
শুরু করতে চাই কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড: মোনা আবুল ফজলের উক্তি দিয়ে, ‘বর্তমান সময়ের সংস্কৃতি ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও সমাজ বিনির্মাণ করবে।’ মূল কথা সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চা, সুস্থ ধারার রাজনীতির জন্ম দেয়। এর আলোকে আমাদের দেশের সংস্কৃতি চর্চার সাথে রাজনীতিবিদদের সাংস্কৃতিক অনুভূতি ও চেতনার কতটুকু সম্পর্ক রয়েছে এ ব্যাপারে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আবার রাজনৈতিক ধারায় সাংস্কৃতিক চর্চা ও চেতনাকে ততটুকুই পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে যতটুকু নিজ নিজ দলীয় আদর্শের স্বার্থে ব্যবহার করা যায়। ফলে পাকিস্তান এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এদেশে সংস্কৃতি চর্চার যে মৌলিক বৈশিষ্ট্য তা বলতে গেলে একই ধারায় আবর্তিত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রয়োজনে দলীয় স্বার্থে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু গ্রহণীয়- বাকিটা বর্জনীয়। ফলে সাংস্কৃতিক চেতনা বোধ যা মানুষকে পরিশীলিত করে, বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের আলোকে সমৃদ্ধ করে সেটির চর্চা হয়ে ওঠেনি। একটি সীমাবদ্ধ চিন্তা ও চেতনার আলোকে তা আবর্তিত হয়েছে। ব্যাপ্তি লাভ করেনি সাধারণ জনগণ ও সংস্কৃতিসেবীদের ভেতর। সীমাবদ্ধতার গণ্ডি পেরিয়ে তা জনমানসকে সঞ্জীবিত করতে পারেনি।
সংস্কৃতির পরিধির অভিজ্ঞান তাই রয়ে গেছে কুপমণ্ডুকতার অন্ধকারে। সাহিত্য চর্চা, নাটক, গজল, সঙ্গীত, চিত্রকলা- এগুলোর সামষ্টিক রূপের প্রকাশ এবং এর আলোয় জাতিসত্তার যে বিকাশ তা হয়ে ওঠেনি আজো। তাই আমরা সাহিত্যে অতিক্রম করতে পারিনি নজরুল ও রবীন্দ্রনাথকে। আত্মস্থ করতে পারিনি ইকবালের মতো একজন বিশ্বখ্যাত দার্শনিককে— মুসলমান হওয়ার অপরাধে এবং ইসলামী রেনেসাঁর চিন্তক হওয়ার কারণে। সম্পূর্ণ বাংলাদেশী এবং এর আগে পাকিস্তানের বলয়াবদ্ধ চেতনার কারণে আজো এই দুই দেশে ইকবাল, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে ছাড়িয়ে কোনো সাহিত্য সামনে এগোতে পারেনি। হিন্দু জাতীয়তাবাদের চেতনায় ও নিজ ধর্মবিশ্বাসের গভীরতায় পুষ্ট হওয়া সত্ত্বেও বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, শরৎচন্দ্র আজো বাংলা সাহিত্যে প্রাসঙ্গিক শুধু সামাজিক সম্পৃক্ততার কারণে। অথচ পশ্চাৎপদ মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক চেতনার চর্চার অভাবে কায়কোবাদ, জসিমউদদীন, শাহেদ আলী, ফররুখ আহমদ এবং অতি সাম্প্রতিক আল মাহমুদ এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে বেগম রোকেয়া, শামসুন্নাহার মাহমুদ ও সুফিয়া কামালকেও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক চেতনার আলোয় মূল্যায়ন করা হয়নি। হয়েছে দলীয় প্রেক্ষিতে, রাজনীতির স্বার্থে। এর পরিণাম সাংস্কৃতিক চেতনার নামে বিভ্রান্তি। শেক্সপিয়ার এদেশে সমাদৃত পরদেশী হয়েও। বিদেশী চেতনার লিও টলস্টয় আমাদের চেয়ে যোজন যোজন দূরের ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও আমাদের কাছে গ্রহণীয় ও শ্রদ্ধেয়। পাশাপাশি বিশ্ববিখ্যাত ‘প্রাচ্য পাশ্চাত্য ও ইসলাম’ (রচনা আলীয়া আলী ইজেতবেগোভিচ) এর নাম আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের গুণীজনেরা শুনেছেন কিনা তা নিয়ে সংশয়ের যথেষ্ট অবকাশ আছে। অথচ নিজস্ব অবস্থান নিরূপণের জন্য বিশ্বসাহিত্য ও বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক চেতনার সাথে গভীর সংযোগ সংস্কৃতি চর্চার অনিবার্য দাবি! একই সাথে সাধারণ জনগণের সাংস্কৃতিক চেতনা বিকাশের ধারাবাহিকতাকেও এই ধারার সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। আমাদের সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের এই ধারায় তাদের নিজস্ব অবদানকেও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, বাংলা সাহিত্যের বিকাশ ও অগ্রগতির ধারায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি মাইলস্টোন বটে- তবে একক নন। বাংলা সাহিত্য গড়ে উঠেছে বহু লেখকের অবদানে দীর্ঘ সময়ব্যাপী। তারা সবাই তাদের নিজস্ব আদর্শিক চেতনায় রচনা করেছেন তাদের সৃষ্টি। এতে ক্ষুব্ধ হওয়া উচিত নয়। একথা বিস্মৃত হওয়া উচিত নয় সাহিত্যিকদের নিজ নিজ আদর্শিক চেতনার আলোকে সাহিত্য রচনার স্বাধীনতা রয়েছে। তার চিন্তাচেতনা পাঠকের নিজস্ব আদর্শিক ধারার সাথে না মিললেই তিনি পরিত্যাজ্য বা নিন্দনীয় এ ধরনের চিন্তা সুস্থ সাংস্কৃতিক চেতনার পরিচায়ক নয়।
সাংস্কৃতিক ধারার বিকাশকে একটি বাগানের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। যেখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের সমারোহ। ফুলপ্রেমীদের কাছে সব রকমের ফুল পছন্দনীয় হবে তা আশা করা যায় না। তার পছন্দ ও অপছন্দের ফুল নিয়েই বাগানের সার্বিক সৌন্দর্য্য। এটি অস্বীকার করলে সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশকেই অস্বীকার করা হবে। সাম্প্রতিক রবীন্দ্রবিরোধী চেতনার বহিঃপ্রকাশকে বিবেচনা করতে হবে এই চিন্তার আলোকে।
বাংলা সাহিত্যের বিকাশে রবীন্দ্রনাথ একমাত্র অগ্রপথিক নন। বাংলা সাহিত্য রবীন্দ্রনাথসহ অনেক সাহিত্যিকদের অবদানে সমৃদ্ধ। কাউকে অস্বীকার করার প্রবণতা সংস্কৃতির সুস্থ বিকাশকেই অস্বীকার করা। এক্ষেত্রে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের একটি উক্তি স্মরণীয়, ‘ঐতিহ্য সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ঐতিহ্যের অনুসরণ ও স্রোতধারাকে প্রবহমান রাখাই সংস্কৃতিসেবীর কাজ।’ কাউকে কালিমালিপ্ত করা বা হেয় করার প্রবণতা সুস্থ সংস্কৃতির লক্ষণ নয়। বহুমুখী সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমেই কেবল সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি সম্ভব; খণ্ডিত বা সীমিত সাংস্কৃতিক চেতনার মাধ্যমে নয়।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ
shah.b.islam@gmail.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








