
ময়মনসিংহ অফিস
‘আগুন লাগার পর স্বামীকে কাঁধে করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে আমাদের ফেলে দেয়া হয়। আমি সিঁড়িতে পড়ে জ্ঞান হারাই। পরে জ্ঞান ফিরে শুনি, আমার স্বামী মারা গেছেন।’
কথাগুলো বলছিলেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ফুলবাড়িয়ার পল্লীচিকিৎসক শাহজাহান মোল্লার স্ত্রী হারিছা বেগম। গতকাল বুধবার সকালে ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের বাড়িতে স্বামীর কবরের পাশে বিলাপ করতে করতে কথা বলছিলেন তিনি।
হারিছা বেগম জানান, সোমবার সন্ধ্যায় মমেক হাসপাতালের নতুন ভবনে আগুন লাগার পর চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তখন তিনি ও তার বড় বোন জাহানারা অসুস্থ শাহজাহান মোল্লাকে কাঁধে করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। এ সময় পেছন থেকে ধাক্কা এলে তারা সিঁড়িতে পড়ে যান। তখনও মানুষ আমাদের ওপর দিয়েই চলে যাচ্ছিল।’
পরিবারের সদস্যদের দাবি, আগুনের পর সৃষ্ট আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ির মধ্যে পদদলিত হয়েই শাহজাহান মোল্লার মৃত্যু হয়েছে। তবে এ দাবির সাথে একমত নয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বিভাগীয় কমিশনারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগুনের ঘটনায় কেউ পদদলিত হয়ে মারা যাননি। নিহত দু’জনের মৃত্যু স্বাভাবিক বলে জানানো হয়েছে।
তবে নিহতদের স্বজনেরা এ বক্তব্য মানতে নারাজ। হারিছা বেগম বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, কেউ পদদলিত হয়ে মারা যায়নি। তারা তো ঘটনাটি দেখেনি। আমি সেখানে ছিলাম। আমি দেখেছি কী হয়েছে।’
আতঙ্কে মৃত্যু সিএনজিচালকেরও: একই ঘটনায় ফুলবাড়িয়ার সিএনজিচালক রমজান আলী এবং তারাকান্দার কুলসুম বেগমও মারা গেছেন। তাদের লাশ নিজ নিজ বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়েছে।
রমজান আলীর স্ত্রী খাদিজা আক্তার বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে বুকে ব্যথা নিয়ে মমেক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তার স্বামী। সোমবার সন্ধ্যায় আগুন লাগার পর হাসপাতালের ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তিনি দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে আতঙ্কিত হয়ে সেখানেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে যান। কয়েকজনের সহযোগিতায় তাকে ওপরে নেয়া হলে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে মৃত ঘোষণা করেন।
খাদিজা আক্তারের ভাষ্য, ‘হাসপাতালে আগুন না লাগলে, আতঙ্কিত না হলে আমার স্বামী হয়তো বেঁচে যেতেন।’
এদিকে আগুনের ঘটনায় প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি অনুসন্ধানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে কমিটি গঠন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারাই তদন্ত কমিটিতে : হাসপাতালের নতুন ভবনের ১১ নম্বর লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগার ঘটনায় লিফটের রক্ষণাবেক্ষণ, অনিয়ম ও অবহেলার অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত বিভাগের বিরুদ্ধে। অথচ তদন্ত কমিটিতে ওই বিভাগের দু’জন প্রকৌশলীকে সদস্য করা হয়েছে।
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা: মো: জাকিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত দাফতরিক চিঠি অনুযায়ী, পাঁচ সদস্যের কমিটির সভাপতি করা হয়েছে মমেকের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ও ইউনিট প্রধান অধ্যাপক ডা: গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে।
কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস, গণপূর্তের কেন্দুয়া সাব-ডিভিশনের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) মাজেদুর রহমান এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী। সদস্যসচিব করা হয়েছে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা: মোহাম্মদ মাঈনউদ্দিন খানকে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানের দায়িত্ব পাওয়া কমিটিতে যাদের বিভাগের বিরুদ্ধে লিফটের রক্ষণাবেক্ষণ ও অবহেলার অভিযোগ উঠেছে, সেই বিভাগের দু’জন প্রকৌশলীকে রাখায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
স্থানীয় নাগরিক নেতা আবুল কালাম আল আজাদ বলেন, ‘যার ব্যর্থতা ও দুর্নীতির কারণে লিফটের যন্ত্রাংশ অকেজো ছিল এবং শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগে এতগুলো প্রাণ গেল, সেই প্রকৌশলীদেরই তদন্ত কমিটিতে রাখা মানে রক্ষককে ভক্ষকের দায়িত্ব দেয়া। এই কমিটি কখনোই নিরপেক্ষ প্রতিবেদন দেবে না।’
এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস বলেন, ‘কমিটি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এখানে আমাদের একার কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার সুযোগ নেই। কমিটির মূল কাজ ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করা।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, গণপূর্ত বিভাগের গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তাদেরই কর্মকর্তাদের তদন্ত কমিটিতে রাখা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মৃত্যুর কারণ কী এবং আগুনের সূত্রপাতের পেছনে কারও অবহেলা বা ত্রুটি ছিল কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে।







