
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক-সংবিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোর পুনর্গঠন নিয়ে আবার নতুন করে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। একদলীয় প্রাধান্য কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির চক্র থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রস্তাব এখন আলোচনার মূল কেন্দ্রে। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন স্থায়ী একটি নিরপেক্ষ তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জনপ্রশাসন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অবসানের বিষয়টি সবচেয়ে জোরেশোরে সামনে আসছে। তবে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- এই সংস্কার উদ্যোগ কেবল আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে কোনো বাস্তবমুখী ও টেকসই সামাজিক-রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে উঠবে?
নির্বাচনকালীন স্থায়ী কাঠামো : তত্ত্বাবধায়ক নাকি নতুন কোনো মডেল?
অতীতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সুফল দেশের মানুষ পেলেও রাজনৈতিক জটিলতায় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বিলুপ্ত করা হয়। বর্তমানে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ মনে করছে, গ্রহণযোগ্য ও অর্থবহ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সময়ে একটি নিরপেক্ষ কাঠামো অপরিহার্য।
রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান : বেশির ভাগ বিরোধী দলই স্থায়ী নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবেই অসম্ভব প্রমাণিত হয়েছে।
কাঠামোগত বিতর্ক : শুধু ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ নাম ফিরিয়ে আনাই শেষ কথা নয়; বরং এই সরকারের প্রধান কে হবেন এবং আইন প্রয়োগকারী ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর ওপর তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণ কতটুকু থাকবে- সেসব বিষয়েও একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও সাংবিধানিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির দাবি উঠছে।
প্রধান তিন কমিশনের স্বায়ত্তশাসন : আইনি বাধ্যবাধকতা ও বাস্তব রূপায়ণ
নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য শুধু নির্বাচনকালীন সরকারই যথেষ্ট নয়; বরং রাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জনপ্রশাসন কমিশন দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন দলগুলোর রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বিচার বিভাগ : বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ পৃথকীকরণ এবং নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে স্থায়ী ‘জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন’ ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির তাগিদ দেয়া হচ্ছে, যাতে প্রশাসনিক চাপমুক্ত হয়ে বিচারকরা রায় দিতে পারেন।
দুর্নীতি দমন কমিশন : দুদককে প্রকৃত অর্থে একটি স্বাধীন সংস্থায় রূপান্তর করতে এর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংসদীয় বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রস্তাব প্রাধান্য পাচ্ছে।
জনপ্রশাসন কমিশন : সিভিল সার্ভিসকে রাজনীতিমুক্ত রাখতে জনপ্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে একটি স্বাধীন এবং সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় আনার জোর দাবি উঠেছে।
রাজনৈতিক ঐকমত্যের বর্তমান চিত্র ও প্রতিবন্ধকতা
রাজনৈতিক সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে সব পক্ষের মধ্যে মৌখিক সম্মতি দেখা গেলেও বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে সুস্পষ্ট মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্কট : দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অনাস্থা এবং জয়-পরাজয়ের মানসিকতা মৌলিক সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে।
সংবিধান সংস্কার পদ্ধতি : একটি নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে এসব সংস্কার সংবিধানে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, নাকি কোনো সার্বজনীন ‘রাজনৈতিক সনদ’-এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে- তা নিয়ে রাজনৈতিক টেবিলগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।
ভবিষ্যৎ পথরেখা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র সংস্কারের এই সুযোগ হাতছাড়া হলে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ও সুশাসন ব্যবস্থা চিরতরে দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। সংবিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং একটি স্থায়ী নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামো তৈরি করা কোনো একক দলের স্বার্থের বিষয় নয়; বরং এটি সমগ্র দেশের দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থায়িত্বের মূল ভিত্তি। এখন দেখার বিষয়, রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এই জাতীয় ঐকমত্য গঠনে কতটা ছাড় দিতে ও দায়বদ্ধতা দেখাতে প্রস্তুত।
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








