ফ্রান্সের সেরজি-পন্তোয়াজে সৌদি বিনিয়োগ : থিম পার্কের আড়ালে প্রভাব বিস্তারের কৌশল?

 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন ফ্রান্স থেকে

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সেরজি-পন্তোয়াজ এলাকায় তিনটি বিশাল থিম পার্ক নির্মাণে সৌদি আরবের প্রায় ছয় বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ফরাসি সরকারের কাছে এটি বড় বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পর্যটন বিকাশের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার  সংগঠনগুলোর প্রশ্ন, এটি কি শুধুই বিনোদন খাতে বিনিয়োগ, নাকি এর মাধ্যমে সৌদি আরব ইউরোপে নিজের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব আরো বাড়াতে চাইছে?
ফরাসি গণমাধ্যম ল্য মোঁদের সূত্র মতে, গত ২৪ আগস্ট ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান তাদের বৈঠকের সময় সেরজি-পন্তোয়াজে এই বিশাল বিনোদন প্রকল্পের ঘোষণা দেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে তিনটি বড় থিম পার্কের পাশাপাশি হোটেল, বিনোদনকেন্দ্র, সাংস্কৃতিক স্থাপনা ও অন্যান্য পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা হতে পারে। পুরো প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ছয় বিলিয়ন ইউরো হতে পারে।
প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে সৌদি আরবের কিদ্দিয়া ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি বা কিউআইসি। এটি সৌদি আরবের বিশাল সার্বভৌম সম্পদ তহবিল পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। পিআইএফ সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। তেলনির্ভর অর্থনীতির বাইরে পর্যটন, বিনোদন, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও অন্যান্য খাত গড়ে তুলতে এই তহবিল বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে।
২০২৫ সালের শেষ নাগাদ পিআইএফের সম্পদের পরিমাণ ৯০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি ছিল। এর ফলে এটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সার্বভৌম সম্পদ তহবিলে পরিণত হয়েছে। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশটির প্রভাব বিস্তারেও পিআইএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে এই বিপুল অর্থের উৎস নিয়েই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) অভিযোগ করেছে যে সৌদি আরবের পিআইএফ মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে উপকৃত হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে এসব কর্মকাণ্ডকে সহজতর করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে।
সৌদি আরবের বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্ক আরো গভীর হয়েছে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের কারণে। ২০১৮ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে খাশোগি নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তদন্তে সৌদি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সম্ভাব্য দায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের বিভিন্ন অংশ অস্বীকার করেছে।
খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর সৌদি যুবরাজের আন্তর্জাতিক ভাবমর্যাদা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরবর্তী সময়ে সৌদি আরব বিপুল অর্থ ব্যয় করে খেলাধুলা, বিনোদন, পর্যটন ও সংস্কৃতিতে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল, গলফ, বক্সিং, ই-স্পোর্টস, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে সৌদি অর্থের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও প্রকল্পটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেকের মতে, নতুন থিম পার্ক নির্মাণ হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, স্থানীয় ব্যবসা লাভবান হবে এবং অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। অন্য দিকে পরিবেশের ওপর চাপ, যানজট, পর্যটকের অতিরিক্ত চাপ এবং স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর বাড়তি বোঝা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশাল এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু থিম পার্ক নয়, এর আশপাশে হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট, পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন পরিষেবা খাতও সম্প্রসারিত হতে পারে। ফলে সেরজি-পন্তোয়াজ ও আশপাশের এলাকায় নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত পার্কগুলোর একটি জাপানি জনপ্রিয় মাঙ্গা ও অ্যানিমেশন সিরিজ ড্রাগন বলকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ইউরোপের অন্যতম বড় অ্যানিমেশনভিত্তিক বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তবে প্রকল্পটির চূড়ান্ত নকশা, লাইসেন্স, নির্মাণের সময়সূচি এবং অর্থায়নের কাঠামো এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
এই কারণেই ছয় বিলিয়ন ইউরোর ঘোষণাকে এখনই সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশাসনিক অনুমোদন, পরিবেশগত মূল্যায়ন, জমি ব্যবস্থাপনা, অর্থায়ন ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব চূড়ান্ত হওয়ার পরই এর প্রকৃত রূপ পরিষ্কার হবে।
ফ্রান্সের জন্য বিষয়টি তাই একদিকে অর্থনৈতিক সুযোগ, অন্য দিকে রাজনৈতিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ। বিপুল বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও পর্যটন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একই সাথে বিনিয়োগের অর্থের উৎস, সৌদি আরবের মানবাধিকার রেকর্ড এবং এই বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক প্রভাব সৃষ্টির সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হবে।
সৌদি আরবের জন্যও ফ্রান্সে এই প্রকল্পের গুরুত্ব অনেক। পিআইএফ ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রীড়া, প্রযুক্তি, বিনোদন ও পর্যটন খাতে বিনিয়োগ করছে। ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি ফ্রান্সে একটি বড় বিনোদন প্রকল্প প্রতিষ্ঠা হলে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উপস্থিতি যেমন বাড়বে, তেমনি দেশটির নতুন আধুনিক ভাবমর্যাদাও ইউরোপীয় দর্শকদের কাছে আরো দৃশ্যমান হবে।