যুব উন্নয়ন অধিদফতর, প্রশ্নফাঁস, নিয়োগ
প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে শেষ মুহূর্তে নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের প্রতিবাদে রাজধানীতে চাকরী প্রার্থীদের বিক্ষোভ : নয়া দিগন্ত। নয়া দিগন্ত
  •  শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিত
  •  ক্ষোভে উত্তাল রাজধানী
  •  ক্ষতিপূরণসহ ৪ দফা দাবি
  •  ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের পর ওএমআর শিট বিতরণের দুই মিনিটের মাথায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ। আকস্মিক ও শেষ মুহূর্তের এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভে ফেটে পড়ে রাজধানীর রাজপথে নেমে আসেন সারা দেশ থেকে আসা লাখ লাখ চাকরিপ্রত্যাশী। 
গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে এই স্থগিতাদেশের খবর ছড়িয়ে পড়লে শাহবাগ, নীলক্ষেত, মতিঝিল ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন প্রার্থীরা। এ ঘটনায় প্রশ্নফাঁসের কারণ উদ্ঘাটনে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যুব উন্নয়ন অধিদফতরের ১১তম গ্রেডের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ২৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে সারা দেশ থেকে প্রায় তিন লাখ চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেছিলেন। গতকাল বেলা ১১টায় রাজধানীর  প্রায় ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। প্রতিটি পদের বিপরীতে গড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন প্রায় এক হাজার ২৪০ জন প্রার্থী। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে শুক্রবার রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্রের নমুনা ও ছবি ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময়ের ঠিক আগে বা ওএমআর শিট হাতে পাওয়ার পর পরীক্ষার্থীদের জানানো হয়, পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে।
যুব উন্নয়ন অধিদফতরের প্রশাসন উইংয়ের পরিচালক ডি এম আতিকুর রহমান জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নপত্রের সাথে পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের আংশিক মিল পাওয়ায় পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-৫) মো: মাজহারুল হক জানান, স্থগিত হওয়া পরীক্ষার নতুন তারিখ আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই ঘোষণা করা হবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা আসতেই বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন চাকরিপ্রার্থীরা। বেলা সোয়া ১১টা থেকে নীলক্ষেত মোড়, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সাতমসজিদ সড়ক ও মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের সামনে পরীক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করেন। দুপুর ১২টার দিকে কয়েক হাজার প্রার্থী শাহবাগ মোড় অবরোধ করলে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে মতিঝিল বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, কলোনি উচ্চবিদ্যালয় ও বালক উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে আসা প্রার্থীরা মতিঝিল শাপলা চত্বর অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করেন। পুলিশ তাদের একবার সরিয়ে দিলেও পরীক্ষার্থীরা ফের সড়কে অবস্থান নেন এবং বেলা ২টা পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি চলে।
শাহবাগে আন্দোলনরত চাকরি প্রার্থীরা চার দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা, আগামী দুই দিনের মধ্যে পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা, পরীক্ষা কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ডিভাইস শনাক্তে স্ক্যানারসহ জালিয়াতি রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রেজওয়ান ইসলাম এবং নিউমার্কেট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু মোহাম্মদ কাউসার জানান, সড়ক অবরোধের খবর পেয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করে এবং পরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
চাকরি প্রার্থীরা জানান, শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় তারা অবর্ণনীয় শারীরিক কষ্ট ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জেলা শহর থেকে ধার-দেনা করে, রাতের পর রাত ভ্রমণ করে তারা পরীক্ষা দিতে এসেছেন। ওএমআর শিট হাতে পাওয়ার দুই মিনিট পর পরীক্ষা বাতিলের এ ক্ষতিপূরণ কে দেবে? তরুণদের ভবিষ্যৎ ও কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে এই ছেলেখেলা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না; রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নফাঁস চক্রের লাগাম টানতেই হবে।
প্রশ্নফাঁসের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। মন্ত্রণালয়ের যুব-১ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়। কমিটিকে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ, বিতরণের সাথে সংশ্লিষ্টদের জবানবন্দী গ্রহণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। 
প্রতিমন্ত্রী ও ডিজির অব্যাহতি চেয়ে ছাত্রশিবিরের চার দফা দাবি : এ দিকে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের ‘সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা’ পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে চার দফা দাবি পেশ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। এক এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ বলেন, রাষ্ট্রীয় নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। সরকার গঠনের আট মাস না পেরোতেই বিসিএসের গেজেট থেকে প্রার্থী বাদ দেয়া, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর বিতর্কিত সুপারিশ এবং সর্বশেষ প্রশ্নফাঁসের ঘটনা সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। পুরনো এস্টাবলিশমেন্ট বহাল রাখার কারণেই এ ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে তারা উল্লেখ করেন। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, প্রতিমন্ত্রী ও ডিজির অব্যাহতি, পরীক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ ও এস্টাবলিশমেন্ট সংস্কার করার দাবি জানায় শিবির।

Advertisement