রিয়াদে হাউছিদের হামলা, সৌদি আরব, ওমরাহ, হজ, হজযাত্রী
শুভ্র পোশাকে ওমরাহযাত্রীরা। ফাইল ছবি
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-থ্রিতে হাউছিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশীর পরিচয় মিলেছে।
 
ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী নিহতরা হলেন- কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার মাওলানা মো: নাসরুল্লাহ বদরপুরী এবং বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের মো: শাহেদ আহম্মেদ।
 
‘শনিবার বিকেল আনুমানিক ৩টা ২০ মিনিটের দিকে রিয়াদের কিং খালেদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের টার্মিনাল-৩ এর ওপর একটি ক্ষেপনাস্ত্র এসে পড়ে। এ সময় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের যাত্রী সেখানে অপেক্ষমান ছিলেন। দুর্ঘটনায় ওই দুইজন বাংলাদেশী নাগরিক মৃত্যুবরণ করেছেন,’ জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
 
এর মধ্যে মাওলানা বদরপুরী ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের একটি মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন বলে নিশ্চিত করেছেন তার ভগ্নীপতি মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। অন্যদিকে শাহেদ আহম্মেদ সৌদি আরবেই কাজ করতেন।
 
মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, ওমরার উদ্দেশ্যে শনিবার সকালেই ঢাকা ছেড়েছিলেন নাসরুল্লাহ বদরপুরী এবং ২৪ অক্টোবর তাদের দেশে ফেরার কথা।
 
‘রিয়াদে নামার পর তাদের দুই ঘণ্টা ট্রানজিট ছিল। সেখান থেকে আলাদা ফ্লাইটে মক্কায় যাওয়ার কথা। ফ্লাইটে ওঠার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। এমন সময়ই হামলা হয়েছে বলে তার ওমরাহ দলে থাকা অন্যদের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি,’ বলছিলেন নাসির উদ্দিন।
 
তার দেয়া তথ্য মতে, ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের জামিয়া রবিউল উলুম মাদরাসার শিক্ষক নাসরুল্লাহ বদরপুরী যে দলের সাথে ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন সেই দলের মোট ৪৫ জনের মধ্যে ৩২ জনই হামলায় অক্ষত ছিল।
 
‘কিন্তু ওনি মারা গেলেন। আরেকজন যিনি মারা গেছেন তিনি সৌদি আরবেই কাজ করতেন। একজন দুই পা হারিয়েছেন। আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জেনেছি আমরা।’
 
মাওলানা বদরপুরীর পরিবারে বাবা, মা, স্ত্রী ও তিনটি সন্তান আছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
 
প্রসঙ্গত, শনিবারই রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাউছিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশী নিহত এবং আরো বাংলাদেশী গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার কথা আজ রোববার সকালে জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
 
ওই হামলার পর আজ ঢাকা-রিয়াদ রুটে পাঁচটি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুটি ফ্লাইট আছে।
 
ওদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, হামলায় আহত ৪ বাংলাদেশী স্থানীয় কিং খালিদ হাসপাতালের আইসিউতে চিকিৎসাধীন আছেন।
 
‘আমরা প্রত্যেকের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছি। বাংলাদেশ মিশন তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে একযোগে কাজ করছে,’ তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে একথা বলেছেন।
 
সৌদি কর্তৃপক্ষকে উদ্ধৃত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১০ অক্টোবরের এই হামলায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
 
সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি সূত্র জানিয়েছে, হামলার সময় বিমানবন্দরে ছিলেন, কিন্তু হামলার শিকার হননি এমন বাংলাদেশী যাত্রীদের দুটি হোটেল ও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে রাখা হয়েছে।
 
রোববার সকালে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, হতাহত বাংলাদেশীদের বিস্তারিত তথ্য জানতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে রিয়াদের বাংলাদেশ মিশন সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।
 
বাংলাদেশ নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে এবং আহতদের দ্রুত ও পূর্ণ সুস্থতা কামনা করেছে।
 
পরে বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মু‌খোমু‌খি হয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান যে, ‘সৌদির বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হয়েছেন। চার বাংলাদেশী আহত হয়েছেন, তারা সৌ‌দির কিং খালেদ হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন। আমরা সবার পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টা করছি।’
 
প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, নিহত ও আহত ব্যক্তিদের নিজ নিজ জেলা এবং পরিবারের তথ্যও সংগ্রহ করছেন কর্মকর্তারা। পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথেই তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হবে। এই ঘটনায় যারা নিহত হয়েছেন তাদের লাশ বাংলাদেশে আনা হবে রাষ্ট্রীয় খরচে।
 
‘এর আগেও যখন হাউছিরা আক্রমণ করেছিল, সেখানে কিন্তু বাংলাদেশের একজন নিহত হয়েছিলেন, এখন দুজন নিহত হলেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিগত দিনে ১৪ জন বাংলাদেশীকে হারিয়েছি। আমরা আশা করব যে এই বিপর্যয় বন্ধ হবে, এই আক্রমণ বন্ধ হবে। এ ধরনের মৃত্যু আসলে মেনে নেয়া অত্যন্ত কষ্টকর,’ বলেছেন তিনি।
 
তিনি জানান, সৌদি আরবে বাংলাদেশ সেখানে থাকা বাংলাদেশীদের সাথে যোগাযোগ করছে, হতাহতের অবস্থা জানার চেষ্টা করছে এবং বাংলাদেশীরা যতদূর সম্ভব নিরাপদে থাকতে পারেন, সে নির্দেশনা মিশনকে দেয়া হচ্ছে।
 
পরে সন্ধ্যায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে নিহত দুজনের পরিচয় প্রকাশ করা হয়।
 
বাংলাদেশের কঠোর নিন্দা
এদিকে রিয়াদের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাউছিদের হামলায় দুইজন বাংলাদেশীসহ ১২ জন হতাহতের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
 
এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্নকারী এবং বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে যে কোনো হামলা গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।’
 
এই ঘটনায় সৌদি আরবের সাথে সংহতি জানানোর পাশাপাশি সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাতের সমাধান বের করার আহ্বান আবারো জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
 
বিবৃতিতে বলা হয়, আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ, বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে চলমান সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে বাংলাদেশ।
 
প্রসঙ্গত, সৌদি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত শনিবারের ওই হামলার ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। এ ছাড়া আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানানো হয়েছে।
 
দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে সৌদি আরবের চারজন, বাংলাদেশের দুজন এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। হামলার পর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।
 
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, শনিবার দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় দাম্মাম শহরের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও একটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ে।
 
এর এক দিন আগে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, তার আগের দিন বিমানবন্দরে দুটি হামলায় পাইলটসহ সৌদি আরবের তিন নাগরিক নিহত হন। এর আগে ৬ ও ৭ অক্টোবর সৌদি আরবের দুটি বিমানবন্দরে হাউছিদের হামলায় আরো তিনজন নিহত হন। ইরান-সমর্থিত হাউছিদের বিরুদ্ধে এসব হামলার অভিযোগ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। সূত্র : বিবিসি

 

Advertisement