
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
প্রতিদিনই প্রায় একই চিত্র পুঁজিবাজারের। সূচকের বড় ধরনের উন্নতি দিয়ে দিনের শুরু হলেও পরবর্তীতে সৃষ্টি হওয়া বিক্রয়চাপ অস্থির করে তুলছে বাজারকে। শেষদিকে এসে বিক্রয়চাপ আরো বেড়ে অবনতি ঘটছে সূচকের। গতকাল নিয়ে টানা চার দিন এভাবেই পার করেছে দেশের পুঁজিবাজারগুলো। ফলে পতনের ধারা থেকে বের হতে পারছে না পুঁজিবাজারগুলো।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের যেমন আস্থায় ঘাটতি রয়েছে তেমনি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থাও এর জন্য দায়ী। বিশ^বাজারে জ¦ালানি তেলের দর নিয়ে অস্থিরতাও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে। জ¦ালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে পুঁজিবাজারে। সবকিছু মিলে সাধারণ মানুষ বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে প্রতিদিনই লেনদেনের শুরুতে বাজারগুলো ভালো থাকলেও পরবর্তীতে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বরাবরই মুনাফার চেয়ে নিজের পুঁজির সুরক্ষার দিকেই বিনিয়োগকারীদের নজর থাকে বেশি। এখন বাজারে তারই প্রতিফলন ঘটছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। এ দিন ৫ হাজার ৫২৫ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে স্থির হয় ৫ হাজার ৫২৪ দশমিক ৩৭ পয়েন্টে। শুরুতে সূচকটি একপর্যায়ে ৫ হাজার ৫৫৫ দশমিক ৮৬ পয়েন্টে পৌঁছলেও পরবর্তীতে সৃষ্টি হওয়া বিক্রয়চাপ সূচককে পতনের দিকে নিয়ে যায়। এভাবে ৩০ পয়েন্টের বেশি উন্নতি ঘটা সূচক পতন দিয়েই দিন শেষ করে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৩ দশমিক ২৬ ও ২ দশমিক ১৪ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের মিশ্র আচরণ দেখা যায়। এখানে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৫ দশমিক ০২ পয়েন্ট হারায়। ১৪ হাজার ৭৭৭ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৭৭২ দশমিক ৭৩ পয়েন্টে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে সিএসই-৩০ সূচকটি ২৫ দশমিক ১৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেলেও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে ৩ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট।
সূচকের অবনতির ফলে গতকাল ঢাকা স্টকে লেনদেনেরও বড় ধরনের অবনতি ঘটে। ডিএসই গতকাল ৬৩৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১১২ কোটি টাকা কম। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৭৪৬ কোটি টাকা। তবে লেনদেনে উন্নতি ঘটেছে চট্টগ্রাম স্টকে। এখানে ১০ কোটি টাকা থেকে ২৫ কোটিতে পৌঁছে লেনদেন।
ঢাকা শেয়ারবাজারের গতকালের লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায় মোট ১১টি খাতের মধ্যে সাতটি ছিল মূল্যবৃদ্ধির ধারায়। বাকি চারটি দরপতনের শিকার হয়। মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া খাতগুলোর মধ্যে সিমেন্ট খাতই ছিল এগিয়ে। এ খাতে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া অন্য খাতগুলোর মধ্যে টেক্সটাইল ২ দশমিক ৯, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক ১ শতাংশ, জ¦ালানি দশমিক ৩ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ড দশমিক ২ শতাংশ, বীমা দশমিক ২ শতাংশ ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দশমিক ২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। একই সময় ওষুধ ও রসায়ন খাত ১ দশমিক ৩ শতাংশ দরপতনের শিকার ছিল। দরপতনের শিকার অন্য খাতগুলোর মধ্যে বিবিধ ১ দশমিক ২, তথ্যপ্রযুক্তি দশমিক ৭ ও ব্যাংকিং খাতে দশমিক ১ শতাংশ দরপতন ঘটে।
এ দিকে ব্রোকারেজ হাউজে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবার প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি ব্যবস্থার দিকে এগোতে চায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর অংশ হিসেবে দেশের সব ব্রোকারেজ হাউজের জন্য একটি ইউনিফাইড ও অত্যন্ত সুরক্ষিত ব্যাক অফিস সফটওয়্যার চালুর বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
তিনি বলেছেন, ডিজিটাল যুগে ব্রোকারেজ হাউজের ব্যাংক হিসাব এবং সিসিএ (কাস্টমার ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্ট) হিসাবে থাকা অর্থের রিয়েল-টাইম তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে প্রতিদিন অর্থের সমন্বয়সাধন (রিকনসিলিয়েশন) করা সম্ভব হবে এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থে কোনো ঘাটতি বা অনিয়ম হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) আয়োজিত ‘আইপিএফ তহবিল বিতরণ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে’ এসব কথা বলেন তিনি। ব্রোকারেজ হাউজ কর্তৃপক্ষের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অর্থ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, পাঁচটি সিকিউরিটিজ হাউজে ৪৯২ কোটি টাকার আর্থিক অস্বচ্ছতার ঘটনায় ১৭ হাজার ৯৬৭ জন বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত হয়ে থাকা এই সমস্যার সমাধান প্রয়োজন ছিল। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি জানান, ডিএসইর সাথে ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী ব্যাক অফিস সফটওয়্যার চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই ডিজিটাল যুগে আমাদের এটাকে অবশ্যই করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন মাসুদ খান। বলেন, অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কঠিন জীবনযাপন করছেন। এ ধরনের ঘটনা পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা তৈরির অন্যতম কারণ। যারা আস্থা রেখে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের কষ্টার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা অন্য কোনো দেশে এত বড় পরিসরে ঘটে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।









