জাতিসংঘ
মতামত সংগৃহীত

আহসান হাবিব বরুন
বিশ্বরাজনীতি ও ভূ-রাজনীতির বর্তমান জটিল প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম বা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (UNGA) কেবল আনুষ্ঠানিকতার কোনো মঞ্চ নয়; বরং এটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিজেদের সার্বভৌম অবস্থান, জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং কূটনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরার এক বিশাল ক্ষেত্র। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বহুধাবিস্তৃত সমীকরণের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সফরটি বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতি ও বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে এক গভীর সম্ভাবনা ও নতুন দিগন্তের সুবাতাস নিয়ে এসেছে। 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীর তালিকাটি তুলনামূলক ছোট ও সুনির্দিষ্ট রাখা হচ্ছে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকা ছেড়ে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত ও কর্মমুখী সফরের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ।
 
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা দরকার যে, রাজনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনায় পরিবারের ধারাবাহিকতা বিশ্ব ইতিহাসে বহু দেখা গেছে। ভারতের নেহরু-গান্ধী পরিবার, পাকিস্তানের ভুট্টো পরিবার, শ্রীলঙ্কার বন্দরনায়েকে পরিবার, কানাডার ট্রুডো পরিবার কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের বুশ পরিবারের নাম আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সামাজিকভাবে সুপরিচিত। তবে বাংলাদেশ ও বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় জিয়া পরিবার একটি অনন্য ও অভূতপূর্ব রেকর্ডের জন্ম দিতে যাচ্ছে। একই পরিবারের পিতা, মাতা এবং সন্তান—তিনজনই নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রতিনিধিত্ব করছেন, এমন উদাহরণ বিশ্ব ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ অর্জনের পর ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে ঐতিহাসিক বক্তব্য রাখেন। তৎকালীন বৈশ্বিক স্নায়ুযুদ্ধ, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও তৃতীয় বিশ্বের ঋণসঙ্কটের বিরুদ্ধে কথা বলে তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। তার উত্তরসূরি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে ৪৮তম অধিবেশনে, ২০০২ সালে বিশেষ শিশু সম্মেলনে এবং ২০০৫ সালে ৬০তম অধিবেশনে অংশ নিয়ে বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন। তারই ধারাবাহিকতায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
 
দক্ষিণ আমেরিকার গায়ানার ড. চেদ্দি জাগান ও জ্যানেট জাগান রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে প্রতিনিধিত্ব করলেও তাদের সন্তানরা রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না। সেদিক থেকে বিচার করলে, বাবা, মা এবং সন্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে জাতিসংঘের প্রধান অধিবেশনে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে জিয়া পরিবার বিশ্ব ইতিহাসে সম্পূর্ণ এক ও অদ্বিতীয় অবস্থানে অধিষ্ঠিত। 

তবে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্লেষণে পারিবারিক উত্তরাধিকারকে রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক সাফল্যের একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা সমীচীন নয়। একটি পরিবারের একাধিক সদস্য রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা; কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের অবস্থান নির্ধারিত হয় তার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক দক্ষতা, জনগণের স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির মাধ্যমে। তাই তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে—তিনি কীভাবে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করেন।

বাংলাদেশের বহুপক্ষীয় কূটনীতির ইতিহাসে জাতিসংঘ বরাবরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। এর কয়েক বছরের মধ্যেই ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয় এবং ১৯৭৯–৮০ মেয়াদে প্রথমবার ও ২০০০–০১ মেয়াদে দ্বিতীয়বার নিরাপত্তা পরিষদে দায়িত্ব পালন করে। ১৯৭৮ সালের নির্বাচনটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ ও বিশ্বের অন্যতম ধনী ও শক্তিশালী রাষ্ট্র জাপান মুখোমুখি হয়েছিল। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান এবং শহীদ জিয়াউর রহমানের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর ভর করে ভোটের কয়েক দফার পর জাপানের মতো শক্তিশালী দেশকে পরাজিত করে বাংলাদেশ জয়ী হয় এবং শেষপর্যন্ত জাপান প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ঘটনাটি বাংলাদেশের নবীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার এক ঐতিহাসিক স্বাক্ষর বহন করে।
 
এবারের ৮১তম অধিবেশনে তৈরি হয়েছে আরো একটি অভাবনীয় ও গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ২০২৬ সালের ২ জুন জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’। অর্থাৎ বাংলাদেশের একজন শীর্ষ কূটনীতিক যখন সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে থেকে বিশ্বসভা পরিচালনা করছেন, ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই বিশ্বমঞ্চে দেশের জাতীয় বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক উপস্থিতির জন্য নিঃসন্দেহে এক বিরল ও সুবর্ণ সুযোগ।
 
এই সফরের একটি বিশেষ তাৎপর্য হলো—এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণ। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নতুন সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন-রূপরেখা তুলে ধরার বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের ভাষ্যমতে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের নতুন যাত্রা এবং ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ তুলে ধরাই হবে এই সফরের অন্যতম মুখ্য উদ্দেশ্য।
 
সবচেয়ে বড় কথা হল, বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এবারের সাধারণ পরিষদ সামগ্রিকভাবেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিভিন্ন অঞ্চলের যুদ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ, উন্নয়ন অর্থায়ন, শরণার্থী সঙ্কট এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সঙ্কট—সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বব্যবস্থা এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের তালিকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু কার্যক্রম, মহামারি মোকাবিলা ও পারমাণবিক অস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি স্থান পেয়েছে।

এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘের মঞ্চে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, নগরায়ণ ও জাতীয় অর্থনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা সঙ্কট। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত বিপুল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। সাধারণ পরিষদের পার্শ্ববর্তী কর্মসূচিতে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে বাংলাদেশ আয়োজিত বিশেষ আলোচনাও রাখা হয়েছে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থায়ন ও প্রযুক্তির রূপান্তর। অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও সহজতর অর্থায়ন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
 
সফরের সংক্ষিপ্ত সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকের তালিকাটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের এক বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া নৈশভোজে অংশগ্রহণের পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিছুদিন আগে চিঠি দিয়ে সাক্ষাৎ করার আগ্রহ প্রকাশ করায় তার সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শ্রমমান ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে। এছাড়া কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাথে বৈঠক থেকে বাণিজ্য, দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ, শিক্ষা সহযোগিতা ও প্রবাসীদের কল্যাণের ক্ষেত্র জোরদার হবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সাথে সাম্প্রতিক সময়ের যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় বাণিজ্য, আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি, সার্ক পুনরুজ্জীবিত করা, কৃষি ও শিক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
 
সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সাথে বৈঠকের মাধ্যমে শ্রমবাজার সংস্কার, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রবাসীদের কল্যাণ এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বার উন্মোচিত হবে। একই সাথে কুয়েতের যুবরাজ শেখ সাবাহ আল-খালিদ আল-সাবাহর সাথে জনশক্তি ও জ্বালানি খাত, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগের সাথে জলবিদ্যুৎ আমদানি ও উপ-আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের সাথে বাণিজ্য ও পর্যটন এবং ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেঙ্কোভিচের সাথে ইউরোপীয় অঞ্চলের বাণিজ্য জোরদারের অবকাশ রয়েছে।

পাশাপাশি বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর প্রধানদের সাথে সম্ভাব্য বৈঠকগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সাথে বৈঠক থেকে উন্নয়ন অর্থায়ন, ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার এবং বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে। বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ডান নেলসনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সম্ভাবনা খুলবে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তার সাথে বৈঠকের মধ্য দিয়ে জিএসপি সুবিধা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার ধরে রাখা, শ্রম অধিকার এবং জলবায়ু অর্থায়নে গতি আসতে পারে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাথে আলোচনার সুযোগ রয়েছে শান্তিরক্ষা মিশনে ভূমিকা বৃদ্ধি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে। তদুপরি, মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক এবং শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহের সাথে বৈঠকের মাধ্যমে নতুন সরকারের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে।
 
বাংলাদেশের সামনে একই সাথে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা ও জটিল আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ। ১৮ কোটি মানুষের বাজার, বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, তৈরি পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, কৃষি, সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রবাসী আয় এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু ঝুঁকি, রোহিঙ্গা সঙ্কট ও বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতা—এসব চ্যালেঞ্জও কঠিন বাস্তব সত্য।
 
তাই নিউইয়র্কে বাংলাদেশের বার্তা হওয়া প্রয়োজন উচ্চকণ্ঠ ঘোষণার চেয়ে বাস্তব সক্ষমতার বার্তা। বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য স্বচ্ছতা, প্রতিবেশীদের জন্য পারস্পরিক সম্মান, শ্রমবাজারের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য ন্যায্য অর্থায়ন এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য দায়িত্বশীল অংশীদার—বাংলাদেশকে এই বহুমাত্রিক পরিচয় একসাথে তুলে ধরতে হবে। বাংলাদেশের কূটনীতিতে এখন প্রয়োজন বহুমুখী বন্ধুত্ব, ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারত্ব এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক বহুপক্ষীয়তা। কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি অকারণ দূরত্বও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুযোগ সংকুচিত করতে পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কিন্তু স্বাধীন ও সার্বভৌম কূটনীতিই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মূল ভিত্তি।
 
পরিশেষে বলা যায়, জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য যেখানে বিশ্বজুড়ে আস্থা পুনর্গঠন এবং পরিবর্তনকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার আহ্বান জানাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একই : নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে, অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কীভাবে টেকসই উন্নয়নে এবং আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বকে কীভাবে বাস্তব জাতীয় স্বার্থে রূপান্তর করা যাবে। ২১ সেপ্টেম্বরের যাত্রা থেকে ২৪ সেপ্টেম্বরের জাতিসংঘ ভাষণ এবং ২৫ সেপ্টেম্বর প্রত্যাবর্তন—সময় হয়তো খুব বেশি নয়; কিন্তু সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থের লক্ষ্যে ব্যবহৃত প্রতিটি কূটনৈতিক বৈঠক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্কে প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ তাই কেবল একটি সাধারণ বক্তৃতা হবে না—এটি হবে নতুন বাংলাদেশের বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
 
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।