মতামত
মতামত ছবি: নয়া দিগন্ত

সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার পবিত্র অঙ্গনে যৌন সহিংসতা ও নিপীড়নের ভয়াবহ বিস্তারের সংবাদ পুরো জাতিকে হতবিহ্বল করেছে। বিশেষত অভিভাবকমহলে সৃষ্টি করেছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার। যৌন হয়রানি বা ছাত্র-ছাত্রী নিপীড়নের ঘটনা কেন বারবার ঘটছে? শুধু তা-ই নয়, এখানে ধর্ষণ ও বলাৎকারের ঘটনাও আছে। মাদরাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর পর্যন্ত এ রোগ বিস্তৃতি লাভ করছে। এখনই এ রোগের চিকিৎসা করা না গেলে এবং প্রতিষেধক দেয়া না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে তৈরি হতে পারে সামাজিক অস্থিরতা।
ফাইরুজ অবন্তিকা নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২৪ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। মৃত্যুর আগে এ তরুণী একটি সুইসাইড নোট লিখে গেছেন। সেখানে তিনি তার একজন ব্যাচমেট বা সহপাঠী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী প্রক্টরকে তার মৃত্যুর জন্য দায়ী করে গেছেন। যৌন হয়রানির ঘটনায় অতিসম্প্রতি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যৌন হয়রানির অভিযোগে ময়মনসিংহের কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক ছাত্রীকে অনুপস্থিত দেখিয়ে পরীক্ষায় জরিমানা আদায়, নম্বর কম দেয়া ও থিসিস পেপার আটকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগ ওঠে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপকের বিরুদ্ধে। আর বিভাগীয় প্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগ— তিনি ওই ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক অধ্যাপককে যৌন হয়রানির অভিযোগে তিন মাসের বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও দীর্ঘদিন ধরে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন তার বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত এক বছরে ২০টির মতো যৌন হয়রানির অভিযোগ পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্বের থিসিস করতে গিয়ে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন রসায়ন বিভাগের এক ছাত্রী। ওই ছাত্রীর অভিযোগ— ল্যাবে একা কাজ করার সময় এবং কেমিক্যাল দেয়ার বাহানায় নিজ কক্ষে ডেকে দরজা আটকে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন ওই শিক্ষক। ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আজিমপুর শাখার এক গণিতের শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি নিয়ে একটি গবেষণায় দেখতে পান— বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়কদের মধ্যে ৯ শতাংশই শিক্ষক। তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ ছাত্রীর ওপর ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ওই গবেষণাটি পরিচালনা করেন। গবেষণার শিরোনাম ‘স্ট্র্যাটেজিস ফর প্রিভেন্টিং মাসকুলিনিটি অ্যান্ড জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্স ইন হায়ার এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশন ইন বাংলাদেশ : অ্যা স্টাডি অব রাজশাহী ইউনিভার্সিটি।’ গবেষণায় অংশ নেয়াদের দেয়া তথ্য মতে, ৫৬ শতাংশ যৌন নিপীড়কই ছাত্রীদের সহপাঠী। ২৪ শতাংশ তাদের চেয়ে ছোট বা বড়। ১১ শতাংশ বহিরাগত ও ৯ শতাংশ শিক্ষক (ডয়চে ভেলে, বাংলা)।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি রোধে হাইকোর্ট ২০০৯ সালে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেল গঠনের নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশে অভিযোগ গ্রহণ ও ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়। কোনো অভিযোগ পেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেল কাজ করার কথা। কিন্তু কমিটি ঠিকমতো কাজ করে না। এখনো অনেক মাদরাসা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়ন-বিরোধী সেল গঠন করা হয়নি।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর চলতি সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন সহিংসতা নিরোধে গাইডলাইন তৈরি করে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নারীপ্রধান পাঁচ সদস্যের বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন, ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার কঠোরতা এবং অপরাধীকে সাময়িক বরখাস্তের মতো কঠোর প্রশাসনিক বিধান যুক্ত করা হয়েছে। যৌন হয়রানির সংজ্ঞায় বলা হয়— শুধু শারীরিক স্পর্শই নয়; বরং ফোন, ইমেইল, এসএমএস বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর বার্তা পাঠানো, পর্নোগ্রাফি প্রদর্শন এবং ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে ভিডিও ধারণ করাকেও যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য করা হবে। গাইডলাইন অনুযায়ী, যৌন আবেদনমূলক উক্তি, শিস দেয়া, অশালীন ভাষা বা মন্তব্যের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা। ফোন, এসএমএস, ইমেইল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি, কার্টুন বা বার্তা পাঠানো। চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে স্থির বা ভিডিও চিত্র ধারণ, সংরক্ষণ বা প্রচার করা। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা বা প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হুমকি প্রদান। যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণে রাজি না হওয়ায় পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেয়া বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করাকেও অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 
গাইডলাইনে প্রতিরোধের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের প্রতি নির্দেশনায় বলা হয়েছে— প্রথমত, নারী ও পুরুষ সহকর্মীদের মধ্যে নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ বা কর্মসূচির আয়োজন করা। তৃতীয়ত, যৌন হয়রানির নেতিবাচক প্রভাব ও বিদ্যমান আইন সম্পর্কে নিয়মিত কাউন্সেলিং ও সচেতনতা সভা করতে হবে। চতুর্থত, সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলো সহজ ভাষায় নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে রাখতে হবে। (বাসস, জানুয়ারি ২০২৬) কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা আল হাইয়াতুল উলিয়া লিল মাদারিসিল কওমিয়া এ সংক্রান্ত গাইডলাইন ইস্যু করেছে। গাইডলাইনগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। কিন্তু এই গাইডলাইন পুরোপুরি অনুসরণ করা হচ্ছে না। নজরদারি ও তদারকিরও ব্যবস্থা নেই। শিক্ষকদের নৈতিক মান যদি এত নিচে নেমে যায়, চরিত্রের যদি এত অধঃপতন ঘটে। অভিভাবকরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন। তারা কি তাদের সন্তানদের পাঠশালায় পাঠাবেন না?
সম্প্রতি কিছু কিছু মাদরাসায় শিক্ষক বা সহপাঠী দ্বারা শিক্ষার্থী বলাৎকারের ঘটনা মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা পাচ্ছে। মূলত এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। যারা অভিযুক্ত বা অপরাধী যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। দু’-চার জন অপরাধীর কারণে পুরো আলেমসমাজকে হেয় প্রতিপন্ন করা কখনো উচিত নয়। কারণ এ দেশে ধর্মীয় শিক্ষার বিকাশ ও নৈতিক ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রে ওলামা-মাশায়েখদের বিরাট অবদান ও কোরবানি রয়েছে।
সুতরাং কোনো মাদরাসা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শাস্তি দেয়া নয়; বরং তাদের দায়িত্ব হলো— যৌন হয়রানি প্রতিরোধে লিখিত নীতিমালা থাকা, কার্যকর কমিটি গঠন করা, শিক্ষার্থীদের সচেতন করা, অভিযোগ করার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, অভিযোগকারীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করা, নিরপেক্ষ তদন্ত করা, অভিযোগ সত্য হলে উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া, অভিযোগের কারণে ভুক্তভোগী যাতে প্রতিশোধমূলক হয়রানির শিকার না হন তা নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসারে তদন্ত ও প্রতিকার ব্যবস্থা কার্যকর করা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে শালীনতা, পারস্পরিক সম্মান, ব্যক্তিগত সীমারেখা, দায়িত্ববোধ এবং নারী-পুরুষের মর্যাদা সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করা।
এ ছাড়া অন্ধকার ও নির্জন স্থান, আবাসিক হল, পরিবহন, সিঁড়ি, করিডোর ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তাকর্মী ও প্রয়োজনীয় নজরদারির ব্যবস্থা রাখতে হবে। তবে নজরদারি যেন শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তা অযথা লঙ্ঘন না করে, অভিযোগ করার পর ভুক্তভোগীকে দোষারোপ, অপমান বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। প্রয়োজন হলে তাকে কাউন্সেলিং, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ আবাসন/শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, অভিযোগ করার কারণে ভুক্তভোগীর নম্বর কমানো, ক্লাসে হয়রানি, বহিষ্কারের ভয় দেখানো, সামাজিকভাবে হেয় করা বা চাকরি/শিক্ষাজীবনে ক্ষতি করার চেষ্টা— এসবকেও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে,  প্রতি বছর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, ভুক্তভোগীর সাথে আচরণ এবং আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, পোস্টার, হ্যান্ডবুক ও নিয়মিত আলোচনা— এসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জানাতে হবে— কোন আচরণ যৌন হয়রানি এবং কোথায় অভিযোগ করতে হবে। সর্বোপরি দণ্ডবিধির ৩৭৫, ৩৭৬, ৩৭৭ ধারা ও ২০০৯ সালের হাইকোর্টের যুগান্তকারী নির্দেশনা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অবহিত করা। কারণ ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনা আজও শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শিক্ষক, অভিভাবক, আলেম-ওলামা, রাজনীতিক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সুশীলসমাজকে নৈতিক দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে। নৈতিক দায়বদ্ধতা শুধু অপরাধ না করার দায়িত্ব নয়; অন্যায় প্রতিরোধ করা, দুর্বলকে সুরক্ষা দেয়া এবং ন্যায় ও মর্যাদার পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা রাখাও নৈতিক দায়বদ্ধতার অংশ। 


লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার