
দেশের ব্যাংকিং খাতে এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা বিরাজ করছে। একদিকে সাধারণ মানুষের আস্থায় ব্যাংকে তরতর করে বাড়ছে আমানত, অন্যদিকে বিতরণ করা ঋণের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ আরো গভীর হচ্ছে। গতকাল প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬-এর সর্বশেষ ব্যাংকিং খাত পর্যালোচনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ১০.৭ শতাংশ বেড়ে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে ঋণ ও অগ্রিম ৪.৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ আট হাজার ৭০০ কোটি টাকায়।
তবে স্বস্তির এই খবরের আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় ধরনের ঝুঁকি। মোট ঋণের ৩৩.২ শতাংশই এখন শ্রেণীকৃত বা খেলাপি হয়ে আছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো- খুচরা বা ছোট ঋণের চেয়ে বড় অঙ্কের ঋণেই খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি। ফলস্বরূপ, ব্যাংকের তারল্য, মূলধন, প্রভিশন এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা- সবকিছুর ওপরই দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
১ বছরে আমানত বাড়ল ২ লাখ ১৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা
জুন ২০২৫-এ দেশের ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ছিল ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়, অর্থাৎ নিট প্রবৃদ্ধি প্রায় দুই লাখ ১৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত ১১.৬ শতাংশ বেড়ে পাঁচ লাখ ৩৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা হয়েছে। পাশাপাশি, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের আমানত ১১ শতাংশ বেড়ে ১৫ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের আমানত ১২.৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে ব্যতিক্রম চিত্র দেখা গেছে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোতে। এসব ব্যাংকের আমানত এক বছরে ১.৭ শতাংশ কমে তিন লাখ ৭৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় নেমেছে। বিদেশী ব্যাংকের আমানতেও সামান্য পতন লক্ষ্য করা গেছে।
মানুষের সঞ্চয়ই ব্যাংকের মূল ভরসা
ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের ৮৪ শতাংশই এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। এর মধ্যে এককভাবে পরিবারের (ঐড়ঁংবযড়ষফ) আমানতের অংশ ৫৬ শতাংশ। বাকি অংশ এসেছে অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন ও অলাভজনক সংস্থা থেকে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এক বছরে পরিবারের আমানত হিসাবের সংখ্যা ১৫ কোটি ৮৫ লাখ থেকে বেড়ে ১৭ কোটি ৪৩ লাখে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে পরিবারের মোট আমানত ১১ লাখ আট হাজার ৭০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১২ লাখ ৪৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যাংকিং খাতের মূল জ্বালানি জোগাচ্ছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু এই বিপুল আমানতের বিপরীতে বিতরণ করা ঋণের গুণগত মান দুর্বল হলে ঝুঁকির মুখে পড়েন সেই আমানতকারীরাই।
বড় ঋণেই বড় বিপদ : পরিসংখ্যান যা বলছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ঋণের আকারের সাথে খেলাপির ঝুঁকির এক স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। জুন ২০২৬ নাগাদ ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের ঋণ ছিল পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এই শ্রেণীতে শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণের হার ৪৩.৪ শতাংশ। আরো ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণের ক্ষেত্রে, যেখানে শ্রেণীকরণের হার ৪৬.৪ শতাংশ।
তুলনামূলকভাবে ছোট ঋণে খেলাপির হার কম: এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ: ১৫ শতাংশ খেলাপি। ১ থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণ: ২৬.৯ শতাংশ খেলাপি। ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণ: ৪৪.৬ শতাংশ খেলাপি।
এই পরিসংখ্যান প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। ব্যাংকের মোট ঋণের বড় অংশ যেসব বৃহৎ ঋণগ্রহীতা নিয়েছেন, তাদের ঋণের গুণগত ঝুঁকিই সবচেয়ে বেশি। ফলে ব্যাংকিং খাতের সঙ্কটকে কেবল ‘ছোট ঋণগ্রহীতারা টাকা ফেরত দিচ্ছেন না’- এভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বরং বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন, গ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই, জামানত মূল্যায়ন এবং পুরো ঋণ ব্যবস্থাপনা কাঠামোই আজ প্রশ্নের মুখে।
শিল্প ও বাণিজ্য খাতে ঋণের উচ্চ ঘনত্ব
ব্যাংকঋণের ৪৪ শতাংশ গেছে শিল্প খাতে এবং ৩৩ শতাংশ গেছে বাণিজ্য ও কমার্স খাতে। অর্থাৎ, মোট ঋণের ৭৭ শতাংশই এই দুই খাতে কেন্দ্রীভূত। এর মধ্যে শিল্প খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ৩২.৫ শতাংশ এবং বাণিজ্য ও বাণিজ্যে তা ৪৪.১ শতাংশ।
অন্যদিকে, কৃষি, মৎস্য ও বন খাতে মোট ঋণের অংশ ৪.৩ শতাংশ (খেলাপি ২৮.৪ শতাংশ), নির্মাণ খাতে ৬.৬ শতাংশ (খেলাপি ৩২.৫ শতাংশ) এবং পরিবহন খাতে মাত্র ০.৫ শতাংশ হলেও খেলাপি ২৯.৭ শতাংশ।
শিল্পের আকারভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, বড় শিল্প খাত মোট ঋণের ৬০ শতাংশ দখল করে আছে এবং এই খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ৩৯.৬ শতাংশ। অন্যদিকে কুটির শিল্পে খেলাপি ৪৬.২ শতাংশ, ক্ষুদ্র শিল্পে ৩৫.১ শতাংশ এবং মাঝারি শিল্পে ৩৮.৭ শতাংশ। ঈগঝগঊ এবং অনানুষ্ঠানিক খাত মিলে মোট ঋণের ২০.৫ শতাংশ থাকলেও সেখানে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ৩৫ শতাংশ। ফলে শুধু বড় উদ্যোক্তা নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও খেলাপির চাপ রয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক ও চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকে সঙ্কট বেশি
ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক শ্রেণীকৃত ঋণের হার ৩৩.২ শতাংশ হলেও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তা ৫৮.৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে এসব ব্যাংকের আমানত ১.৭ শতাংশ কমলেও ঋণ ও বিনিয়োগ বেড়ে চার লাখ ৮৪ হাজার ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ইসলামী ব্যাংকগুলোর অ্যাডভান্স-ডেপোজিট রেশিও (এডডঅঠও) জুনে ১২৭.৭ শতাংশে উঠেছে, যেখানে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে এডডঅঠও হলো ৮১.৮ শতাংশ। এটি তাদের তারল্য ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
প্রজন্মভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শ্রেণীকৃত ঋণের হার ৫১.৬ শতাংশ। প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকে এ হার ৩৫.২ শতাংশ এবং তৃতীয় প্রজন্মে ৩০.৪ শতাংশ। বিপরীতে পঞ্চম প্রজন্মের ব্যাংকে তা মাত্র ৩.১ শতাংশ এবং বিদেশী ব্যাংকে ৬.৫ শতাংশ। এতে প্রমাণিত হয় যে ব্যাংকের বয়স বা আকার নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতাই সম্পদের মান নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
আমানতকারীর প্রকৃত আয় ও অন্যান্য সূচক
নেতিবাচক প্রকৃত রিটার্ন: আমানতের নামমাত্র সুদ পাওয়া গেলেও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় প্রকৃত সুদের হার নেতিবাচক রয়েছে। তা সত্ত্বেও মানুষ ব্যাংকের নিরাপত্তা ও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর ভরসা করে আমানত বাড়িয়ে চলেছে।
ধীরগতির ঋণপ্রবাহ : জুন ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকঋণ বেড়েছে মাত্র ৪.৩ শতাংশ। আমানত বৃদ্ধির তুলনায় ঋণ বিতরণ কম হওয়ায় সামগ্রিক এডিআর ৮৬.৯ শতাংশ থেকে কমে ৮১.৮ শতাংশে নেমেছে। এটি ব্যাংকের তারল্য স্বস্তি বাড়ালেও অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ শ্লথ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
নারীর অংশগ্রহণ : পরিবারের আমানত হিসাবে নারীদের অংশ ৩৯ শতাংশ এবং অর্থমূল্যে ৩৩.৭ শতাংশ হলেও, ঋণ গ্রহণে নারী হিস্যা মাত্র ১৮ শতাংশ। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরবর্তী ধাপে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তির বাধা দূর করা জরুরি।
ব্যাংকিং খাতের সামনে প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ
বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ব্যাংকের সামনে তিনটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে ওঠে: ১. বড় ঋণের মান যাচাই: ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে ৪৩.৪ শতাংশ খেলাপি হওয়ায় বড় ঋণ অনুমোদন ও তদারকি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। ২. ইসলামী ব্যাংকের তারল্য ও সম্পদমান: ১২৭.৭ শতাংশ এডিআর এবং ৫৮.৯ শতাংশ খেলাপি ঋণের দ্বৈত চাপ সামলাতে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে বিশেষ তদারকি দরকার। ৩. আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা: নেতিবাচক প্রকৃত সুদের হার এবং উচ্চ ঋণ ব্যয়ের কারণে এসএমই ও পরিবারগুলোর ওপর যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তার সুষম সমাধান করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে শুধু নতুন আমানত সংগ্রহ বা ঋণ বিতরণের পরিমাণ দিয়ে সাফল্য পরিমাপ করা যাবে না। মূল প্রশ্নটি হলো- ঋণের টাকা কার কাছে যাচ্ছে এবং তা নিরাপদে ফেরত আসছে কি না।
শ্রেণীকৃত ঋণের হিসাবের সংখ্যা সামান্য কমা মানেই সামগ্রিক ঝুঁকি কমে যাওয়া নয়, বিশেষ করে যখন বড় অঙ্কের অর্থ মুষ্টিমেয় কিছু খেলাপি গ্রাহকের কাছে আটকে থাকে। তাই ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে থাকা বিপুল ঋণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সুশাসন জোরদার করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা আমলে নিয়ে কার্যকর সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এই সঙ্কট উত্তরণে বড় ঋণগ্রহীতাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোর পর্ষদ এবং নিয়ন্ত্রণ সংস্থার তদারকি আরো কতটা কঠোর হওয়া উচিত বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।









