উপসম্পাদকীয়
মতামত লোগো। নয়া দিগন্ত

একটি দেশের ব্যাংকিংব্যবস্থা তখনই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন ব্যাংক শুধু আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণের প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষমতা, প্রভাব ও সম্পদ আহরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়। তখন পরিচালনা পর্ষদ, ঋণ অনুমোদন, খেলাপি ঋণ ও নিয়ন্ত্রকের তদারকি আর বিচ্ছিন্ন বিষয় থাকে না। এর সাথে জড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, আমানতকারী সবাই। বাংলাদেশের ব্যাংকিং সঙ্কট তাই শুধু কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের সমস্যা নয়, এটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্কট। 
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি শুধু কয়েকটি পরিবারের ব্যাংকের শেয়ার মালিকানার বিষয় নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন,  কিভাবে মালিকানা, পরিচালনা পর্ষদ, ঋণপ্রাপ্তি ও নিয়ন্ত্রক তদারকির মধ্যে এমন সম্পর্ক তৈরি হলো, যেখানে মুষ্টিমেয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেল?
সমস্যাটি যদি শুধু কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধ হতো, তাহলে ব্যক্তি পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব ছিল। একই ধরনের মালিকানাকেন্দ্রিক ঋণব্যবস্থা, দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অতিরিক্ত ঋণ এবং নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা অন্যদের জন্যও উন্মুক্ত থাকলে ব্যক্তি বদলালেও ব্যবস্থা বদলাবে না। এ কারণেই ‘গোষ্ঠীগত আধিপত্য’কে মূলত প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা হিসেবে দেখা জরুরি।
শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় মালিকের মূলধনে। আর ব্যাংকের মূল সম্পদ আসে মানুষের আমানত থেকে। ফলে ব্যাংকের অর্থ কোনো মালিক বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। মালিকানা, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় একই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে আমানতকারীর অর্থও তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ডে প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণ, পরিচালকদের স্বাধীনতা, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণের সীমা এবং স্বার্থের সঙ্ঘাত নিয়ন্ত্রণকে সুশাসনের মৌলিক শর্ত হিসেবে দেখা হয়।
এখানে ‘ব্যাংক দখল’ বলতে শুধু শেয়ার কিনে নিয়ন্ত্রণ নেয়া বোঝালে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রকৃত দখল তখনই হয়, যখন কোনো গোষ্ঠী একই সাথে মালিকানা, বোর্ড, ব্যবস্থাপনা, বড় ঋণগ্রহীতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তখন ব্যাংকের সিদ্ধান্ত আমানতকারীর স্বার্থ ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ থেকে সরে গিয়ে নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক স্বার্থের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যাংকটি গোষ্ঠীগত সম্পদ স্থানান্তরের ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং সঙ্কট তাই শুধু খেলাপি ঋণ দিয়ে মাপা যাবে না। খেলাপি ঋণ হলো সমস্যার দৃশ্যমান ফল; এর পেছনে থাকতে পারে দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, গোষ্ঠীগত বা রাজনৈতিক প্রভাব, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অতিরিক্ত ঋণ, দুর্বল জামানত, পুনঃতফসিলের অপব্যবহার, প্রকৃত মালিকানা গোপন করা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির ব্যর্থতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও পর্যালোচনাতেও কঠোর ঋণ শ্রেণীকরণ, ঋণগ্রহীতার আর্থিক দুর্বলতা এবং ব্যাংকিং খাতের শাসনব্যবস্থার সমস্যাকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল; ২০২৬ সালের মার্চে তা ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে আসে। মার্চে নিট খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ১৫ দশমিক ০১ শতাংশ। তবে খেলাপি ঋণের প্রতিটি ঘটনাকে দুর্নীতি বা অর্থপাচার হিসেবে দেখা যায় না; কঠোর ঋণ শ্রেণীকরণ, ঋণগ্রহীতার পরিশোধক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রক নীতির পরিবর্তনও এর কারণ হতে পারে। তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, কারা ব্যাংকের অর্থ নিয়ন্ত্রণ করেছে, কিভাবে করেছে এবং কেন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সময়মতো ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারেনি?
এই প্রশ্নের গুরুত্ব বোঝা যায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণের চিত্রে। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকের পরিচালকদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত ঋণ মোট ব্যাংক ঋণের অন্তত ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এটি ২০২৬ সালের নতুন কোনো পরিসংখ্যান নয়; বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ঝুঁকির একটি নির্দেশক। মূল বিষয় তাই শুধু কে কত শেয়ারের মালিক তা নয়; কে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করছে, কারা বোর্ডে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কারা ঋণ পাচ্ছে এবং আমানতকারীর অর্থের ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত কার ব্যবসার সাথে যুক্ত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক তদন্তেও এই ঝুঁকি আরো স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের অনুসন্ধান, তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ১০টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ ও ব্যাংক তহবিলের কথা উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৭ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা নামসর্বস্ব বা প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ না করা কোম্পানির মাধ্যমে, প্রায় ৯২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা গ্রুপের নামে এবং ৩৪ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা পরোক্ষভাবে নেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই অঙ্ককে সরাসরি ‘লুণ্ঠনের পরিমাণ’ বলা যাবে না। এটি অনুসন্ধানে উঠে আসা ঋণ ও ব্যাংক তহবিলের পরিমাণ। এর মধ্যে কতটা নিয়মমাফিক ঋণ, কতটা অনিয়মের মাধ্যমে নেয়া, কোন অংশ অপব্যবহার হয়েছে এবং কোন অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে— এসব আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হবে। একইভাবে, ২০২৪ সালে এস আলম ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগে সিআইডি তদন্ত শুরু করেছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তদন্তে উত্থাপিত অঙ্ক, ব্যাংকঋণের অঙ্ক এবং আদালতে প্রমাণিত অবৈধ সম্পদের অঙ্ক এক নয়। তাই বিভিন্ন অঙ্ক যোগ করে মোট ক্ষতির হিসাব করাও সঠিক নয়।
তবে এসব অনুসন্ধান একটি মৌলিক দুর্বলতা সামনে আনে— প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করার ব্যর্থতা। একটি কোম্পানির নাম আলাদা হলেই তার প্রকৃত মালিক আলাদা হয় না। একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন বহু কোম্পানি পৃথক ঋণগ্রহীতা হিসেবে হাজির হলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ঋণসীমা ঠিক থাকলেও সম্মিলিত ঝুঁকি বিপজ্জনক পর্যায়ে যেতে পারে। তাই আধুনিক ব্যাংকিং তদারকিতে কোম্পানির নামের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিষ্ঠানটি কার নিয়ন্ত্রণে আছে।
কার্যকর নজরদারি না থাকলে ব্যাংক উৎপাদনশীল বিনিয়োগের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পদ স্থানান্তরের যন্ত্রে পরিণত হতে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, ব্যাংকের অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে বারবার একই গোষ্ঠীর ভেতরে ঘুরতে থাকে, তাহলে ব্যাংকিংব্যবস্থা অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন না করে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সম্পদের কেন্দ্রীভবন বাড়াতে পারে।
অর্থপাচারের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। অর্থের উৎস, লেনদেনের উদ্দেশ্য, প্রকৃত মালিকানা এবং শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ কোন সম্পদে রূপান্তরিত হচ্ছে তার পুরো ধারাবাহিকতা নজরদারিতে থাকতে হবে। 
আইএমএফ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার পেছনে অনুপযুক্ত মালিকানা, অতিরিক্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ এবং দুর্বল তদারকির কথা উল্লেখ করেছে। প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা শনাক্তকরণ, স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ, ব্যবস্থাপনার যোগ্যতা ও সততা যাচাই, সম্পদের প্রকৃত মান নির্ধারণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদারের ওপরও তারা গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করেছে এবং বিশেষ নিরীক্ষা ও তদন্তে অতিরিক্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণ ও সন্দেহজনক কার্যক্রমের বিষয় উঠে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দুর্বল করপোরেট সুশাসন, নিয়ন্ত্রক প্রভাবিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে খেলাপি ঋণের অনুপাত থেকে স্পষ্ট, সমস্যাটি কয়েকটি ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়েছে।  
সমাধানের শুরু হতে হবে প্রকৃত মালিকানা স্বচ্ছ করার মাধ্যমে। কোন ব্যাংকের প্রকৃত মালিক কে, কোন কোম্পানি কার সাথে সম্পর্কিত এবং একই গোষ্ঠীর মোট ঋণ ও সম্মিলিত ঝুঁকি কত, এসব তথ্য নিয়ন্ত্রকের কাছে হালনাগাদ থাকতে হবে। কাগজপত্রে কোম্পানি আলাদা হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ একই হাতে থাকলে ঝুঁকির হিসাবও একসাথে করতে হবে। একই সাথে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণের সীমা, একই জামানতের বিপরীতে একাধিক ঋণ, অস্বাভাবিক আন্তঃকোম্পানি অর্থ স্থানান্তর, দ্রুত ঋণ বৃদ্ধি, বারবার পুনঃতফসিল এবং বড় বিদেশী লেনদেনকে আগাম সতর্কতার সঙ্কেত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এর পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বড় ঋণগ্রহীতা যতই প্রভাবশালী হোক, তদারকির মান তার পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না। ব্যাংক পুনর্গঠনের আগে প্রকৃত ক্ষতি, আদায়যোগ্য ঋণ, জামানতের মূল্য এবং প্রকৃত মূলধন নির্ধারণ করা জরুরি। বিদেশে অবৈধভাবে স্থানান্তরিত সম্পদের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ, দুদক, সিআইডি, এনবিআর, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শুধু সঙ্কট দেখা দেয়ার পর যেন সংস্কার না হয়। এজন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোনো ব্যাংকে ঝুঁকি দ্রুত বাড়লে সমস্যা খেলাপি হওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রকের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকতে হবে। একই সাথে আমানতকারী সুরক্ষা, ব্যাংক পুনর্গঠন ও প্রয়োজনে সুশৃঙ্খলভাবে দুর্বল ব্যাংক বন্ধ বা একীভূত করার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।
ব্যাংকের মালিকানা থাকতে পারে ব্যক্তির হাতে; কিন্তু ব্যাংকের অর্থের জবাবদিহি থাকতে হবে জনস্বার্থের কাছে। 
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
Mizan12bd@yahoo.com

Advertisement