উপসম্পাদকীয়
ড. মো: মিজানুর রহমান। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ কি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতায় উন্নয়নের পথে এগোতে পারে? এ প্রশ্ন শুধু ঋণ নেয়া বা না নেয়া নয়; এটি অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা, বৈদেশিক মুদ্রার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঋণভারের সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়ন প্রয়োজন। তবে অর্থায়নের উৎস, শর্ত, ব্যয়, ব্যবহার ও পরিশোধের সক্ষমতা নির্ধারণ করবে দেশটি কতটা স্বাধীনভাবে নিজের উন্নয়ন-অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন করতে পারবে।
২০২৩ সালে আইএমএফ বাংলাদেশের জন্য প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করে। পরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর ২০২৬ সালের ৩ জুন বাংলাদেশ নতুন আইএমএফ-সমর্থিত আর্থিক ব্যবস্থার জন্য আবেদন করেছে। 
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। নতুন কর্মসূচির আকার, শর্ত ও অনুমোদন পৃথক বিষয়। তাই আইএমএফের সাথে সম্পর্ক শেষ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছার সুযোগ নেই; বরং প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যৎ অর্থায়নে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা কিভাবে বাড়ানো যায়।
আইএমএফের ঋণই একমাত্র সমাধান কিংবা সব সমস্যার কারণ এমনভাবে বিষয়টিকে দেখা ভুল। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা, রিজার্ভের চাপ ও আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থার সঙ্কট মোকাবেলায় আইএমএফের অর্থায়ন সহায়ক হতে পারে। তবে এর সাথে রাজস্ব, বিনিময় হার, ভর্তুকি ও আর্থিক খাতের সংস্কারের যেসব শর্ত আরোপ করা হয় তা সাধারণ মানুষের ওপর স্বল্পমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত আইএমএফকে অস্বীকার করা নয়; বরং এমন অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলা, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বিকল্প থাকে এবং কোনো একক ঋণদাতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে না হয়।
বিকল্প অর্থায়নকে পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায় : জরুরি বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ, দেশীয় রাজস্ব ও সঞ্চয় বৃদ্ধি, বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়ন, সুকুক-বন্ড-প্রবাসী বিনিয়োগ ও বিদেশী মূলধন এবং রফতানি, উৎপাদনশীলতা ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি। তবে প্রতিটি বিকল্পের ভূমিকা আলাদা। অবকাঠামো নির্মাণের অর্থায়ন সবসময় তাৎক্ষণিকভাবে রিজার্ভ বাড়ায় না; আবার রিজার্ভে সাময়িক স্বস্তি দেয়া ঋণ দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন ক্ষমতা নিশ্চিত করে না। কার্যকর কৌশল হবে এসব উৎসের সমন্বয়, যাতে তাৎক্ষণিক সঙ্কট মোকাবেলার পাশাপাশি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিও শক্তিশালী হয়।
প্রথমত, জরুরি বৈদেশিক মুদ্রার জন্য দ্বিপক্ষীয় ঋণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রাবিনিময় ব্যবস্থা, বাণিজ্য অর্থায়ন এবং উন্নয়ন সহযোগীদের দ্রুত বিতরণযোগ্য সহায়তা বিবেচনা করা যায়। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের সাথে নির্দিষ্ট সীমা, মেয়াদ ও পরিশোধ ব্যবস্থার ভিত্তিতে বৈদেশিক মুদ্রা সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধান করা যেতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা অংশীদারের সম্মতি, বাস্তবসম্মত শর্ত ও নির্ধারিত সময়ে অর্থ ফেরত দেয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। এগুলো স্থায়ী আয়ের উৎস নয়; বরং তারল্য ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের জুনে অনুমোদিত ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তা দেখায়, আইএমএফ ছাড়াও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থায়ন পাওয়া সম্ভব। এর মধ্যে সার ও খাদ্যনিরাপত্তা-সম্পর্কিত ৩০০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প এবং জরুরি ব্যয়ের জন্য ৭১৩ মিলিয়ন ডলারের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এ অর্থ নিঃশর্ত বাজেট-সহায়তা বা সরাসরি রিজার্ভে জমা হওয়া অর্থ মনে করা ঠিক হবে না; এর বড় অংশ নির্দিষ্ট জরুরি প্রয়োজন ও ব্যয়ের সাথে যুক্ত। তাই অর্থায়নের প্রকৃতি, শর্ত, অর্থছাড়ের সময় ও ব্যবহার সম্পর্কে স্বচ্ছতা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ দীর্ঘ দিনের অবহেলিত বিকল্প হলো নিজস্ব রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি। আইএমএফের বাংলাদেশ-বিষয়ক ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-রাজস্ব জিডিপির মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসে। এই ব্যবধান বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতার দুর্বলতা স্পষ্ট করে। এই করের ভিত্তি, অর্থনীতির কাঠামো ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে এগোতে হবে। করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি, ই-রিটার্ন ও ই-পেমেন্ট কার্যকর করা, কর ফাঁকি ও অবৈধ সুবিধা কমানো এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা জরুরি। শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ দিলে বিনিয়োগ ও ভোগ ব্যাহত হতে পারে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত করের হার নির্বিচারে বাড়ানো নয়; বরং করের ভিত্তি বিস্তৃত করা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা।
একই সাথে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয়, দুর্বল ক্রয়প্রক্রিয়া, অসমাপ্ত প্রকল্পে অর্থ আটকে থাকা ও দুর্নীতি রোধ করতে পারলে একই রাজস্ব দিয়ে বেশি উন্নয়ন সম্ভব। অর্থ ব্যয়ে  জবাবদিহি নিশ্চিত না করে বেশি কর আহরণের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। তাই রাজস্ব সংস্কারের সাথে প্রশাসনিক সংস্কার, স্বচ্ছতা ও সুশাসন যুক্ত করতে হবে। সরকারি অর্থের অপচয় কমানোও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তৃতীয়ত, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের অর্থায়ন পরিবহন, জ্বালানি, কৃষি, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জলবায়ু অভিযোজনে সহায়ক হতে পারে। অগ্রাধিকার দিতে হবে এমন প্রকল্পে, যেগুলো আমদানি ব্যয় কমায়, রফতানি বাড়ায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অথবা ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতা গড়ে তোলে।
তবে প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন ঋণ তাৎক্ষণিক বৈদেশিক লেনদেনের সঙ্কট মোকাবেলার বিকল্প নয়। প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র, বাস্তবায়ন ও অর্থছাড়ে সময় লাগে; অথচ সুফল আসার আগেই ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসতে পারে। তাই ঋণ নেয়ার আগে প্রকল্পের অর্থনৈতিক আয়, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, সামাজিক সুফল ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা মূল্যায়ন জরুরি। 
চতুর্থত, বাংলাদেশের জন্য ইসলামী অর্থায়ন, বিশেষ করে সুকুক, একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প। সুকুকের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সম্পদ বা প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন করা যায়। অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পানি ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনশীল প্রকল্পে শরিয়াহসম্মত কাঠামো ব্যবহার করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব। 
তবে সুকুক বিনা খরচের অর্থ নয়, কিংবা সব সমস্যার সমাধানও নয়। এর জন্য বিশ্বাসযোগ্য প্রকল্প, স্বচ্ছ সম্পদ ব্যবস্থাপনা, শরিয়াহ তদারকি, বিনিয়োগকারীর অধিকার, নিয়মিত প্রতিবেদন ও কার্যকর দ্বিতীয় বাজার দরকার। 
দেশীয় মুদ্রায় সুকুক অবকাঠামোর অর্থায়ন করলেও সরাসরি ডলারের রিজার্ভ বাড়ায় না। বৈদেশিক মুদ্রায় সুকুক বিদেশী অর্থ আনতে পারে, তবে ভবিষ্যৎ পরিশোধের মুদ্রাঝুঁকিও বাড়ায়। তাই প্রকল্পের আয় ও মুদ্রার ধরন বিবেচনায় নিয়ে কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
প্রবাসী বাংলাদেশীদের সঞ্চয়ও অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। প্রবাসী বন্ড, অবকাঠামোভিত্তিক বিনিয়োগ, স্বচ্ছ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়পণ্য এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যয় কমানো কার্যকর হতে পারে। তবে শুধু দেশপ্রেমের কারণে প্রবাসীরা বিনিয়োগ করবেন, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তাদের অর্থের নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক মুনাফা, সহজ লেনদেন ও সরকারি ব্যবস্থার ওপর আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকিং সেবার মানোন্নয়ন এবং অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের সাথে ব্যবধান কমানোও জরুরি।
বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই আরেকটি সম্ভাবনা। তবে শুধু করছাড় দিয়ে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায় না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, দ্রুত কাস্টমস সেবা, শিল্প অবকাঠামো, চুক্তির আইনি সুরক্ষা, নীতির ধারাবাহিকতা ও মুনাফা বৈধভাবে প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা দরকার। 
বিদেশী বিনিয়োগ প্রাথমিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও পরবর্তী সময়ে লভ্যাংশ ও মুনাফা বিদেশে যেতে পারে। তাই এর গুণগত মান ও দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক মুদ্রার প্রভাব মূল্যায়ন জরুরি।
পঞ্চমত, ঋণনির্ভরতা কমানোর সবচেয়ে টেকসই উপায় হলো বৈদেশিক আয়ের ভিত্তি সম্প্রসারণ। তৈরী পোশাক বাংলাদেশের প্রধান রফতানি শক্তি; তবে পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ জরুরি। ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা ও জাহাজ নির্মাণের মতো খাতে উৎপাদন ও রফতানি বাড়াতে হবে।  সেই সাথে মান নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ শ্রমশক্তি, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, বন্দর দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি দক্ষতা বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিল্পে জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, উন্নত বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা ও আমদানি করা জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে ডলার সাশ্রয় করবে। কৃষি উৎপাদনশীলতা ও খাদ্য সংরক্ষণ বাড়ালেও আমদানির চাপ কমতে পারে। তবে অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীল আমদানি সহজ করার মধ্যে ভারসাম্য জরুরি।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় মালয়েশিয়ার উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সঙ্কটে দেশটি আইএমএফের কর্মসূচি না নিয়ে নির্বাচিত মূলধন নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার নির্ধারণ এবং আর্থিক ও করপোরেট খাত পুনর্গঠনের নীতি গ্রহণ করেছিল। পরবর্তী পুনরুদ্ধারে বৈশ্বিক চাহিদা ও কাঠামোগত সংস্কারও ভূমিকা রাখে। অন্য দিকে থাইল্যান্ড ১৯৯৭ সালের সঙ্কটের পর আইএমএফের সহায়তা নিয়ে আর্থিক খাত সংস্কারের পথে এগোয়। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, সঙ্কট মোকাবেলায় একক কোনো পথ নেই; সাফল্য নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও নীতির সামঞ্জস্যের ওপর। তবে এসব দেশের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেয়া জরুরি।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের বিপর্যয়ও বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ও ঋণ পরিশোধের চাপের ঝুঁকি স্পষ্ট করেছে। বিপরীতে, ভিয়েতনাম রফতানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা ও বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈদেশিক আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করেছে। এ থেকে স্পষ্ট কোনো একক অর্থায়ন মডেল সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। 
বাংলাদেশের জন্য ধাপভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা জরুরি। প্রথম ছয় মাসে বৈদেশিক ঋণ, আসন্ন পরিশোধ, ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ, আমদানি দায় ও উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশ করতে হবে। অগ্রাধিকারভিত্তিক আমদানি ও জরুরি সামাজিক ব্যয়ের অর্থ নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজস্ব ফাঁকি কমানো এবং বৈধ রেমিট্যান্স বাড়াতে হবে। ছয় থেকে ২৪ মাসে কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, ব্যাংক খাতের সম্পদের মান যাচাই, খেলাপি ঋণ ও অনিয়ম মোকাবেলা, সুকুক বাজারের উন্নয়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগের বাধা দূর করতে হবে। দুই থেকে পাঁচ বছরে রফতানি বহুমুখীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, জ্বালানি নিরাপত্তা ও দেশীয় পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে হবে। এসব সময়সীমা প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা, নিশ্চিত ফলাফলের প্রতিশ্রুতি নয়।
সবশেষে, আইএমএফের বিকল্পকে ‘আইএমএফ বনাম বাংলাদেশ’ হিসেবে না দেখে অর্থায়ন-কৌশলকে বহুমুখী ও বাস্তবভিত্তিক করতে হবে। জরুরি বৈদেশিক মুদ্রার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উন্নয়নের জন্য স্বচ্ছ ও উৎপাদনশীল প্রকল্প অর্থায়ন, রাজস্বের জন্য ন্যায্য করব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য রফতানি ও উৎপাদনশীলতাকে একই নীতিকাঠামোর অংশ করতে হবে। কোনো একটি উৎস একা আইএমএফের সব ভূমিকা পালন করতে পারবে না। তবে বিকল্পগুলো সমন্বিতভাবে ব্যবহার করলে বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে, অপ্রয়োজনীয় ঋণের প্রয়োজন কমবে এবং উন্নয়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণে জাতীয় স্বাধীনতা শক্তিশালী হবে।
অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের অর্থ বিদেশী অর্থায়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়; বরং এমন সক্ষমতা অর্জন করা, যাতে বাংলাদেশ প্রয়োজনে অর্থায়ন নিতে পারে, শর্ত নিয়ে যুক্তিসঙ্গত আলোচনা করতে পারে এবং ঋণ পরিশোধের জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অসহনীয় বোঝা না চাপায়। 
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
mizan12bd@yahoo.com

Advertisement