
গত ১৮ অক্টোবর বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভা আবদুল গনি রোড থেকে শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে— ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন স্থানে অফিস কার্যক্রম শুরু করা। বৈঠকটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। ইতোমধ্যে এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করেছে শেরেবাংলা কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়সহ সচেতন নাগরিক সমাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেছেন, এই এলাকার মেলার অবকাঠামোও ভাঙচুর হয়েছে। সরকার একে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখছে। আসলে এটি সঠিক পরিকল্পনার সঙ্কট। সে জন্য প্রশ্ন উঠেছে— প্রকল্পটির লাভ-ক্ষতির হিসাব কি সত্যি কষা হয়েছে? এ লেখায় অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সামাজিক, এই তিন দিক থেকে প্রকল্পের ভালো-মন্দ পাশাপাশি রেখে বিচার করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ : প্রয়োজন সত্য, স্থান নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ
ন্যায্য বিচারে আগে প্রকল্পের শক্তিশালী দিকগুলো স্বীকার করা দরকার। বর্তমান সচিবালয় যে অপ্রতুল, তা কেউ অস্বীকার করছেন না। ১৭ দশমিক ৫৭ একরের এ চত্বরে ১৩টি ভবন আছে, যার আটটি স্বাধীনতার আগে নির্মিত। ৫৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে প্রায় ৩৮টি সচিবালয়ে, বাকিগুলো বাইরে। বহু মন্ত্রণালয় ভাড়া করা বা দূরবর্তী ভবনে চলছে। জায়গার সঙ্কট, নিরাপত্তা ঝুঁঁকি ও সমন্বয়ের অভাবের যুক্তি সরকারের পক্ষে ন্যায্য।
অর্থনৈতিক দিক থেকে সব দফতর এক চত্বরে এলে সমন্বয় সহজ হবে। সময় বাঁচবে এবং ভাড়া করা ভবনের খরচ কমতে পারে। তবে কত খরচ কমবে তা প্রকাশ করা হয়নি। আগে সচিবালয়ের বর্তমান স্থানে ২১তলা নতুন ভবন করার বদলে স্থানান্তরের সমীক্ষা চাওয়া হয়েছিল। নতুন স্থানে গেলে পুরনো চত্বরে আর নতুন ভবন লাগবে না, আর সেখানে ঢাকার ডিসি অফিসের মতো সরকারি দফতর বসানোর সম্ভাবনাও আছে।
পরিবেশের দিক থেকে সরকার বলছে, প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ সবুজ ও জলাশয়ের জন্য রাখা হবে। সামাজিক দিক থেকে সেবাপ্রার্থীদের এক জায়গায় সব দফতরে যাওয়ার সুযোগ মিলবে। আগারগাঁওয়ে মেট্রোরেল স্টেশনও আছে। এগুলো খাঁটি সুবিধা। তবে সেটি এই নির্দিষ্ট মাঠে হতে হবে, তা প্রমাণিত হয় না। নকশা অনুযায়ী, পুরনো বাণিজ্য মেলার প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমিতে তিন বেজমেন্টসহ ১২ তলার ১৪টি ভবন নির্মিত হবে। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা, সাথে নতুন সড়কও নির্মাণ করতে হবে। এ বিশাল অঙ্কের টাকা অন্য কোনো খাতে ব্যয় করলে জাতি এর চেয়ে বেশি উপকৃত হতো কি না; এতদসংক্রান্ত সুযোগ ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে কিনা তা সরকার প্রকাশ করেনি বা জনগণ জানতে পারেনি। এত বড় প্রকল্প অনুমোদনের আগে এসব যাচাই-বাছাই প্রত্যাশিত। তা হয়েছে বলে জানা যায় না।
পরিবেশের হিসাব : ৭০ শতাংশ কংক্রিট
সরকারের ৩০ শতাংশ সবুজের প্রতিশ্রুতির উল্টো পিঠ হলো— একটি খোলা সবুজ মাঠের প্রায় ৭০ শতাংশ ভবন ও পাকা অবকাঠামোর দখলে যাবে। নকশায় তিন বেজমেন্টসহ ১২ তলার ১৪টি ভবনের কথা আছে। শেকৃবির এক শিক্ষক সতর্ক করেছেন, দু’টি নান্দনিক এলাকার মাঝখানে বিশাল কংক্রিটের কাঠামো সবুজ পরিবেশ নষ্ট করবে এবং শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার চেষ্টা ব্যাহত করবে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, নগর-তাপদ্বীপ ও বায়ুদূষণের প্রশ্নে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও গণশুনানি জরুরি ছিল। প্রকাশ্যে তেমন কিছু দেখা যায়নি। জনগণের করের টাকা খরচ করতে হলে এসব তথ্য প্রকাশ করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব।
সামাজিক হিসাব : আস্থার সঙ্কট
প্রথম সামাজিক ক্ষতি-জমির বিরোধ। শেকৃবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মাঠটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি বলে দাবি করছেন। এক শিক্ষার্থীর কথায়, গবেষণায় পর্যাপ্ত জমি তাদের নেই এবং মাঠটি মূলত বিশ্ববিদ্যালযের ছিল। আন্দোলনকারীরা মাটি পরীক্ষার সরঞ্জাম ও দু’টি গাড়ি নিয়ে গেছেন, মেলার একটি ফটক ও কয়েকটি অবকাঠামো ভাঙচুরও করেছেন। এ ভাঙচুর সমর্থনযোগ্য নয়। আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে আলোচনা করলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। সরকারি জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ মন্ত্রিসভার ব্রিফিংয়ে মীমাংসা হয় না। দরকার দলিলপত্র, শুনানি এবং প্রয়োজনে বিকল্প জমি বা গবেষণা-জমির নিশ্চয়তাসহ সমঝোতা। অনুমোদনের আগে এসবের কোনো উদ্যোগের চিহ্ন প্রকাশ্যে নেই। দ্বিতীয় ক্ষতি-বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সমাজের সাথে আলোচনা ছাড়া সিদ্ধান্ত নেয়ায় সরকারের প্রতি আস্থা কমে।
যানজট : এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন যানজট। স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে, ২০২৬ সালে লুই কানের ১৯৬৯ সালের নকশা অনুসরণ করা অনুচিত, কারণ শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁওয়ে বহু সরকারি স্থাপনা গড়ে উঠেছে এবং সেখানে তীব্র যানজটের ঝুঁঁকি আছে। প্রকল্পের সাথে যুক্ত সূত্রগুলো স্বীকার করছে, স্থানান্তরের পর প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে যানজট। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছিলেন, যানজট ব্যবস্থাপনার প্রভাব সতর্কভাবে বিবেচনা করা দরকার। অতীতে ঢাকা মহানগর পুলিশও আপত্তি তুলেছিল। সংসদ ভবন, হাসপাতাল ও সম্মেলন কেন্দ্রের চাপে থাকা সড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার কর্মকর্তা, সেবাপ্রার্থী ও গাড়ি যুক্ত হবে।
এখানে একটি দ্বিমুখী ঝুঁকি আছে। নতুন স্থানে ঢুকবে হাজার হাজার কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সেবাপ্রার্থীর গাড়ি। আর রমনায় যানজট কমবে কি না, তাও নিশ্চিত নয়, কারণ পুরনো সচিবালয়ের স্থানে ডিসি অফিস ও অধস্তন আদালত সরানোর কথা উঠেছে। আদালত ও জেলা প্রশাসনে প্রতিদিন বিপুল মানুষ আসেন। ফলে ঢাকার এক জায়গার জট দূর করার ঘোষণা করে দুই জায়গায় জট তৈরির ঝুঁঁকিতে পড়তে পারে।
বারবার উল্টে যাওয়া সিদ্ধান্ত
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো প্রকল্পের ইতিহাস। উদ্যোগটি বহুবার নেয়া হয়েছে, আবার বাদও পড়েছে। ২০০৯ সালের পর পতিত আওয়ামী লীগ সরকার আগারগাঁওয়ের বাণিজ্যমেলার মাঠে সচিবালয় সরানোর উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। ২০২২ সালে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তার কারণে পরিকল্পনা স্থগিত হয়েছে। গণভবন কাছে এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আপত্তি ছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, এলাকার পরিবেশ বদলে গেছে। সেই সাথে এটি আর উপযুক্ত বিবেচিত হচ্ছে না। ভবিষ্যতে পূর্বাচলের কথা ভাবা হচ্ছিল। আরো আগে লুই কানের মূল নকশা সংযুক্ত না থাকায় একনেক প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়েছিল।
২০২২ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়তো বদলেছে; কিন্তু ভূগোল বদলায়নি। যে আপত্তিগুলো একসময় প্রকল্প থামানোর মতো গুরুতর বিবেচিত হয়েছিল, আজ কেন সেগুলো গুরুত্বহীন, সরকারকে তা ব্যাখ্যা করতে হবে। বরং পূর্ববর্তী সরকারের যুক্তি কোনো মন্তব্য ছাড়া সরিয়ে রাখা হয়েছে। লুই কানের নকশাকেও যেন অলঙ্ঘ্য বিধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। অথচ সেটি আঁকা হয়েছিল আজকের তুলনায় অনেক কম জনসংখ্যা ও যানবাহনের যুগে। ইকবাল হাবিবের মতে, নকশা পথ দেখাতে পারে, স্থান নির্ধারণ করে দিতে পারে না।
সরকারের অগ্রাধিকার কি ভবন তৈরি নাকি বেকারত্ব হ্রাস
সরকারের অগ্রাধিকার কি ভবন তৈরি, নাকি বেকারত্ব হ্রাস? নাকি আরো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নজর দেয়া? নতুন এ ভবন কোন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে? না। তাহলে কেন এত বিশাল ব্যয় এখানে দরকার। পতিত আওয়ামী লীগের মতো দলীয় ঠিকাদারি ব্যবসা? এ প্রশ্ন উঠবে। তাই নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান, দ্রব্য মূল্য হ্রাসসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় সরকারের নজর দেয়া দরকার। বিএনপি সরকারের ইশতেহারে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির প্রতিশ্রুতির আলোকে ব্যয়বহুল প্রশাসনিক ভবনের আগে তরুণদের জীবিকার সুযোগ সম্প্রসারণ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। প্রশাসনিক অবকাঠামোর প্রয়োজন আছে। তবে নতুন ভবন জনসেবায় কতটা উন্নতি আনবে এবং একই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করলে কী সুফল মিলবে, তার তুলনামূলক মূল্যায়ন অপরিহার্য। এ ‘সুযোগ ব্যয়’ উপেক্ষা করলে দৃশ্যমান স্থাপনাই উন্নয়নের মাপকাঠি হয়ে ওঠে। মানুষের আয় ও কর্মনিরাপত্তা আড়ালে পড়ে। এ ভবন নির্মাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখবে না। তাই সরকারের উচিত নতুন প্রশাসনিক স্থাপনার আগে বিদ্যমান ভবনের ব্যবহার, সংস্কার, ডিজিটাল সেবা ও বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প যাচাই করা। পাশাপাশি শিল্পের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, বেতনযুক্ত শিক্ষানবিশি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে সহজ অর্থায়ন এবং স্বচ্ছ নিয়োগে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। আর বড় প্রকল্প অনুমোদনের শর্ত হোক প্রকাশ্য ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ ও পরিমাপযোগ্য জনকল্যাণ। সরকারের অগ্রাধিকারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে নাগরিকের কর্মসংস্থান, আয় ও সেবাপ্রাপ্তির বাস্তব উন্নতিতে। ভবনে নয়।
এখন করণীয়
মন্ত্রিসভার অনুমোদন নীতিগত, তাই সংশোধনের সুযোগ এখনো আছে। এখন সরকারের চারটি কাজ করা উচিত : ১. নিরপেক্ষ ও স্বাধীন সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা। যাতে ব্যয়-সুবিধা, যানজট ও পরিবেশের প্রভাব থাকবে এবং তা প্রকাশ করা। ২. শেকৃবির জমির প্রশ্নটি পুলিশ বা বাগাড়ম্বরে নয়, দলিলপত্র ও আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-জমির নিশ্চয়তা দেয়া। ৩. প্রকৃত বিকল্পগুলো প্রকাশ্যে তুলনা করা— পূর্বাচল, মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ার মতো ঢাকার বাইরের স্থান, কিংবা বর্তমান সচিবালয়ের ভূমিকম্প-সহনীয় সংস্কার। ৪. ভিত্তিপ্রস্তরের আগে নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ, শিক্ষাবিদসহ অন্যান্য অংশীজনদের নিয়ে গণশুনানি করা।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা মিশ্র। সফল উদাহরণগুলোর মিল হলো— আগে অবকাঠামো পরিকল্পনা হয়েছে। জনগণকে সাথে নেয়া হয়েছে। পুত্রজায়া, আবুজা ও সেজং কাজ করেছে প্রস্তুতির জোরে, তাড়াহুড়ো করে নয়। দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্রের একটি আধুনিক ও উন্নততর ঠিকানা সত্যিই দরকার। কিন্তু ভালো ধারণা হলেও বিতর্কিত জমিতে তাড়াহুড়ো করে প্রকল্প শুরু করা উচিত না। তাই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের আগে সরকারের উচিত ব্যয়ের হিসাব দেখানো, জমির বিরোধ মেটানো এবং প্রমাণ করা যে স্থানটি কার্যকর হবে। তা না হলে এ সচিবালয় হয়ে থাকবে একটি ‘তাড়াহুড়োর স্মারক’।
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার; প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








