পশ্চিমবঙ্গে মাদকের চেয়েও বিপজ্জনক বস্তু এখন গরুর গোশত

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার রদবদল এবং গবাদিপশু জবাই সংক্রান্ত আইনি কড়াকড়ির জেরে রাজ্যজুড়ে গরুর গোশতের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কলকাতার একমাত্র সরকারি কসাই বন্ধ হয়ে যাওয়া, নতুন লাইসেন্স নবায়ন স্থগিত এবং কঠোর নজরদারির কারণে রাজ্যের খাদ্যসংস্কৃতি ও ক্ষুদ্র অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিপাকে পড়েছে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। 
বন্ধ সরকারি কসাইখানা ও লাইসেন্স জটিলতা
গত মে মাসে রাজ্য সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’ কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিলে এই আইন অনুযায়ী, ১৪ বছরের বেশি বয়সী বা কাজের অযোগ্য পশু ছাড়া জবাই করা নিষিদ্ধ এবং তা কেবল নির্ধারিত পৌর বধ্যভূমিতেই করা সম্ভব। কলকাতার ট্যাংরায় একমাত্র পৌর কসাইখানা এখন বন্ধ। এ ছাড়া কলকাতা পৌরসভার বোর্ড ভেঙে যাওয়ায়  গত মে মাস থেকে গোশত বিক্রেতা ও সরবরাহকারীদের বার্ষিক ব্যবসা লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ রয়েছে। ফলে বহু বংশানুক্রমিক ব্যবসায়ী উপার্জন হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
মূল্যবৃদ্ধি ও ব্যবসায় ধস
সরবরাহ কমে যাওয়ায় গরুর গোশতের দাম একলাফে দ্বিগুণ হয়েছে। পূর্বে প্রতি কেজি ২০০-২৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় ঠেকেছে। ছোট খাবারের দোকানগুলোতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রি কমে গেছে। দাম বাড়ার পাশাপাশি গোশতের মান নিশ্চিত করতে না পেরে কলকাতার জমজমের মতো খ্যাতনামা রেস্তোরাঁগুলো তাদের মেনু থেকে গরুর গোশতের পদ একবারে বাদ দিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী অলি পাবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও নিয়মিত এই খাবার পরিবেশন করতে পারছে না। ব্যবসা মন্দা হওয়ায় অনেক রেস্তোরাঁ কর্মচারী ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ও চরম অনিশ্চয়তা
পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহাসিকভাবেই গরুর গোশত খরচে ভারতের অন্যতম শীর্ষ রাজ্যগুলোর একটি। বিশেষ করে মুসলিম, খ্রিষ্টান, দলিত ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দৈনিক খাদ্যাভ্যাসে এটি বড় ভূমিকা রাখত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ গরুর গোশতের পরিবর্তে সবজি, ছোট মাছ ও মুরগির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন; কারণ খাসির গোশত কেনা তাদের সাধ্যের বাইরে। অন্য দিকে মালদার মতো সীমান্তবর্তী ও দূরবর্তী জেলাগুলোতে প্রকাশ্য বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রাতে বাড়ি বাড়ি গোশত সরবরাহের প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ও অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ ক্রেতা- সকলের মনেই শঙ্কা যে, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো রাজ্যটির খাদ্যতালিকা থেকে এই গোশত স্থায়ীভাবেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। দাম বাড়লেও, সরবরাহ ঘাটতি ও চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে খাবারের দোকানের মালিকরা সামগ্রিক বিক্রি ৫০% কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। দুগ্ধ খামারিরা ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ায় তাদের বয়স্ক বা কর্মক্ষমতাহীন গবাদিপশু অনেক কম দামে (সাধারণ মূল্যের ৩০%-এর মতো দামে) বিক্রি করে দিচ্ছেন। অন্য দিকে স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলো ৪০% পর্যন্ত আয় হ্রাসের কথা জানিয়েছে। ভোক্তারা গরুর গোশতের পরিবর্তে শাকসবজি ও ছোট মাছের মতো সস্তা বিকল্পের দিকে ঝুঁকছেন। একই সাথে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে গ্রেফতার ও হয়রানির ভয়।
স্থানীয় একটি খাবারের দোকানের ব্যবস্থাপক মেহমুদ আলম বলেন, মে মাসে জবাইখানাটি কার্যত বন্ধ হওয়ার পর স্কুলপড়ুয়া শিশুরা দেয়াল টপকে সেখানে ঢুকে খেলাধুলা করে। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না করলে গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর ও নির্দিষ্ট ধরনের মহিষ জবাই করা যাবে না। জবাইয়ের জন্য প্রাণীটির বয়স ১৪ বছরের বেশি হওয়া, কাজ বা প্রজননের অনুপযোগী হওয়া অথবা বয়স, আঘাত, বিকৃতি কিংবা নিরাময়-অযোগ্য রোগের কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হওয়ার মতো শর্ত রয়েছে। অনুমোদিত প্রাণীও কেবল নির্দিষ্ট পৌর বা অনুমোদিত কসাই খানায় জবাই করা যাবে। বিজ্ঞপ্তিটির প্রভাব গত ঈদের সময় থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বাজার ও রেস্তোরাঁয় গরুর গোশতের সঙ্কট দেখা দেয়। তিন মাসের বেশি সময় পরও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে গোশত ব্যবসার লাইসেন্স নবায়নের জটিলতা।
 গোশত ব্যবসায়ী মুস্তাক বলেন, তার লাইসেন্স নবায়ন হওয়ার কথা থাকলেও তা আটকে আছে। তিন মাসের বেশি সময় ধরে তিনি কোনো আয় করতে পারেননি। ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের উল্লেখযোগ্য গরুর গোশত ভোক্তা রাজ্যগুলোর একটি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটির গ্রামীণ ১০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং শহুরে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার গরু বা মহিষের গোশত খায়। মুসলিমদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশও গরুর গোশত খায়। খ্রিষ্টান, দলিত ও কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এর প্রচলন রয়েছে।
কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় কয়েকটি গোশতের দোকানের মালিক জানিয়েছেন, মে মাসের পর তাদের ব্যবসায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লোকসান হয়েছে। সরবরাহ অনিয়মিত, দাম বেশি এবং গোশতের মানও আগের মতো নেই। শহরের অন্তত এক ডজন রেস্তোরাঁ গত তিন মাসে গরুর গোশতের পদ বন্ধ করেছে। জনপ্রিয় জমজম রেস্তোরাঁর তিন শাখাতেই পদটি বাদ দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শাদমান ফাইজ জানান, এতে গ্রাহক কমেছে এবং প্রায় ৪০ শতাংশ লোকসান হচ্ছে; কর্মীও ছাঁটাই করতে হয়েছে।
শুধু কলকাতা নয়, রাজ্যের অন্যান্য এলাকাতেও সঙ্কট ছড়িয়েছে। বারুইপুরে বেলা ১১টার মধ্যেই অনেক দিন গরুর গোশত শেষ হয়ে যাচ্ছে। মালদায় আবার গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গোশত বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। গরুর গোশতের ব্যবসায়ী আলফাজ লায়েকের ভাষায়, পশ্চিমবঙ্গে এখন গরুর গোশত বহন করা মাদক বহনের চেয়েও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তার আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যসংস্কৃতি থেকে গরুর গোশত একসময় অতীতের স্মৃতিতে পরিণত হতে পারে।