্যাকাডেমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে নিকাব পরা ও না-পরা- উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিস্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্ব  দিয়েছেন তিনি। দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে সাবিকুন নাহার তামান্না এসব কথা বলেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-
প্রশ্ন : ৭ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একটি শ্রেণিকক্ষে নিকাব পরা এক ছাত্রীকে নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
সাবিকুন নাহার তামান্না : ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সহপাঠীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে দিন ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের একটি ক্লাসে প্রায় ১৩০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। নিকাব পরা এক ছাত্রী সামনের দিকে বসেছিলেন। তখন সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব তাকে বলেন, মুখ, হাত ও পা ঢেকে রাখা পর্দার সঠিক নিয়ম নয়। ওই ছাত্রীকে দেখে তার অস্বস্তি হচ্ছে এবং নিজেকে অনিরাপদ মনে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন। পরে ছাত্রীটিকে পেছনে গিয়ে বসতে বলা হয়।
এক সহপাঠী এর প্রতিবাদ করে বলেন, ওই ছাত্রী তার ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী এভাবে পর্দা করতে পারেন; কিন্তু শিক্ষকের প্রতিক্রিয়া ছিল আরো কঠোর। সহপাঠীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করেন, কিভাবে তিনি ওই ছাত্রীকে সমর্থন করছেন এবং তাকে ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ বা ‘সন্ত্রাসী’ বলা যায় কি না। এরপর শ্রেণিকক্ষের অধিকাংশ শিক্ষার্থী বেরিয়ে যান।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষার্থী কী পোশাক পরবেন, সেটি নিয়ে শিক্ষকের ব্যক্তিগত অস্বস্তি কি তাকে ওই শিক্ষার্থীকে অপমান করা কিংবা শ্রেণিকক্ষে তার অবস্থান নির্ধারণ করে দেয়ার অধিকার দেয়? আমার মতে, দেয় না।
প্রশ্ন : ঘটনাটি কি কেবল নিকাব বা ধর্মীয় পোশাক নিয়ে মতবিরোধ?
সাবিকুন নাহার তামান্না : না, বিষয়টি শুধু ধর্মের প্রশ্ন নয়। এটি শিক্ষার্থীদের সাথে ক্ষমতাসীন অবস্থানে থাকা একজন শিক্ষকের আচরণ, পারস্পরিক সম্মান এবং ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহারের প্রশ্ন।
একজন শিক্ষক নিকাব নিয়ে তার মতামত দিতে পারেন। কোনো পোশাকের সামাজিক, ধর্মীয় কিংবা শিক্ষাগত তাৎপর্য নিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন। অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা তাকে সেই অধিকার দেয়; কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কাউকে অপমান করা, ভয় দেখানো কিংবা ব্যক্তিগত অস্বস্তিকে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি দেয় না।
ওই ক্লাসে আলোচ্য বিষয় নিকাব ছিল না। একজন ছাত্রীকে পেছনে পাঠানো এবং তার ধর্মীয় পরিচয় ও পোশাকের ভিত্তিতে তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু পোশাকের ভিত্তিতে একজন শিক্ষার্থীকে সন্ত্রাসবাদ বা চরমপন্থার সাথে যুক্ত করার ইঙ্গিত দেয়া হলে তা অত্যন্ত অযৌক্তিক ও অপমানজনক।
শিক্ষার্থীরা ওই শিক্ষককে আগে বিভিন্ন আন্দোলনে পাশে পেয়েছেন বলে শ্রদ্ধা করেন। তাদের আপত্তি তার অতীত ভূমিকা নিয়ে নয়; শ্রেণিকক্ষে তার আচরণ নিয়ে। একজন মানুষ অন্য ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলেই তার কোনো আচরণ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে যেতে পারে না।
প্রশ্ন : নিকাব পরা শিক্ষার্থীকে দেখে অস্বস্তি বোধ করা কি অযৌক্তিক?
সাবিকুন নাহার তামান্না : ব্যক্তিগত অস্বস্তি কারো থাকতে পারে। এমন শিক্ষকরাও আছেন, যারা কখনো কোনো শিক্ষার্থীকে অপমান না করেও মনে করেন, মুখ ঢাকা থাকলে শিক্ষার্থীর অভিব্যক্তি বোঝা কঠিন হয়। কে বুঝতে পারছেন, কে প্রশ্ন করতে চাইছেন কিংবা কে আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী- এসব অনুধাবন কিছুটা কঠিন হতে পারে। পরীক্ষার ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাইয়েরও বাস্তব প্রয়োজন রয়েছে।
কিন্তু এসব সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান আছে। কোনো শিক্ষকের অস্বস্তি থাকলেই একজন শিক্ষার্থীকে হেয় করা বা তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এই ছাত্রীর ভাইভা পরীক্ষায় একজন পুরুষ শিক্ষক বাইরে চলে গিয়েছিলেন, যাতে তিনি নারী পরীক্ষকদের সামনে মুখ দেখাতে পারেন- শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এমন ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। ডাকসুর পক্ষ থেকে পরীক্ষার হলে নারী শিক্ষক কিংবা আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় যাচাইয়ের মতো বিকল্পের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
ক্লাসে নিকাব পরা শিক্ষার্থীর সাথে যোগাযোগে সমস্যা হলে শিক্ষক তাকে আলোচনায় আরো সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে উৎসাহিত করতে পারেন। প্রয়োজনে ক্লাসের পর আলাদাভাবেও কথা বলতে পারেন; কিন্তু নিজের অস্বস্তির কারণে কাউকে হয়রানি করার অধিকার তার নেই।
প্রশ্ন : নিকাবের পক্ষে প্রতিবাদ করতে গিয়ে কি অন্য ছাত্রীদের ওপর ধর্মীয় পোশাক পরার চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই?
সাবিকুন নাহার তামান্না : এই আশঙ্কা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নিকাব পরা একজন ছাত্রীর অধিকার রক্ষার অর্থ সব নারীকে নিকাব পরতে উৎসাহিত করা নয়। একইভাবে নিকাব না পরার কারণে কোনো ছাত্রীকে চাপ দেয়া বা অপমান করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
নীতিটি হওয়া উচিত ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পারস্পরিক সম্মান। যে ছাত্রী নিজের সিদ্ধান্তে মুখ ঢাকতে চান, তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে হবে। আবার যিনি নিকাব পরতে চান না, তার সিদ্ধান্তও সমানভাবে সম্মান করতে হবে।
ডাকসুর অবস্থান কোনো নির্দিষ্ট পোশাক সবার ওপর চাপিয়ে দেয়া নয়। আমাদের অবস্থান হলো, পোশাকের প্রশ্নে শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা যেন অক্ষুণœ থাকে। একজনের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে অন্যজনের অধিকার খর্ব করা যাবে না।
প্রশ্ন : শিক্ষার্থীরা এত দিন চুপ ছিলেন কেন?
সাবিকুন নাহার তামান্না : শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে এ ধরনের আচরণের অভিযোগ আগেও উঠেছে। ক্লাস নিতে নিতে তিনি প্রায়ই নিজের প্রশংসা করতেন এবং শিক্ষার্থীদের ধর্ম ও দারিদ্র্য নিয়ে মন্তব্য করতেন বলে তারা জানিয়েছেন। কেউ কেঁদেছেন, কেউ হাল ছেড়ে দিয়েছেন; কিন্তু আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করার সাহস পাননি।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের একটি বড় সমস্যা হলো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ক্ষমতার অসমতা। একজন শিক্ষকই শিক্ষার্থীর খাতা মূল্যায়ন করেন, ভাইভা বোর্ডে থাকতে পারেন, বৃত্তি বা চাকরির জন্য সুপারিশপত্র দিতে পারেন। ফলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে নিজের ফলাফল, ভবিষ্যৎ কিংবা শিক্ষাজীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কাজ করে।
বিশেষ করে অভিযোগের প্রতিকার কিভাবে হবে, অভিযোগকারীর পরিচয় কতটা গোপন থাকবে এবং প্রতিশোধমূলক আচরণ থেকে তাকে কিভাবে সুরক্ষা দেয়া হবে- এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা না থাকলে শিক্ষার্থীরা সাধারণত চুপ থাকাকেই নিরাপদ মনে করেন।
তাই শিক্ষার্থীরা আগে অভিযোগ করেননি বলে তাদের বক্তব্যকে অবিশ্বাস করার সুযোগ নেই; বরং কেন তারা অভিযোগ করার মতো নিরাপদ পরিবেশ পাননি, সেটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত।
প্রশ্ন : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পরই কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সক্রিয় হলো?
সাবিকুন নাহার তামান্না : ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষার্থীরা ফেসবুকে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পোস্টগুলো ছড়িয়ে পড়লে ডাকসু ও অন্যান্য ছাত্রসংগঠন প্রতিবাদ জানায় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার দাবি তোলে। এরপর বিভাগীয় অ্যাকাডেমিক কমিটি পদক্ষেপ নেয়।
ডাকসু ৮ অক্টোবরের বিবৃতিতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের নিষ্পত্তি কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার ওপর নির্ভর করবে?
বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকার কথা। ২০২৫ সালের অক্টোবরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুলিং ও র‌্যাগিং প্রতিরোধ কমিটি কাজ করছে। অনুষদ, বিভাগ ও আবাসিক হলগুলোতেও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বুলিং ও হয়রানির অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা উন্নত করতে ব্র্যাকের সাথে কাজ করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা কতটা, তা মূল্যায়ন করা দরকার। অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকলেই যথেষ্ট নয়; অভিযোগের তদন্ত, প্রতিকার এবং ফলাফল সম্পর্কে স্বচ্ছতাও থাকতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় যদি কেবল ভাইরাল হওয়ার পরই ব্যবস্থা নেয়, তাহলে যাদের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে না, তারা কিভাবে ন্যায়বিচার পাবেন? ফেসবুকে পোস্ট করার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অভিযোগ নিষ্পত্তিব্যবস্থার ওপর শিক্ষার্থীদের আস্থা থাকা বেশি জরুরি।
প্রশ্ন : যারা প্রতিবাদ করেছিলেন, তারা এখন কেন ভয় পাচ্ছেন?
সাবিকুন নাহার তামান্না : ৮ অক্টোবর বিভাগীয় অ্যাকাডেমিক কমিটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে পাঠদান থেকে বিরত রাখার সুপারিশ করে এবং তার দু’টি কোর্স অন্য শিক্ষকের কাছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানা গেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের জায়গা হলো, ওই সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষার খাতা এখনো সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের মূল্যায়নের আওতায় রয়েছে।
যারা সে দিন শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন কিংবা ঘটনার বিষয়ে লিখেছেন, তাদের কারো কারো খাতাও তার কাছে থাকতে পারে। ফলে শিক্ষার্থীরা আশঙ্কা করছেন, প্রতিবাদ করার কারণে তাদের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এখানে একটি মৌলিক স্বার্থের সঙ্ঘাত রয়েছে। কোনো শিক্ষকের আচরণ নিয়ে অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগকারীদের পরীক্ষার ফল নির্ধারণের দায়িত্ব একই শিক্ষকের হাতে থাকা উচিত নয়। এতে শিক্ষার্থীদের যেমন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তেমনি শিক্ষকের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠার সুযোগ থাকে।
তাই চূড়ান্ত পরীক্ষার খাতাগুলো অন্য নিরপেক্ষ পরীক্ষকের মাধ্যমে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এটি কোনো শিক্ষককে আগাম দোষী সাব্যস্ত করা নয়; বরং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং উভয় পক্ষের ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা।
প্রশ্ন : বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আপনাদের সুনির্দিষ্ট দাবি কী?
সাবিকুন নাহার তামান্না : আমাদের প্রথম দাবি, অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে। তদন্তে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বক্তব্য নিতে হবে। শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত অন্য শিক্ষার্থীদের বক্তব্যও বিবেচনায় নিতে হবে। তদন্তের ফল শিক্ষার্থীদের স্বার্থে যাক বা শিক্ষকের পক্ষে যাক- যৌক্তিক গোপনীয়তা বজায় রেখে ফলাফল প্রকাশ করা জরুরি। এতে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে প্রশ্নের অবসান হবে।
দ্বিতীয়ত, এই ব্যাচের চূড়ান্ত পরীক্ষার খাতা অন্য নিরপেক্ষ পরীক্ষকের কাছে দিতে হবে। অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের ফলাফল যেন কোনোভাবেই তাদের প্রতিবাদের কারণে প্রভাবিত না হয়, সে বিষয়ে লিখিত নিশ্চয়তা দিতে হবে। ভবিষ্যতে ভাইভা, থিসিস বা অন্য কোনো অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমেও তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণ করা যাবে না।
তৃতীয়ত, নিকাব পরা শিক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য কার্যকর ও সম্মানজনক ব্যবস্থা নিতে হবে। নারী শিক্ষক বা উপযুক্ত বিকল্প পদ্ধতিতে পরিচয় যাচাই করা যেতে পারে। একই সাথে শ্রেণিকক্ষে তাদের অংশগ্রহণ ও যোগাযোগের বাস্তব সমস্যাগুলোও যুক্তিসঙ্গতভাবে সমাধান করতে হবে।
চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযোগ নিষ্পত্তিব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই অভিযোগ করতে পারেন, সে জন্য অভিযোগকারীর সুরক্ষা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত এবং সিদ্ধান্তের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন : আপনারা কি মনে করেন, এই ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে আগেই দোষী সাব্যস্ত করা উচিত?
সাবিকুন নাহার তামান্না : না। অভিযোগের গুরুত্ব যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি তদন্তের আগেই কাউকে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করাও ঠিক নয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে তার বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দিতে হবে।
আমাদের দাবি প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য শোনা এবং শিক্ষকের ন্যায্য অধিকার রক্ষা- দু’টিই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের মতো বিষয়ে স্বার্থের সঙ্ঘাত এড়াতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে এবং শিক্ষার্থীরাও নিরাপদ বোধ করবেন।
প্রশ্ন : অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা ও শিক্ষকের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সীমারেখা কোথায়?
সাবিকুন নাহার তামান্না : অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা মানে শিক্ষক তার মতামত প্রকাশ করতে পারবেন, প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে পারবেন এবং শিক্ষার্থীদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করতে পারবেন। শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকের বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে যুক্তি দিয়ে মতবিরোধের নিষ্পত্তি হবে।
কিন্তু অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা কখনোই কাউকে অপমান করা, তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিদ্রƒপ করা কিংবা নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগ করার অধিকার নয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে ক্ষমতার পার্থক্য রয়েছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে শিক্ষকের দায়িত্ব আরো বেশি।
একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর সাথে তীব্র মতবিরোধেও যেতে পারেন; কিন্তু তার হাতে যখন শিক্ষার্থীর নম্বর, ভাইভা ও অ্যাকাডেমিক মূল্যায়নের ক্ষমতা থাকে, তখন সেই ক্ষমতা ব্যক্তিগত বিরোধে ব্যবহার না করার দায়িত্বও তার রয়েছে।
আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হোক পারস্পরিক সম্মান, যুক্তি ও জবাবদিহির ভিত্তিতে। কোনো শিক্ষার্থী যেন নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস, পোশাক কিংবা ন্যায্য অধিকারের পক্ষে কথা বলার কারণে অ্যাকাডেমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা না করেন।
প্রশ্ন : এই ঘটনা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কী শিক্ষা নেয়া উচিত?
সাবিকুন নাহার তামান্না : বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন বিতর্ক হিসেবে না দেখে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং অভিযোগ জানানোর অধিকার নিশ্চিত করার বৃহত্তর প্রশ্ন হিসেবে দেখা।
শিক্ষার্থীরা যেন অভিযোগ করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য না হন। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার মর্যাদা বিবেচনায় নিয়ে অভিযোগ চাপা দেয়া যাবে না; আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হচ্ছে বলেই তদন্ত ছাড়াই শাস্তি দেয়া যাবে না।
প্রতিটি অভিযোগের জন্য একটি কার্যকর, নিরপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ প্রক্রিয়া থাকতে হবে। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত- উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা, প্রমাণ যাচাই এবং সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগকারীদের অ্যাকাডেমিক ফলাফল ও ভবিষ্যৎ যেন ঝুঁকিতে না পড়ে, তার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
শিক্ষকরা তাদের মতামত দেবেন, শিক্ষার্থীরা তার প্রতিবাদ করবেন- এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক চর্চা; কিন্তু সেই মতবিরোধের নিষ্পত্তি হতে হবে যুক্তি দিয়ে, ক্ষমতা প্রয়োগ করে নয়।
আমাদের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট : একজন শিক্ষার্থী নিকাব পরবেন কি না, তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু কোনো শিক্ষার্থীই যেন তার পোশাক, ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা নিজের অধিকারের পক্ষে কথা বলার কারণে অপমানিত বা অ্যাকাডেমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন তা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী- সবার মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করে।