
সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
রাজধানীর দ্রুতগতির ও আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাস্তবায়নাধীন ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট (এমআরটি লাইন-১) প্রকল্পের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্ত ও সিস্টেম প্যাকেজে দাফতরিক প্রাক্কলনের তুলনায় দরপত্রের দর অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। প্যাকেজভেদে দর বৃদ্ধির হার ৩২.০৫ শতাংশ থেকে ৫০.৮৯ শতাংশ পর্যন্ত। তিনটি প্যাকেজে দর বৃদ্ধি ৩২.০৫%, ৪৯.৯২% ও ৫০.৮৯%-এর সাধারণ গড় ৪৪.২৯%, কিন্তু প্যাকেজগুলোর প্রকৃত আর্থিক ওজন বিবেচনায় বৃদ্ধি প্রায় ৪২.৫%। এর মধ্যে একটি প্যাকেজে মাত্র একজন দরদাতা দরপত্র জমা দিয়েছে। অন্য দুই প্যাকেজে দরপত্র জমা পড়েছে মাত্র দু’টি করে। এই পরিস্থিতিতে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে তিনটি বড় প্যাকেজে মোট ২৯ হাজার ১০২ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ে ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এসব কাজের দায়িত্ব পেয়েছে জাপানি ও ভারতীয় কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠান এবং ভারতের একটি করে কোম্পানি।
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবগুলো অনুমোদন করা হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে এসব ক্রয় প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, প্যাকেজ সিপি-০৬, সিপি-০৯ ও সিপি-১০Ñএই তিন প্যাকেজে দরদাতাদের প্রস্তাবিত দর দাফতরিক প্রাক্কলনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশেষ করে সিপি-০৯ ও সিপি-১০ প্যাকেজে বৃদ্ধির হার প্রায় ৫০ শতাংশ।
উল্লেখ্য, সংশোধিত পরিকল্পনা ও বাজেট অনুযায়ী প্রকল্পটির প্রথম সংশোধন ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ একনেকের অনুমোদন পেয়েছে। সংশোধিত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
প্যাকেজ সিপি-০৬ : ভূগর্ভস্থ মূল লাইন ও স্টেশন নির্মাণ
এ প্যাকেজের আওতায় এমআরটি লাইন-১-এর নদ্দা আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত মোট ৫.১৮২ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ রুট নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৪.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দু’টি সমান্তরাল টানেল, তিনটি ভূগর্ভস্থ স্টেশন এবং টিবিএম (টানেল বোরিং মেশিন) লঞ্চিং শ্যাফ্ট। স্টেশন তিনটি হলোÑএয়ারপোর্ট স্টেশন, যার দৈর্ঘ ৩৮০ মিটার; এয়ারপোর্ট টার্মিনাল-৩ স্টেশন, ২৫০ মিটার; এবং খিলতে স্টেশন, ২৫০ মিটার।
এ কাজের জন্য জাপানি ও ভারতীয় কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত যৌথ উদ্যোগকে ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ ১১ হাজার ৫৯০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। অনুমোদিত দরটি ভ্যাট ও ট্যাক্স বাদে দাফতরিক প্রাক্কলনের চেয়ে ৩২.০৫ শতাংশ বেশি।
প্যাকেজ সিপি-০৯ : ট্র্যাক ও ইলেকট্রিক্যাল ফ্যাসিলিটিজ
এ প্যাকেজের আওতায় এমআরটি লাইন-১-এর সম্পূর্ণ ট্র্যাকওয়ার্কস নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে প্রধান রেললাইন, টার্নআউট, পয়েন্ট ও ক্রসিংয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থার বিভিন্ন অবকাঠামো থাকবে।
এর মধ্যে রয়েছে ১৩২ কেভি প্রাইমারি ফিডার সিস্টেম, রিসিভিং সাবস্টেশন, অক্সিলিয়ারি সাবস্টেশন, ৩৩/০.৪১৫ কেভি এসি ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক, ১৫০০ ভোল্ট ডিসি ওভারহেড কন্টাক্ট সিস্টেম এবং স্কাডা।
এই প্যাকেজে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত দরপত্র দাখিল করে। প্রতিষ্ঠানটি কারিগরিভাবে রেসপনসিভ হওয়ায় নেগোসিয়েশনের পর ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ ১১ হাজার ৬৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজটি দেয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। ভ্যাট ও ট্যাক্স বাদে এ দর দাফতরিক প্রাক্কলনের তুলনায় ৪৯.৯২ শতাংশ বেশি।
প্যাকেজ সিপি-১০ : সিগন্যালিং, টেলিকম ও প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর
এমআরটি লাইন-১-এর গুরুত্বপূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও যোগাযোগ অবকাঠামো সিপি-১০ প্যাকেজের আওতাভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিকেশন-বেজড অটোমেটিক ট্রেন কন্ট্রোল (সিবিটিসি) সিস্টেম, অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক, এলটিই প্রযুক্তির রেডিও যোগাযোগব্যবস্থা, প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর এবং এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (ইআরএম) সিস্টেম।
ভারতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সর্বনিম্ন রেসপনসিভ দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে। ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ ছয় হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্যাকেজটি অনুমোদন করা হয়েছে।
ভ্যাট ও ট্যাক্স বাদে এ দর দাফতরিক প্রাক্কলনের তুলনায় ৫০.৮৯ শতাংশ বেশি।
কেন এত বাড়ল দর?
দরপত্র-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দরপত্রে প্রত্যাশিত প্রতিযোগিতা না থাকা।
সিপি-০৯ প্যাকেজে চূড়ান্ত দরপত্র জমা দিয়েছে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান। অন্য দিকে সিপি-০৬ ও সিপি-১০ প্যাকেজে প্রাক-যোগ্যতায় একাধিক প্রতিষ্ঠান উত্তীর্ণ হলেও চূড়ান্ত দরপত্র জমা পড়ে মাত্র দু’টি করে।
ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বড় অবকাঠামো প্রকল্পে যে ধরনের প্রতিযোগিতামূলক দর প্রত্যাশিত ছিল, তা তৈরি হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিযোগিতা সীমিত থাকলে দরদাতাদের প্রাক্কলনের তুলনায় বেশি দর দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এ ছাড়া কোভিড-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রী, শিল্পযন্ত্র ও বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের দাম বেড়েছে। এমআরটি প্রকল্পে ব্যবহৃত টানেল বোরিং মেশিন, বিশেষায়িত ট্র্যাক সরঞ্জাম, উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থার মূল্যবৃদ্ধিও দরকে প্রভাবিত করেছে।
এর বাইরে রয়েছে বিনিময় হার। এমআরটি লাইন-১-এর বড় অংশের যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানিনির্ভর। প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলন তৈরির সময়ের তুলনায় পরবর্তী সময়ে ডলার ও ইয়েনের বিপরীতে টাকার বিনিময়মূল্যে পরিবর্তন ঘটায় আমদানিনির্ভর কাজের ব্যয় বেড়েছে।
ভূগর্ভস্থ নির্মাণের ঝুঁকি
এমআরটি লাইন-১ বাংলাদেশের প্রথম বড় ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল প্রকল্প। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকার নিচ দিয়ে টানেল নির্মাণ এবং ভূগর্ভস্থ স্টেশন তৈরিতে কারিগরি ও নির্মাণঝুঁকি রয়েছে। এ ধরনের ঝুঁকি বিবেচনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো দর নির্ধারণের সময় অতিরিক্ত ঝুঁকি ব্যয় বা ‘সেফটি প্রিমিয়াম’ যুক্ত করেছে বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দরদাতাদের প্রস্তাবিত দর দাফতরিক প্রাক্কলনের তুলনায় বেশি হলেও কাজের বর্তমান পর্যায়ে আবার দরপত্র আহ্বান করলে প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো সময় লাগতে পারে। এতে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের প থেকে বলা হয়েছে, সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী জাইকা যৌথভাবে অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থায়ন করবে। ফলে দর বৃদ্ধির পরও দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণ কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
তবে একই সাথে তিনটি বড় প্যাকেজে দাফতরিক প্রাক্কলনের তুলনায় ৩২ থেকে প্রায় ৫১ শতাংশ বেশি দর, বিশেষ করে একটি প্যাকেজে একক দরদাতা থাকার বিষয়টি প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতার মাত্রা ও ব্যয় নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। ফলে চূড়ান্ত চুক্তিমূল্য নির্ধারণে নেগোসিয়েশন, প্রাক্কলন প্রস্তুতের ভিত্তি এবং প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতাÑ এসব বিষয় ভবিষ্যতে প্রকল্পের ব্যয়-সাশ্রয় ও জবাবদিহির েেত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








