ড. শরিফুল আলম
মতামত লোগো। নয়া দিগন্ত

২০ অক্টোবর রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে ল্যাপটপের বোতাম চাপলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কয়েক মিনিটের মধ্যে ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির ব্যাংক হিসাবে ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা পৌঁছে গেল। একই সভা থেকে আরেকটি বার্তা এসেছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাদের কাছে পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, পতিত স্বৈরাচার সীমান্তের ওপার থেকে একটি রাজনৈতিক দলকে অর্থ দিচ্ছে, আর সেই দল দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। তিনি কোনো দলের নাম বলেননি। ইঙ্গিত ছিল জামায়াতের দিকে।
এক দিকে বাস্তব টাকা, বাস্তব কৃষক, যাচাইযোগ্য হিসাব। অন্য দিকে অদৃশ্য অর্থদাতা, বেনামী দল, অপ্রকাশিত গোয়েন্দা প্রতিবেদন। ওই সতর্কবার্তা কি দায়িত্বশীল ছিল, নাকি ভয়ের রাজনীতির পরিচিত কৌশল? উত্তর খুঁজতে আগে দেখা দরকার, ক্ষমতার ভাষা কিভাবে কাজ করে।

Advertisement

ভাষণের ভেতরের ভাষা 
‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে’, এই বার্তার পেছনের তথ্য শ্রোতারা দেখতে পান না। কিন্তু  ধরে নিতে বাধ্য হন যে সরকার এমন কিছু জানে যা তারা জানেন না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি বলেছিলেন, স্বৈরাচারের দোসররা ‘অদৃশ্য শক্তি’ হিসেবে ষড়যন্ত্র করছে। আরেক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, স্বৈরাচারের ‘ভূতেরা’ এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এখন তিনি সরকারপ্রধান। বক্তব্যের ভাষা প্রায় অভিন্ন, কিন্তু বক্তার অবস্থান বদলে গেছে। এতে বক্তব্যের ওজন এবং দায়ও বদলেছে।
ক্ষমতার বাইরে থেকে ‘অদৃশ্য শত্রু’র কথা বললে সেটি রাজনৈতিক বক্তৃতা। আর রাষ্ট্রের প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থা যার নির্দেশে চলে, তিনি এই কথা বললে সেটি হয়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক ঘোষণা। বিভিন্ন তত্ত্বের আলোকে বিষয়টি সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো। 

বন্ধু-শত্রু বনাম প্রতিপক্ষ
জার্মান তাত্ত্বিক কার্ল স্মিট রাজনীতির সারকথা দেখেছিলেন ‘বন্ধু ও শত্রু’র বিভাজনে। শত্রু এখানে প্রতিযোগী নয়, অস্তিত্বের প্রতিপক্ষ। শ্যান্টাল মুফ তার ‘অন দ্যা পলিটিক্যাল : ২০০৫’ গ্রন্থে এর একটি গণতান্ত্রিক সংস্করণ প্রস্তাব করেছেন। তার মতে, ‘দ্বন্দ্ব’ রাজনীতির অনিবার্য অংশ। দ্বন্দ্ব যদি ‘শত্রুতা’ হয়, তাহলে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে হয়। আর ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ হলে বৈধ প্রতিযোগী হিসেবে প্রতিপক্ষের স্বীকৃতি থাকে। তার সাথে মতের লড়াই চলে; কিন্তু তার অস্তিত্বের অধিকার অস্বীকার করা হয় না।
যে ভাষা প্রতিপক্ষকে ‘বিদেশী অর্থে পরিচালিত ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে চিত্রিত করে, সেটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতায় রূপান্তর করে। এই রূপান্তর একতরফা নয়। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগকে ‘অসত্য ও হাস্যকর’ বলেছেন এবং পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন, সরকারই অরাজকতার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের ফেরার পথ তৈরি করছে। এমনকি দিল্লির সাথে সরকারের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। অর্থাৎ উভয়পক্ষ পরস্পরকে ‘দেশের বাইরের শক্তির এজেন্ট’ বলছে। এই পারস্পরিক শত্রুতাকরণ মুফ-এর ভাষায় গণতান্ত্রিক পরিসরের ক্ষয়।

ষড়যন্ত্রের প্যারানয়েড স্টাইল
মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড হফস্ট্যাডটার ১৯৬৪ সালে ‘দ্যা প্যারানোইড স্টাইল ইন আমেরিকান পলিটিকস’ প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন, রাজনীতিতে একধরনের বাকভঙ্গি আছে, যেখানে শত্রুকে শক্তিমান ও অদৃশ্য হিসেবে দেখানো হয় এবং প্রমাণের অভাবকেই ষড়যন্ত্রের ‘গোপনীয়তার’ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
এই কাঠামোর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো অখণ্ডনীয়তা। প্রমাণ না থাকলে বলা হয়, ‘শত্রু চতুর বলেই প্রমাণ নেই।’ প্রমাণ থাকলে সেটি ‘প্রকাশযোগ্য নয়’। যে দাবি কোনো অবস্থাতেই ভুল প্রমাণ করা যায় না, বৈজ্ঞানিক চিন্তায় তার মূল্য শূন্য, আর গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার জন্য তা অকার্যকর।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় এর উদাহরণ অনেক। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার বছরের পর বছর বিরোধী আন্দোলনকে ‘ষড়যন্ত্র’, ‘নাশকতা’ ও ‘বিদেশী মদদ’ বলে চিহ্নিত করেছে এবং সেই ভাষাকে আইনি দমনের ভিত্তি বানিয়েছে। 

ইতিহাসের হাতিয়ার : ১৯৭১ ও ২০২৪
একই ভাষণে প্রধানমন্ত্রী জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ১৯৭১ সালে তারা যেভাবে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছে, চব্বিশের জুলাই আন্দোলনকেও তেমনই ধোঁকা দিয়েছে। এই বক্তব্যে দু’টি আলাদা মাত্রার ঘটনাকে এক সুতোয় বাঁধা হয়েছে।
১৯৭১ সালে জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান ও পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সহযোগিতার অভিযোগ বিভিন্ন সূত্র ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নথিবদ্ধ, এ নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক দীর্ঘদিনের। এটি আর হালে পানি পাচ্ছে না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে জামায়াতসহ নানা দলের ভূমিকা নিয়ে ব্যাখ্যা ভিন্ন; কিন্তু শিবিরের ভূমিকাকে কেউ অস্বীকার করে না। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের ‘কালো ছায়া’ মন্তব্য তার প্রমাণ করে। 
অতীতের কোনো দলের ভূমিকা আজকের কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগের প্রমাণ নয়। আজকের অভিযোগ আজকের প্রমাণেই যাচাই হওয়া উচিত। এটিই নায্য, নৈতিকতা। 

গণতন্ত্র ক্ষয়ের নিঃশব্দ পথ
স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলাট ‘হাউ ডেমোক্র্যাসিস ডাই : ২০১৮’ গ্রন্থে বলেছেন, আধুনিক গণতন্ত্র ট্যাংকের শব্দে মরে না, মরে নির্বাচিত নেতাদের হাতে, ধীরে ধীরে। গণতন্ত্রের দু’টি অলিখিত স্তম্ভ তারা চিহ্নিত করেছেন। এক. পারস্পরিক সহনশীলতা : প্রতিপক্ষকে বৈধ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মেনে নেয়া; দুই. প্রাতিষ্ঠানিক সংযম : আইনগতভাবে সম্ভব হলেও ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার না করা।
তাদের সতর্কবার্তা হলো, প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা গণতন্ত্র ক্ষয়ের প্রথম লক্ষণগুলোর একটি। তুরস্কে ২০১৬ সালের পর ‘সমান্তরাল কাঠামো’র ভাষা, হাঙ্গেরিতে ‘বিদেশী অর্থায়নে পরিচালিত সংগঠন’-এর বিরুদ্ধে আইন, কিংবা ঠাণ্ডা যুদ্ধকালে লাতিন আমেরিকার ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ তত্ত্ব, প্রতিটি ক্ষেত্রে ধাপগুলো ছিল একই। আগে ভাষা, তারপর আইন, তারপর প্রতিষ্ঠান।
মিলান সভোলিক ‘পোলারাইজেশান ভারসেস ডেমোক্র্যাসি : ২০১৯’ প্রবন্ধে আরো একটি জটিলতা দেখিয়েছেন। মেরুকরণ যত তীব্র হয়, ভোটাররা নিজ দলের অগণতান্ত্রিক আচরণ তত বেশি মেনে নেন, কারণ তাদের কাছে ‘ওদের জেতা’ ‘আমাদের নিয়মভঙ্গ’-এর চেয়ে বড় ক্ষতি মনে হয়। দুই পক্ষের সমর্থকরা নিজেদের নেতার বাড়াবাড়ি ক্ষমা করে দেন।

প্রশ্নগুলো যেসব উত্তর চায়
গোয়েন্দা তথ্যের এই দাবি নিয়ে কয়েকটি যৌক্তিক প্রশ্ন স্বাভাবিক। তথ্য যদি এতই স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়, তাহলে আইনি ব্যবস্থা কোথায়? অর্থপাচার, অবৈধ অর্থায়ন বা রাষ্ট্রবিরোধী কাজ বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে অপরাধ। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দল ঠিক এই প্রশ্নই তুলেছে।
একজন নির্বাহী প্রধান গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য জনসভায় প্রকাশ করলে সংস্থাটির পেশাগত নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহার করে বিরোধী দলের ওপর নজরদারির কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করা কি একজন প্রধানমন্ত্রীর শোভা পায়? গোয়েন্দা সংস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ক্ষত। বিবিসি বাংলার একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বা রুদ্ধদ্বার অধিবেশনের মতো প্রাতিষ্ঠানিক পথে তথ্য উপস্থাপনের সুযোগ আছে। জনসভা তথ্য যাচাইয়ের নয়, সমর্থন সংগ্রহের জায়গা।
ভূতের গল্প কেন এত সুবিধাজনক?
রাজনৈতিক বক্তব্য বুঝতে হলে শুধু কী বলা হলো তা নয়, কখন বলা হলো তাও দেখতে হয়। সমালোচকদের মতে, নিজেদের অস্বস্তি থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিতে ‘গোয়েন্দা-ভূত’ সরকারের জন্য সুবিধাজনক আশ্রয়। পতিত হাসিনাও সেটিই করতেন। এখন নিত্যপণ্যের দাম, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে সরকারের অস্বস্তি আছে।
রাজশাহীর জনসভার মাত্র কয়েক দিন আগে সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের চাঁদাবাজি ও জমি দখলের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। সমালোচকরা বলেন, সমস্যা আছে বলেই এ ধরনের সতর্কতা দিতে হয়েছে। যে সমস্যা দলের ভেতরেই, তার জন্য বাইরের ‘ষড়যন্ত্রকারী’ দেখানো সুবিধাজনক। 

ব্যর্থতা-আড়ালের তত্ত্ব
আর. কেন্ট উইভার (১৯৮৬) দেখিয়েছিলেন, রাজনীতিকরা অনেকসময় কৃতিত্ব অর্জনের চেয়ে দোষ এড়ানোকে অগ্রাধিকার দেন। কারণ ক্ষতির স্মৃতি ভোটারদের মনে বেশি দিন থাকে। ক্রিস্টোফার হুড তার ‘দ্যা ব্ল্যাম গেম : ২০১১’ গ্রন্থে এর কয়েকটি কৌশল চিহ্নিত করেছেন। যার একটি হলো অন্য কারো কাঁধে দায় চাপানো। দেশবাসী ছাত্রদলকে দেখছে, শিবিরের ওপর দায় চাপিয়ে দিতে। এই সরকারের প্রথম ভাষণেও সমালোচকরা এই প্রবণতা দেখেছেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, নতুন সরকারগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিপর্যস্ত অর্থনীতির কথা বলে। তবে সরকারের সময় ছয় মাস পেরিয়ে আট মাসে এসে ‘উত্তরাধিকার’ যুক্তি ফুরিয়ে আসে। তখন নতুন শত্রুর প্রয়োজন পড়ে। 
মনোযোগ-সরানোর তত্ত্ব : জ্যাক লেভি ‘ডাইভারশনারি থিওরি : ১৯৮৯’ বইতে আলোচনা করেছেন, অভ্যন্তরীণ চাপে থাকা নেতারা বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ শত্রুর ছবি তুলে ধরে মানুষের মনোযোগ সরাতে পারেন। সাময়িক ঐক্য তৈরি করতে পারেন। এখানে ‘শত্রু’ সীমান্তের ওপারের এক পতিত নেতা ও দেশের ভেতরের এক বিরোধী দল, দু’টিই এমন প্রতিপক্ষ, যাদের বিরুদ্ধে ঐক্যের আহ্বান রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক।

সরকারের পক্ষে কী বলা যায়
ন্যায্য বিশ্লেষণে সরকারের পক্ষের যুক্তিগুলোও গুরুত্ব পাওয়া উচিত। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর পরাজিত পক্ষের শীর্ষ নেতৃত্ব দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, এটি বাস্তবতা। রাজনৈতিক সহিংসতা বা অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা অমূলক কল্পনা নয়। আর সরকারপ্রধানের দায়িত্বই হলো জনগণকে সতর্ক করা। গোয়েন্দা তথ্যের সব অংশ প্রকাশ করা যায় না। কারণ তাতে সূত্র ও পদ্ধতি ঝুঁকিতে পড়ে। বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক সরকারও নির্দিষ্ট নাম ও নথি প্রকাশ না করেই সাধারণ নিরাপত্তা-সতর্কতা জানায়।
প্রধানমন্ত্রী কোনো দলের নাম উল্লেখ করেননি। একই ভাষণে উন্নয়ন, বন্ধ মিল চালু ও কৃষি সহায়তার মতো বাস্তব কর্মসূচির কথাও বলেছেন। সমর্থকদের মতে, ক্ষমতাসীন দল দেশ গড়তে চাইছে। আর বিরোধীদের একাংশ রাজপথে বিশৃঙ্খলা করে সেই প্রক্রিয়ায় বাধা দিচ্ছে বলেই সতর্কতা প্রয়োজন।
এই যুক্তিগুলোর কোনোটিই উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। কখনো কখনো নাম না বলে সতর্ক করা নাম ধরে অভিযোগের চেয়ে কম ক্ষতিকর না। 

ছায়া কাটানোর পথ
তাহলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার উপায় কী? তত্ত্বের ভাষায় বললে, প্রয়োজন নিরাপত্তায়ন-বিমোচন, অর্থাৎ ভয়ের কথা আবার প্রতিষ্ঠানের ভাষায় ফিরিয়ে আনা। কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে : এক.  আইনি পথ : তথ্য থাকলে বৈধ অনুসন্ধান ও আদালতের মাধ্যমে প্রমাণ উপস্থাপন, যাতে অভিযুক্ত পক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায়; দুই. সংসদীয় তদারকি : প্রয়োজনে রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটির কাছে তথ্য উপস্থাপন; তিন. সংযত ভাষা : নেতাদের বক্তৃতায় অভিযোগ ও প্রমাণের পার্থক্য স্পষ্ট রাখা। ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটি যত ঘন ঘন ব্যবহার হয়; তার ওজন তত কমে; চার. দ্বিপক্ষীয় সংযম : বিরোধী দলের দিক থেকেও পাল্টা অভিযোগের আগে প্রমাণ বা অন্তত যুক্তির কাঠামো দেয়া। ‘সরকার দিল্লির ইশারায় চলছে’— ধরনের মন্তব্যও একই রকম প্রমাণসাপেক্ষ; পাঁচ. বাস্তব প্রশ্নের জবাব : নিত্যপণ্যের মূল্য, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলার মতো প্রশ্নকে ‘ষড়যন্ত্র’র তালিকায় ঢোকানোর বদলে নীতি ও ফলাফলের আলোচনায় রাখা।

আলো যত বাড়ে, ভূত তত ছোট হয়
রাজশাহীর মাঠে আখচাষিদের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছানোর দৃশ্য দেখায়— ক্ষমতা স্বচ্ছ হলে যাচাইযোগ্য ফল দেয়। আর গোয়েন্দা তথ্যের দাবি দেখায়— ক্ষমতা অস্বচ্ছ হলে তা কেবল বিশ্বাসের ওপর টিকে থাকে।
গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই যে, এটি ‘বিশ্বাস করুন’ বলার বদলে ‘দেখুন’ বলার সাহস দেয়। সরকারের আসল পরীক্ষা শত্রু চিনিয়ে দেয়া এবং শত্রুকে আইন, প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠানের আলোয় আনা। আর বিরোধীর পরীক্ষা— নিজের অবস্থানকেও একই মানদণ্ডে যাচাই করতে দেয়া। প্রমাণ থাকলে তা আদালতে আসুক। না থাকলে অভিযোগ ফিরিয়ে নেয়ার সৌজন্য দেখানো হোক।
ভূত দেখানোর রাজনীতি ফলে অন্ধকারে। আলো যত বাড়ে, ভূত তত ছোট হয়। আর গণতন্ত্র তত শক্তিশালী হয়। সেই আলো জ্বালানোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি তার, যার হাতে রাষ্ট্রের সুইচ। 
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার; প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি