সারে সঙ্কট নেই, কিছু সমস্যা আছে ব্যবস্থাপনায়

কাওসার আজম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেছেন, দেশে সারের কোনো সঙ্কট নেই। তবে ব্যবস্থাপনায় কিছু সমস্যা এবং কোথাও কোথাও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির চেষ্টা রয়েছে। অসাধু ডিলারদের একটি অংশ কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে গুজব ছড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি কাটাতে নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে আমরা আশা করছি, চলতি মাসের মধ্যেই ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে পারব।
সংসদীয় কমিটির সভাপতি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ সংস্থাগুলোর অনিয়মের বিষয়ে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছি। কমিটির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এজেন্ডা নির্ধারণ করবেন। এরপর বিষয়ভিত্তিকভাবে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে। কৃষির গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতি মাসে একাধিক বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে। 
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে দৈনিক নয়া দিগন্তকে দেয়া একান্ত সাাৎকারে শাহাদাত হোসেন সেলিম এসব কথা বলেন। কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে গতকাল। কৃষির সামগ্রিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। নিচের তার সাক্ষাৎকারটি দেয়া হলোÑ
নয়া দিগন্ত : কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে?
শাহাদাত হোসেন সেলিম : আজকের সভাটি মূলত পরিচিতিমূলক সভা ছিল। মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা, অধিদফতর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে সাথে কমিটির সদস্যদের পরিচয় ও মতবিনিময় হয়েছে। পাশাপাশি সার ব্যবস্থাপনা, কীটনাশক ব্যবহার, তুলা চাষ বাড়ানো, যশোরের ফুল চাষ, ফুল গবেষণাগার এবং সেখানকার মাটির গুণগত মান উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সয়াবিন, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, বিভিন্ন ফলসহ কৃষির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই আলোচনায় এসেছে। কমিটির প্রায় প্রত্যেক সদস্য আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন পরামর্শ ও সুপারিশ দিয়েছেন। সদস্যদের যেসব প্রশ্ন ছিল, সেগুলোর তাৎণিক জবাব সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দিয়েছেন। কৃষিমন্ত্রীও সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। ভবিষ্যতে আমরা বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করব। গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতি মাসে একাধিক বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নয়া দিগন্ত : বর্তমানে সার নিয়ে মাঠপর্যায়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, প্রথম বৈঠকে এ  নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি নাÑ হলে কি ধরনের ?
শাহাদাত হোসেন সেলিম : আমরা তথ্য-উপাত্তসহ জেনেছি যে দেশে সারের কোনো সঙ্কট নেই। তবে ব্যবস্থাপনায় কিছু সমস্যা আছে। কোথাও কোথাও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। কিছু অসাধু ডিলার কৃষকদের মধ্যে প্যানিক সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে অনেক ডিলার পালিয়ে গেছেন, কেউ কেউ তাদের প্রতিষ্ঠান ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। সব মিলিয়ে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেটি কাটিয়ে উঠতে নতুন করে যাচাই-বাছাই করে ডিলার নিয়োগ করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় সার্বণিক বিষয়টি মনিটর করছে। কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই বর্তমানে সারের কোনো সঙ্কট নেই এবং সহসা সঙ্কট হওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই।
নয়া দিগন্ত : সার ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা দেখেছেন কি?
শাহাদাত হোসেন সেলিম : সারের চাহিদা একেক অঞ্চলে একেক রকম। পূর্বাঞ্চলে চাহিদা তুলনামূলক কম, সিলেটেও কম। আবার উত্তরবঙ্গে সারের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। উত্তরবঙ্গের সংসদ সদস্যরা তাদের মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তাদের বক্তব্য থেকেও আমরা দেখেছি, সেখানে মূলত সারের সঙ্কট নেই। ব্যবস্থাপনায় কিছু সমস্যা হতে পারে এবং কিছু গুজব ছড়ানো হচ্ছে। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে অবগত এবং সার্বণিক মনিটরিং করছে।
নয়া দিগন্ত : নতুন ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়াটি কিভাবে হবে?
শাহাদাত হোসেন সেলিম : নতুন ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। জেলা পর্যায় থেকে সুপারিশ করে পাঠানো হবে। নতুন নীতিমালায় সংশ্লিষ্ট ডিলারকে যে ইউনিয়নের জন্য ডিলার করা হবে, সেই ইউনিয়নের ভোটার ও বাসিন্দা হতে হবে। আগে যেকোনো জায়গা থেকে ডিলারশিপ নিয়ে কাজ করার সুযোগ ছিল। এখন ইউনিয়নভিত্তিক ডিলার হতে হবে। এতে কৃষকরাও জানবেন তাদের ইউনিয়নের ডিলার কে। ফলে ডিলারের সাথে কৃষকের সরাসরি সম্পর্ক থাকবে এবং অনিয়মের সুযোগ কমবে। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুত, চলতি মাসের মধ্যেই ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করতে পারব।
নয়া দিগন্ত : কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ে সংসদীয় কমিটির অবস্থান কী?
শাহাদাত হোসেন সেলিম : আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার সীমিত হয়ে আসছে। আমরা যেসব শাকসবজি ও ফলমূল রফতানি করি, সেগুলোর েেত্রও অনেক সময় কীটনাশকমুক্ত বা নির্ধারিত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের শর্ত থাকে। তাই দেশে কীটনাশকের অপব্যবহার রোধ করা প্রয়োজন। কীটনাশকের ব্যবহার ও প্রয়োগের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। মন্ত্রণালয়ের প থেকেও এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ তুলা আমদানি করে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে কি না?
শাহাদাত হোসেন সেলিম : আমাদের ব্যাপকভাবে তুলা আমদানি করতে হয়। এতে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে। দেশে যেসব জমি এবং পাহাড়ি এলাকায় তুলা ভালো উৎপাদন হয়, সেসব এলাকায় চাষ বাড়ানোর চেষ্টা করব। পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে না পারলেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে চাই। তুলা চাষকে আরো উৎসাহিত করা হবে।
নয়া দিগন্ত : পেঁয়াজ, আদা, কাঁচামরিচ ও টমেটোর উৎপাদন নিয়ে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
শাহাদাত হোসেন সেলিম : পেঁয়াজে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। ভবিষ্যতে এটি ধরে রাখতে হবে। আদার চাষ আরো সম্প্রসারণ করতে হবে। আমরা আশা করছি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আদাতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারব। কাঁচা মরিচে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য বড় কর্মসূচি নেয়ার কথা আলোচনা হয়েছে। সারা বছরই এর চাহিদা রয়েছে। কাঁচা মরিচ ও টমেটোর উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এগুলো কিভাবে সংরণ করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কৃষক যেন উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, সেটিও আমাদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।
নয়া দিগন্ত : কৃষিতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি?
শাহাদাত হোসেন সেলিম : বর্তমানে যেসব প্রকল্প রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই শেষ পর্যায়ে। সরকারের প থেকে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প কমিয়ে আনা হচ্ছে। তাই শুধু প্রকল্প বাড়ানোর জন্য নতুন প্রকল্প নেয়া হবে না। বাস্তবতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিষয়ভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। চলমান প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো অব্যাহত থাকবে।
নয়া দিগন্ত : সংসদীয় কমিটির অন্যতম দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আপনার নেতৃত্বে কমিটির পরিকল্পনা কী?
শাহাদাত হোসেন সেলিম : যেকোনো অনিয়মের ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স। প্রধানমন্ত্রীরও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কোনো অনিয়ম আমরা জানতে পারলে বা চিহ্নিত করতে পারলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য উদ্যোগ নেব।
তিনি বলেন, আমরা কমিটির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে আগে বসব। এজেন্ডা ঠিক করব। এরপর এজেন্ডা অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করব। আমাদের প্রত্যেক সদস্যের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অনেকের কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা আছে, কেউ এ বিষয়ে লেখাপড়া করেছেন। আবার একজন সদস্য জাতীয় কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সরাসরি কৃষকদের সাথে সম্পৃক্ত। এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা কর্মসূচি হাতে নেব এবং এজেন্ডাভিত্তিকভাবে পরবর্তী সভাগুলো করব।
নয়া দিগন্ত : কৃষক কার্ড সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার কর্মসূচি। কমিটি এটিকে কিভাবে দেখছে?
শাহাদাত হোসেন সেলিম : কৃষক কার্ড একটি চলমান প্রক্রিয়া। ইতোমধ্যে কার্ড তৈরি ও বিতরণের কাজ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে একসাথে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হবে। এর মাধ্যমে কৃষকদের সাথে সরকারের সম্পর্ক আরো গভীর হবে এবং কৃষকরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন। এটি একটি জনবান্ধব কর্মসূচি। আমরা আশা করি, কর্মসূচিটি সফল হবে।
নয়া দিগন্ত : কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা/দফতরের কর্মকর্তা, গবেষক ও বিজ্ঞানীদের প্রতি কমিটির সভাপতি হিসেবে আপনার কোনো বার্তা আছে? 
শাহাদাত হোসেন সেলিম : কৃষি কর্মকর্তা, সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীদের কাজের সাথে কৃষকের বাস্তব সমস্যার সরাসরি সমন্বয় থাকতে হবে। গবেষণার ফল যেন মাঠের কৃষকের কাছে পৌঁছায় এবং কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তি, জাত ও উৎপাদনপদ্ধতি উদ্ভাবন হয়Ñ সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, উৎপাদন বাড়ানো এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়কে সামনে রেখে গবেষণা ও সম্প্রসারণকার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।
নয়া দিগন্ত : প্রথম বৈঠকে কমিটির প থেকে কোনো নির্দিষ্ট পর্যবেণ বা সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে কি?
শাহাদাত হোসেন সেলিম : এটি মূলত পরিচিতিমূলক প্রথম বৈঠক ছিল। তবে সংসদ সদস্যরা অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন এবং মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের প থেকে এসব মতামত বিবেচনায় নেয়া এবং সুপারিশ গ্রহণের বিষয়ে কথা হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রতিটি বিষয় নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা হবে। আমরা নিয়মিতভাবে কাজ করতে চাই। কারণ কৃষি মন্ত্রণালয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয় এবং দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ সরাসরি কৃষির সাথে সম্পৃক্ত।