
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ- ডাকসু বড় ধরনের সফলতা নিয়ে তাদের দায়িত্বকাল শেষ করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ক্ষমতায় গেলে নির্বাচিতরা তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে যান। নির্বাচনের আগে যে দীর্ঘ তালিকা তারা দেন সেটি জাতির সামনে ঝুলানো মুলা ছিল বলে পরে প্রমাণিত হয়। শিক্ষার্থীরা প্রতারিত বোধ করেন। এবারে ডাকসু তা ভুল প্রমাণ করেছে। তারা শুধু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নয়, এমন কিছু অতিরিক্ত কাজ তারা করেছে, যা ভবিষ্যতের যে কোনো ছাত্র সংসদের পক্ষে ছাড়িয়ে যাওয়া কঠিন হবে। তবে তালিকাভুক্ত কিছু প্রতিশ্রুতি ডাকসু বাস্তবায়ন করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে। প্রশাসনের বিমাতাসুলভ এই আচরণের বিষয়টিও ইতিহাস হয়ে থাকবে।
ছাত্র কল্যাণে ডাকসু নজর কেড়েছে, জাতির মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। ৩৬৫ দিন কার্যকালের প্রায় প্রতিদিন কিছু না কিছু কাজ তারা করেছে। পাঠাগার, ক্যান্টিন-ডাইনিং, লিফট ও আবাসিক ভবন সংস্কার। সুপেয় পানির ব্যবস্থা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র স্থাপন, ক্যাম্পাস ও নারীদের হলে ফ্রি স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণের ব্যবস্থা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহন খাতে সংস্কার, শনিবারের বাস ও সান্ধ্যকালীন ট্রিপ চালু করেছে। সন্তান প্রসবের সময় নারী শিক্ষার্থীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রাপ্তি ও ক্লাসে উপস্থিতি শিথিল করার বিষয়ে প্রশাসনকে রাজি করাতে পেরেছে। খেলার মাঠ দখলমুক্ত করে খেলার জন্য প্রস্তুত করা, সব ধরনের অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদ করে ক্যাম্পাস চাঁদাবাজমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এ সময় মাদকসেবীদের ক্যাম্পাস থেকে উচ্ছেদ করতে গিয়ে ডাকসু প্রতিনিধিদের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে। দেখা গেল, ভালো কাজে বাধা দেয়ার লোক এখনো আছে। এমনকি এদের মধ্যে শিক্ষকরাও রয়েছেন। ডাকসু নেতারা এই গোষ্ঠীর সম্মিলিত বাধা ও চতুর্মুখী প্রোপাগান্ডার মুখে পরম ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সাথে কাজ চালিয়ে গেছেন। ডাকসুর পক্ষ থেকে সর্বমিত্র চাকমা ও এ বি যুবায়ের নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়তে গিয়ে এই শ্রেণীর সমালোচনা ও নেতিবাচক ফ্রেমিংয়ের নিশানা হলেও শেষ পর্যন্ত তারা ছাত্রসমাজে হিরোর মর্যাদা পেয়েছেন। ছাত্রসমাজ ঠিক এ ধরনের ছাত্র নেতৃত্ব চায় যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন।
এ সময় প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কল্যাণমূলক কাজ করা ডাকসুর কাজ কি না। বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির এ যাবৎকালের নেতিবাচক সংস্কৃতি হলো চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখল ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রকট আকার ধারণ করেছিল গেস্টরুম, গণরুম কালচার। ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণকারী ছাত্র সংগঠন এখানে জল্লাদখানা প্রতিষ্ঠা করেছিল। গেস্টরুমে ডেকে নিয়ে ছাত্রদের মারধর, অপমান-লাঞ্ছনা ছিল নিত্যকার ঘটনা। রুম থেকে ধরে জোর করে মিছিলে নিয়ে যাওয়া ছিল নিত্যাদনের ঘটনা। কেউ কিছু বলতে পারত না। আগের ডাকসু নেতারাও এর বিরুদ্ধে যাননি; বরং একই কাজই করতেন। পার্থক্য ছিল তারা নির্বাচিত হওয়ায় এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড করার ‘বৈধতাপ্রাপ্ত’ ছিলেন। এবারের ডাকসু এই সংস্কৃতি ক্যাম্পাস থেকে ধুয়েমুছে বিদায় করেছে। ডাকসু এভাবে ভালো কাজ করবে, এমনটি যেন একটি গোষ্ঠী কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছিল না। তারা যখন বলছে, কল্যাণমূলক কাজ করা ছাত্র সংসদের কাজ নয়, তার অর্থ দাঁড়ায়, পুরনো এই সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা বা ধরে রাখাই যেন ডাকসুর কাজ। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ড ক্যামব্র্রিজ ও হার্ভার্ডসহ প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ছাত্রদের কল্যাণে এসব কাজই করে।
এবারের ডাকসু যে অসাধারণ কর্মকাণ্ড চালিয়েছে তার স্বীকৃতি মিলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিভিন্ন সময় দেয়া বক্তব্যে। বিএনপিপন্থী শিক্ষকরাও সরাসরি তা স্বীকার করেছেন। ডাকসু ও হল সংসদের সমাপনী অনুষ্ঠানে ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এইচ এম মোশারফ হোসেন ডাকসুর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ডাকসু নির্বাচনের পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা, শান্তি ও শৃঙ্খলায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অতীতের ডাকসুর সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, আগের বিভিন্ন সময়ে ছাত্র নেতৃত্বের সাথে মাস্তানি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের সংস্কৃতি ছিল, এবার তা হয়নি। ডাকসু ও হল সংসদ নেতাদের তিনি ‘সেবক ও কর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা কোনো অহঙ্কার বা নেতৃত্ব জাহির না করে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করেছেন বলে স্বীকার করেন।
এমন কিছু কাজ ডাকসুর এই সেশনের নেতারা করে দেখিয়েছেন, যা ভবিষ্যতের ডাকসু প্রতিনিধিদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। এগুলো করতে গিয়ে তারা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও বিদেশী সংস্থার সাহায্য নিয়েছেন। তারাও ডাকসুর ছাত্র নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছেন। এ জন্য বলা হচ্ছে, বাজেটের কয়েক শ’ গুণ অর্থের কাজ বাস্তবায়ন করেছে এবারের ডাকসু। এর মধ্যে মেডিক্যাল সেন্টার সংস্কার, ছাত্রীদের জন্য জিমনেশিয়াম নির্মাণ, কেন্দ্রীয় মসজিদে এসির ব্যবস্থাসহ আরো বেশ কয়েকটি বড় বাজটের কাজ। তুরস্কের একটি দাতব্য সংস্থার সহায়তায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে মেডিক্যাল সেন্টার আধুনিকায়ন করা হয়। ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত জিমনেশিয়াম চালু করা যাচ্ছে না প্রশাসনের অসহযোগিতায়। আবাসন সঙ্কট নিরসনে পাঁচটি নতুন হল ও ১০টি ভবন নির্মাণে চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে চুক্তি করেছে। বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে চীন এ সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে চায়।
একটি অভিনব জব ফেয়ার করে ডাকসু তাক লাগিয়ে দিয়েছে। চীনা দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই ফেয়ারে ৩১টি চীনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ওই অনুষ্ঠানেই ৪৩০ জন শিক্ষার্থীকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরির সুযোগ করে দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যলায়ের ভিসি ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম আমন্ত্রিত হয়েও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি। যেখানে সরকারি দলের কিছু সাধারণ কর্মসূচিতে তাকে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। রাজনৈতিক দলের ওই সব কর্মসূচিতে তিনি ছাত্রনেতাদের সাথে বসতে কোনো অস্বস্তিবোধ করেননি। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরেরও ওই অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে থাকার কথা ছিল। ভিসির পথ ধরে তিনিও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি। কল্যাণমূলক কাজে সরকারের দায়িত্বশীলদের বারবার এভাবে ডাকসুকে অসহযোগিতা করেতে দেখা গেছে।
ক্যাম্পাসে ডাকসু বড় আকারের স্বাস্থ্য ক্যাম্পের আয়োজন করে। সর্বশেষ ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বরে আয়োজিত ওই ক্যাম্পে প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পরামর্শ ও ওষুধ পেয়েছেন। এই স্বাস্থ্যসেবার ফলোআপ যাতে তারা পরে বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে করতে পারেন তার ব্যবস্থাও করেছে। এ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম আয়োজনের জন্য অর্থকড়ি ছাড়াও বড় আয়োজনের জন্য বড় সাংগঠনিক সক্ষমতাও প্রয়োজন হয়। ৫ আগস্টের পর থেকে ক্যাম্পাসে এসব ছাত্রনেতা আরো বেশ কয়েকটি বড় আয়োজন করে তাদের উঁচু মানের সাংগঠনিক ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন।
ডাকসুর এই নেতারা ইতিহাসের এক দুর্লভ সময়ে দৃশ্যপটে আসেন। তারা ক্যাম্পাসে ফ্যাসিবাদের দোসর নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগকে দেড় দশক মোকাবেলা করেছেন। তার চেয়ে বড় বিষয়, এরাই একটি দানবীয় সরকারের পতন ঘটিয়েছেন। জুলাই বিপ্লবকে চূড়ান্ত সফলতায় নিয়ে গেছেন তারা। ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বিপ্লবের কেন্দ্রীয় চরিত্র। ওই সময়ে যে অল্প কয়েকজন নেতা একে পরিণতির দিকে নিয়ে যান কায়েম তাদের অন্যতম। জুলাই বিপ্লবের পুরোভাগে থাকা ব্যক্তিদের কথায় তার স্বীকৃতি মিলেছে। ডাকসু নির্বাচনেও তার স্পষ্ট প্রতিফলন ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে তিনি তিনগুণ বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ছাত্র কল্যাণে যে দক্ষ ও গতিশীল নেতৃত্ব তিনি প্রদর্শন করেছেন, নির্বাচনী প্রচারণায় ঠিকভাবে তা সামনে রাখা গেলে পুরান ঢাকার মানুষের আস্থা অনায়াসে তিনি অর্জন করতে পারবেন।
তার সাথে জিএস এস এম ফরহাদের নেতৃত্বও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ক্যাম্পাসে সীমাহীন প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করেছেন। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের সম্মিলিত প্রোপাগান্ডা তিনি সময়মতো যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করেছেন। ৫ আগস্টের পর থেকে ক্যাম্পাসে প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় তিনি এককভাবে লড়েছেন। টিভি টকশোতে এসেও তিনি তার চেয়ে গড়ে ১০ বছরের বড় প্রতিপক্ষ ছাত্রনেতাদের ধারশায়ী করেছেন। ডাকসুর এ দু’জন নেতার ঝলকানির নিচে অন্যরা অনেকটা চাপা পড়লেও তাদের প্রায় সবাই ডাকসুতে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বই, স্মারক ও সঙ্কলন নিয়ে কয়েক ডজন প্রকাশনা বের করেছেন। এর আগে এক্ষেত্রে এতটা কাজ কেউ করেনি। মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন-বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসলিমা জুমা ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষে কাজ করে আগে থেকে আলোচনায় ছিলেন। ডাকসু সংগ্রহশালা নজরকাড়া সংস্কার করে নতুন করে আলোচনায় আসেন। এবারের ডাকসুতে থাকা প্রত্যেক সদস্য বিপ্লবোত্তর আলাদা পরিচয় নিয়ে সামনে এসেছেন। তারা সবার মধ্যে আলো ছড়িয়েছেন। ছাত্রসমাজের রত্ন বলা যায় তাদের। এদের মধ্যে একাডেমিক ফলাফলেও অনেকে বাজিমাত করেছেন। এ জি এস মো: মহিউদ্দিন খানের কথা না বললেই নয়। তিনি অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। মাস্টার্সে তিনি সিজিপিএ ৪ এর মধ্যে ৪ পান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ থেকে ডিনস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। প্রশাসন তার পুরস্কার গ্রহণের ছবিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতেও কৃপণতা করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির কালিমালিপ্ত সংস্কৃতিকে বদলে দিয়েছে এবারের ডাকসু। ছাত্রকল্যাণের ধারণাকে তারা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ছাত্ররা ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের ক্যাডারদের ডাইনিং ও ক্যান্টিনে ফাও খাওয়া দেখতে অভ্যস্ত। তারা চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসেরও শিকার হন তাদের দ্বারা। আরো নানা উপায়ে তারা কথিত এই ছাত্র নেতৃত্বের দ্বারা নিষ্পেষিত ও বঞ্চিত হন। এবারের ঢাকসু প্রতিনিধিরা তাদের প্রতি উদারতা ও ভালোবাসা নিয়ে এসেছেন। নিষ্পেষণ ও বঞ্চনার বদলে কতভাবে ছাত্রদের কল্যাণ করা যায়, সেটি দেখিয়ে দিয়েছেন। ছাত্র নেতৃত্বের অসাধারণ এক উচ্চ মান তারা সেট করেছেন। বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির জন্য এটি এক নতুন ধারা। ছাত্রসেবার এই অনন্য মডেল অন্যরা অনুসরণ করতে পারে।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
jjshim146@yahoo.com







