
মেয়াদ শেষের চার দিন আগে ‘ডিইউ টিসার্চ ইভালুয়েশন’ নামে একটি সাইট চালু করে বর্তমান ডাকসু। সেখানে শিক্ষকদের মূল্যায়ন নিয়ে ফলাফল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও। উন্নত দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের মূল্যায়ন খুবই স্বাভাবিক ও সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিং বৃদ্ধিতে তা সহায়ক। একই কারণে ডাকসুর এই সাইটে হাজার হাজার রিভিউ জমা পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলি ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম এবং যোগাযোগ বিভাগের প্রভাষক কে এম এম আশফাক উল মুশফিকের সাথে। তরুণ এই শিক্ষক এর আগে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ছাড়াও ডেইলি স্টার ও টি স্পোর্টসে সাংবাদিকতা করেছেন।
তিনি বলেন, কেমন শিক্ষা অর্জন করতে চায় শিক্ষার্থী সে নিয়ে তাদের চোখে শিক্ষকদের মূল্যায়নের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠতে পারে চমৎকার একটা বোঝাপড়ার সম্পর্ক। জ্ঞান চর্চায় আত্মিক এ সম্পর্ক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বন্ধনকে আরো মজবুত করতে সহায়তা করতে পারে। বিউপিতে ছাত্র থাকার সময় দেখেছি ফ্যাকাল্টি ইভালুয়েশন ছিল। ইংল্যান্ডে মাস্টার্স করতে যেয়ে দেখলাম এটা বাধ্যতামূলক। শিক্ষক হিসেবে অবগত থাকতে পারি আমার ছাত্র আমাকে কিভাবে নিচ্ছে, শিক্ষাদানের শক্তিশালী কোন দিকটি অ্যাপ্রিশিয়েট করছে, তারা আমার ক্লাস নেয়ার কোন কোন ধরনটাকে মনে করছে আরো ইমপ্রুভ করা যেত, ফলে অ্যাকাডেমিক এক্সিসিলেন্সের ক্ষেত্রে পরের সেমিস্টারে সেটি ইমপ্রুভ করার সুযোগ থাকে। ফ্যাকাল্টি হিসেবে ছাত্রদের সাথে আমার পেশাগত সম্পর্কের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নয়া দিগন্ত : শিক্ষার্থীদের চাহিদার দিকটি সম্পর্কে শিক্ষকও আগাম প্রস্তুতি নিতে পারেন কি?
আশফাক উল মুশফিক : ডেফিনিটলি। কারণ মূল্যায়নে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা আকাক্সক্ষার কথা তুলে ধরে। শিক্ষাদান পদ্ধতি ইমপ্রুভ ছাড়াও এটি যদি তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে তাহলে তা কমানো যেতে পারে।
নয়া দিগন্ত : ক্লাসে শিক্ষার্থীরা কিভাবে শিক্ষকদের পাঠদানে সাড়া দিচ্ছে এটা উভয়ের আচরণ থেকেও উপলব্ধি করা যায়, সেটি কি মূল্যায়নে উঠে আসে?
আশফাক উল মুশফিক : প্রশ্নগুলো সেভাবেই তৈরি করা হয়, কিছু থাকে ক্লাসের সিলেবাসের ওপরে, কিছু থাকে শিক্ষকদের ডেলিভারের ওপরে, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সাথে কিভাবে কমিনিকেট করছে, সবগুলোর ওপর আলাদা আলাদা প্রশ্ন থাকে।
নয়া দিগন্ত : শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার একটা জায়গা তৈরি হয়, এটার ঘাটতিও কি আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়?
আশফাক উল মুশফিক : মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের নাম থাকে না। তাদের মূল্যায়নটা বা সরাসরি নাম্বারিংটা আমরা দেখি। অনেক শিক্ষার্থী টেনশনে থাকে যে, এ ফিডব্যাকটা দিচ্ছি, এতে কোনো ফ্যাকাল্টি তার ওপর কোনো রিভেঞ্জ নিবে কি না কোনো কারণে, নর্থসাউথে যখন ছিলাম, বিউপিতে বা ইংল্যান্ডেও দেখেছি কোনো ফ্যাকাল্টি কোনো শিক্ষার্থীর নাম দেখতে পেত না, শুধু অ্যানানিমাস ইভালুয়েশনটা দেখতে পেত।
নয়া দিগন্ত : শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের এধরনের মূল্যায়ন কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিংয়ে উন্নতিতে সহায়তা করতে পারে?
আশফাক উল মুশফিক : অবশ্যই। র্যাংকিংয়ের যে ফ্যাক্টরগুলো থাকে তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশি বেশি গবেষণার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিই; কিন্তু সেটি ছাড়াও যখন ফ্যাকাল্টি ও ছাত্রদের মধ্যে বোঝাপড়াটা ভালো থাকে এবং সেটি মূল্যায়নে উঠে আসে তখন এ ধরনের ফিডব্যাক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিং আপডেট করতে সহায়তা করে। এমপ্লয়ি স্যাটিসফেকশন মানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বোঝাপড়া আলটিমেটলি ভালো রেজাল্ট করতে সহায়তা করে। দক্ষ জনশক্তি গড়ে ওঠার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ পরিচিতি পায়। খুব স্বাভাবিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র্যাংকিংয়ে এগিয়ে যায়।
নয়া দিগন্ত : আশপাশের দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে আছে, গবেষণায় তহবিলের অভাব, পুরনো সিলেবাস, চাহিদার সাথে মিল রেখে সিলেবাস আপডেটা না করা, রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির অংশ হিসেবে হল দখল, চাঁদাবাজি, দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি তো দেখে আসছি... জুলাই আন্দোলনের পর শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এরা সবাই তো একটা পরিবর্তন চাচ্ছে; আপনি কী বলেন?
আশফাক উল মুশফিক : খুব স্বাভাবিকভাবে শিক্ষকদের মূল্যায়ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে সাহায্য করবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল কাজ তো যুগোপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার ক্ষেত্রে দক্ষতা বা অ্যাকাডেমিয়াটা। রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরা অ্যাকাডেমিয়াটাকে প্রাধান্য দিই তাহলে যেটা হওয়া উচিত বেয়ার মিনিমাম, তখন ফ্যাকাল্টি ইভালুয়েশন মিনিমাম ক্রাইটেরিয়ার মধ্যেই পড়ে, সেটি ইউনিভার্সিটিকে আরো ইমপ্রুভ করবে খুবই স্বাভাবিক।
নয়া দিগন্ত : পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাদান পদ্ধতির মধ্যে অনেক ফারাক আছে, অনেকে বলেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাদান পদ্ধতি বা উপকরণের দিকে নজর রাখে, তো শিক্ষকদের মূল্যায়ন তো এখানে সহায়ক ভূমিকা নিতে পারে?
আশফাক উল মুশফিক : মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের যখন জিজ্ঞাসা করা হবে আপনার ফ্যাকাল্টি আপনাকে যে বিষয়ে পড়াচ্ছে তা সমসাময়িক বিষয়ের সাথে আপ টু দি মার্ক কি না, যেমন জার্নালিজমের কথাই বলি যে, নিউমিডিয়ার সাথে কনসেপচুয়াল করে পড়াতে পারছি কি না নাকি ট্রাডিশনাল প্রথার মধ্যেই রয়ে গেছে, এ রকম কোশ্চেনয়ারে শিক্ষার্থীরা যখন তাদের মতামত দেবে, ফ্যাকাল্টিরাও নিজ থেকে স্বাভাবিকভাবে চেষ্টা করবে যেহেতু শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক তারা দেখতে পাবেন। তারাও তাদের পাঠদানপদ্ধতি ইমপ্রুভ বা মডার্নাইজ করার চেষ্টা করবেন।
নয়া দিগন্ত : দুর্ভাগ্যজনকভাবে দলীয়করণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ঘটনা ঘটে, যার ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাচাহিদা তাদের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব হয় না, এ ঘাটতিও তো মূল্যায়নে উঠে আসবে?
আশফাক উল মুশফিক : মূল্যায়ন পেলে শিক্ষকরা স্বাভাবিকভাবে নিজেদের পরিবর্তনে উৎসাহী হয়ে উঠবেন। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে ইভালুয়েশন কিন্তু জাস্ট ফর শো, খুব একটা ইন দা লং রান তাদের যে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয় অমন না। অন পেপার বা কাগজ কলমে দেখছি এমন একটা ইভালুয়েশন থাকলে হয়তো শিক্ষাদান পদ্ধতি ইমপ্রুভ হবে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যেমন ফিডব্যাকটা আসতে হবে আবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে আদতে কী হচ্ছে, দলীয়করণের জন্যে কোনো শিক্ষার্থীর রেজাল্ট খারাপ হয়ে গেলে বা কমপ্লেইন হোক বা ইভালুয়েশন আকারে আসুক সেটিকে খতিয়ে দেখাটাও বেশ জরুরি। ফর দি শো ইভালুয়েশন থাকল তাহলে তো আগের মতোই পরিস্থিতির কোনো হেরফের হবে না।
নয়া দিগন্ত : মজার ব্যাপার যে ইভালুয়েশনের মধ্যে শিক্ষকরা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা চাহিদাকে জোগান দিতে মনোযোগী হবেন, তাদের মধ্যে জ্ঞানবিনিময়ে একটা প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে কি?
আশফাক উল মুশফিক : তাতো অবশ্যই।
নয়া দিগন্ত : কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তা পরিবর্তন জরুরি নয় কি?
আশফাক উল মুশফিক : দিন শেষে আমি চাইব মূল্যায়নের মাধ্যমে আমার প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন হোক, ইভালুয়েশনটাকে যদি ঠিকভাবে ইউটিলাইজ করতে পারি, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন হলে সবদিক থেকে এটা উইন উইন সিচুয়েশন তৈরি করবে।
নয়া দিগন্ত : ক্লাস না নেয়া, রাজনীতি বা কনসালট্যান্সিতে জড়িয়ে পড়া- এমন অভিযোগ থেকে এ ধরনের মূল্যায়ন কি প্রকৃত অর্থে শিক্ষকদের সহায়তা করবে?
আশফাক উল মুশফিক : শিক্ষার্থীরা যে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করবে সে ক্ষেত্রে তাদের প্রাইভেসিটা যেন ইনশিওর করা যায় এটা নিশ্চিত করতে হবে। রাগবশত কেউ যদি সেই শিক্ষার্থীর ওপর আরো চড়াও হয়ে ওঠে, ইভালুয়েশন না থাকার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে কোনো কারণে কোনো শিক্ষক কোনো শিক্ষার্থীকে পছন্দ করেন না তো তাকে নম্বর কম দেয়া বা কোনো কোর্সে আটকে দেয়া এমনটা যাতে না হয়। নৈতিক দিক থেকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
নয়া দিগন্ত : ডাকসুর পক্ষ থেকে শিক্ষকদের মূল্যায়ন প্রচেষ্টাকে কি পজিটিভ দেখছেন?
আশফাক উল মুশফিক : ইনিশিয়ালি পজিটিভ তবে এ মূল্যায়ন যদি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয়ভাবে করতে পারে তাহলে স্ট্রাকচারলি এটাকে আরো শক্তিশালী কাঠামোতে করা যাবে। বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় প্রপার একটা ওয়েতে নিতে পারলে ভালো হয়।








