দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ

 নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই বিশাল শ্রমবাজারের বিপরীতে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারাই বলছেন, বর্তমান কাঠামোগত বাস্তবতায় ওই লক্ষ্য অর্জনের জন্য দেশের সক্ষমতা মাত্র ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্য ও সক্ষমতার ব্যবধান এখনো প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ।
সোমবার ঢাকার একটি হোটেলে ‘ন্যাশনাল কনসালটেশন অন স্কিলস, মাইগ্রেশন অ্যান্ড মোবিলিটি : দ্য ওয়ে ফরোয়ার্ড ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক জাতীয় পরামর্শ সভায় উঠে আসা তথ্য বিশ্লেষণে এই চিত্র বেরিয়ে এসেছে। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, দক্ষতা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিদেশী দূতাবাসের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং নেদারল্যান্ডসের র‌্যাডবাউড ইউনিভার্সিটির নেতৃত্বে পরিচালিত ‘গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজি ফর স্কিলস মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
লক্ষ্যের অর্ধেকের বেশি ঘাটতি ও সক্ষমতার সঙ্কট
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো: সাইফুল হক চৌধুরী বলেন, পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করতে হবে। বর্তমান ধারায় এ লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশের সক্ষমতা মাত্র ৫৫-৬০ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানোর ওপর জোর না দিয়ে কোন দেশের কোন খাতে কী ধরনের কর্মীর চাহিদা রয়েছে, সেই অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সনদের স্বীকৃতি নেই, সমন্বয়হীনতা প্রকট
দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো প্রশিক্ষণের পর অর্জিত সনদের গ্রহণযোগ্যতা। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) সদস্য মো: রাবিউল ইসলাম জানান, প্রায় সাত লাখ প্রশিক্ষণার্থী এনএসডিএ সনদ পেলেও দেশের ভেতরেই এসব সনদের স্বীকৃতি সন্তোষজনক নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশের বাজারে যে সনদের স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়, বিদেশের শ্রমবাজারে সেটি কিভাবে যথাযথ স্বীকৃতি পাবে?
এনএসডিএ সূত্রে জানা যায়, ২২টি মন্ত্রণালয় ও ৩৬টি সংস্থার সাথে সমন্বয়ের জন্য মাত্র ১৮ জন কর্মকর্তা রয়েছেন, যা বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তদারকিতে বড় বাধা।
প্রশিক্ষণ বাড়ছে, মিলছে না উপযুক্ত চাকরি
ওকাপের গবেষণা ব্যবস্থাপক উর্মি জাহানের উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা ছিল প্রায় ছয় লাখ ৯০ হাজার। একই সময়ে প্রায় ১৮ লাখ তরুণ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিলেও তাদের প্রায় ৪৫ থেকে ৪৭ শতাংশই উপযুক্ত কর্মসংস্থান পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
অন্যদিকে, দেশে প্রায় এক কোটি ৩৮ লাখ কর্মী আন্ডারএমপ্লয়মেন্ট বা তাদের সক্ষমতার তুলনায় কম আয়ের কাজে যুক্ত রয়েছেন। দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে।
চাহিদার সাথে প্রশিক্ষণের বড় অসামঞ্জস্য
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জাতীয় কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রাহনুমা সালাম খান উল্লেখ করেন, বহু বছর ধরে বিনিয়োগের পরও বিদেশগামী কর্মীদের ৭০ শতাংশের বেশি এখনো নিম্নদক্ষতার শ্রেণীতে রয়েছে। ফলে কর্মীরা বিদেশে গিয়েও নিম্ন মজুরি ও শোষণের শিকার হচ্ছেন।
ঢাকা টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মো: সাকাওয়াত আলী বাস্তব উদাহরণ দিয়ে জানান, অটোমোবাইল টেকনিশিয়ানের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও যদি নির্মাণকাজে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী পাঠানো হয়, তবে প্রশিক্ষণের সংখ্যা বাড়িয়েও কাক্সিক্ষত ফল আসবে না। বিএমইটির ১১০টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকলেও শিল্প ও বিদেশের বাজারের সাথে এর সংযোগ এখনো দুর্বল।
বৈধ ভিসার চেয়ে দালালকে অতিরিক্ত অর্থায়ন
ইতালির দূতাবাসের মাইগ্রেশন বিশেষজ্ঞ জিউসেপ্পে দি জিওভান্নি বৈধ শ্রম অভিবাসন ও অনিয়মিত পথের বৈপরীত্য তুলে ধরে জানান, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ইতালি বাংলাদেশীদের ২০ হাজারের বেশি কর্মভিসা দিলেও সমপরিমাণ মানুষ লিবিয়া হয়ে অনিয়মিত পথে দেশটিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। ইতালির কাজের ভিসার সরকারি ফি মাত্র ৬৫ ইউরো হলেও বাংলাদেশী কর্মীদের দালালদের পেছনে পাঁচ হাজার থেকে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। ফলে উচ্চ অভিবাসন ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কর্মীদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম সচিব লরা কার্তানিয়া ইয়াখ জানান, কারিগরি শিক্ষা সংস্কারে ইইউ প্রায় ৮০ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা দিলেও ‘ইইউ-বাংলাদেশ ট্যালেন্ট পার্টনারশিপের’ আওতায় প্রশিক্ষণ এখনো কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যকে শুধু ‘কতজন পাঠানো হলো’- এই সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে ‘কতজন দক্ষ, কতজন উপযুক্ত চাকরি পেলেন এবং কতজন নিরাপদ ও বৈধ পথে গেলেন’- সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণের সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সনদ এবং নিরাপদ অভিবাসনকে একই কাঠামোর আওতায় এনে একটি কার্যকর ‘ট্রেনিং-টু-জব’ মডেল গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।