দুর্বৃত্তপনার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা প্রধানমন্ত্রীর

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

Advertisement

দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গ, চাঁদাবাজি, দখলসহ দুর্বৃত্তপনার অভিযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঘটনায় কঠোর অবস্থানের বার্তা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে একটি মেডিক্যাল সেন্টার ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে বিএনপির সংরতি আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর পরপরই মিষ্টির আনুষ্ঠানিক পদত্যাগে নির্বাচন কমিশন তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করে গেজেটও প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে রাজধানীর কয়েকটি দলীয় কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং একাধিক সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘অন্য দলীয় সন্ত্রাসীদের ধরবার  আগে নিজদলীয় নেতাকর্মীদের লাগাম টানছেন প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান।’ তারা বলছেন, রাড্ডা সেন্টারে হামলার তদন্ত, মিষ্টির পদত্যাগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং দলীয় কমিটিগুলোর বিলুপ্তি- সবমিলিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির প্রশ্নটি সামনে এসেছে। দলীয় পরিচয়কে অপরাধের দায় থেকে রাকবচ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না- এমন অবস্থান কার্যকর হলে তা দলের নেতা, এমপি ও তৃণমূলের কর্মীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মন্তব্য তাদের। 
সূত্র মতে, মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশের কয়েক ঘণ্টা আগেই বুধবার  ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। ওই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। একই সাথে বিলুপ্ত করা হয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের কমিটিও। দলীয় পর্যায়ে একের পর এক এমন সিদ্ধান্তের ফলে নেতাকর্মীদের মধ্যে সাংগঠনিক জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। যদিও কমিটি বিলুপ্তির আনুষ্ঠানিক কারণ এবং রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনার সাথে এর সরাসরি যোগসূত্র সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনাগুলোর সময়কাল রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। 
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাত মাসের মাথায় প্রথম কোনো এমপিকে  দুর্বৃত্তপনার অভিযোগে পদত্যাগ করানো হলো। এতে প্রমাণিত হয়েছে, সরকারের এমপি, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তিনি কঠোর হয়েছেন। সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পদেেপর মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট করতে চাইছেন, অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দলীয় পরিচয় কাউকে দায়মুক্তি দেবেন না। তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় প্রভাব, রাজনৈতিক মতা বা জবরদস্তির কোনো স্থান থাকবে না, বরং আইনের শাসনই হবে শেষ কথা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্র পরিচালনা ও দলীয় শৃঙ্খলায় অভাবনীয় এক কঠোরতার নজির স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজধানীর মিরপুরে সংঘটিত এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এবং তার পরিপ্রেেিত সংরতি নারী আসনের এক সংসদ সদস্যের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। দল ও সরকারের ইমেজ রায় তার এই আপসহীন মনোভাব দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজে  ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে (মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র) একদল দুর্বৃত্ত হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এই ঘটনার পেছনে মতাসীন দলের কতিপয় নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে, যার মধ্যে অন্যতম নাম ছিল সংরতি নারী আসনের সংসদ সদস্য এবং বিএনপি নেতা মরহুম নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোট বোন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। এ ঘটনায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ (টিআইবি) বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে এবং মতাসীন দলের ভেতরে অবিলম্বে ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালানোর আহ্বান জানানো হয়। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হওয়া মাত্রই তিনি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। 
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত বুধবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের স্পষ্ট নির্দেশ দেন। দলীয় প্রধানের কঠোর নির্দেশনার পর গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি স্পিকারের কার্যালয়ে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। সরকারের সাত মাসের মাথায় একজন মতাসীন সংসদ সদস্যকে এভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনা দেশের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল এবং এটি তৃণমূলের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। যদিও এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসির প্রত্যাহার এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। 
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকেরা প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে দলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণকর এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। দলের শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি রা প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান নয়া দিগন্তকে বলেন, জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রকৃত কর্মীরা কখনো চাঁদাবাজি, জমি দখল বা কোনো জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হতে পারেন না। দলের নাম ব্যবহার করে যারা অপরাধমূলক কাজে জড়াবে, বিএনপি বা আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাদের কাউকেই ছাড় দেবেন না। এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে টার্গেট করে নয়, বরং সামগ্রিক সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রয়াস। 
বিএনপির অন্যতম নীতিনির্ধারক ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দলীয় পরিচয়কে অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সংস্কৃতি বন্ধে তারেক রহমানের এই সাহসী মনোভাব প্রশংসার দাবিদার। ভবিষ্যতে এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান। 
আন্তর্জাতিক একটি মিডিয়াকে দেয়া এক সাাৎকারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, তারেক রহমান রাজনীতির অন্ধকার গলিপথ যেমন দেখেছেন, তেমনি এ দেশের সঙ্ঘাত ও প্রতিশোধের রাজনীতিও প্রত্য করেছেন। বর্তমান সময়ে তিনি যেভাবে দলীয় এমপির বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নিলেন, তা প্রমাণ করে যে তিনি একজন সংকীর্ণ দলীয় নেতার গণ্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা প্রদর্শনের চেষ্টা করছেন।
বিএনপির শীর্ষ একাধিক নেতা জানান, রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না এ বিষয়টি দল স্পষ্ট করতে চায়। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করে দলীয় পদ বা প্রভাব বিবেচনা না করে বহিষ্কারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। গুরুতর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে আইনি ব্যবস্থা নেয়ারও সিদ্ধান্ত রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক পাওয়া অভিযোগগুলোও যাচাই-বাছাই করে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে, যেসব ব্যক্তি বারবার চাঁদাবাজি, জমি দখল, সহিংসতা, ভাঙচুর কিংবা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন তাদের ওপর। 
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ ও পার পাওয়ার সবচেয়ে বড় লাইসেন্স হলো সরকারি দলের পরিচয়। এটি বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়েও ঘটছে। তবে মিরপুরের রাড্ডা সেন্টারের ঘটনার পর এমপির পদত্যাগ দল এবং প্রশাসনকে একটি বড় বার্তা দিয়েছে বলে মনে করি। তবে একই সাথে আশঙ্কা করছি, এটা যেন নিছক লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে না হয়। আরো অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিনই সরকারি দলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমে আসছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা কার্যকর হলে আমরা মূল্যায়ন করতে পারব। 
জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক, বেআইনি, সহিংস বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাকে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। তিনি বলেন, বিভিন্ন ঘটনায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এর থেকে এমপি-মন্ত্রী কেউই বাদ যাবে না। 
এ দিকে গতকাল ফেসবুকে এক পোস্টে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, অবশেষে সরকার ও সরকারি দল বাধ্য হয়ে সাংগঠনিক পদপে নিতে শুরু করেছে। রাড্ডা কিনিক দখলের ঘটনায় শুধু সাংগঠনিক পদপে মোটেই যথেষ্ট নয়। কালপ্রিটদের বিরুদ্ধে আইনি পদপে নিয়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দেশবাসী দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য আইনি পদপে দেখতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রথম ভাষণেই তারেক রহমান বলেছিলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জোরজবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কঠোর অবস্থান ধরে রাখা এবং তৃণমূলে এর শতভাগ বাস্তবায়ন করা তারেক রহমানের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ দীর্ঘ দেড় দশক পর মতায় আসার কারণে দলের বড় একটি অংশের মধ্যে সুযোগ সুবিধা নেয়ার বা আধিপত্য বিস্তারের মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তার সরকার ও দলের ভেতরে কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা চলমান রাখেন তাহলে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।