বিজিবির তৎপরতার পরও থামছে না চোরাচালান

 এস এম মিন্টু

 

* সিলেট, মৌলভীবাজার যশোর সীমান্তে নতুন কৌশলে সক্রিয় সিন্ডিকেট
* বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা- অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দুই-ই ঝুঁকিতে

দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নজরদারি ও অভিযান জোরদার হলেও থেমে নেই চোরাচালান। মাদক, গবাদিপশু, প্রযুক্তিপণ্য থেকে শুরু করে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, একের পর এক বড় ধরনের চালান জব্দ হলেও চোরাচালানকারী চক্রগুলো কৌশল পাল্টে নতুন নতুন রুট ব্যবহার করছে। এসব চোরাচালানে সীমান্তবর্তী এলাকার অন্তত পাঁচ হাজার বেকার যুবককে ব্যবহার করছে গডফাদাররা। মাত্র ৫০০ থেকে এক হাজার টাকার বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার মাদক ও চোরাচালান ওপার থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা- অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দুই-ই ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। যুবকদের বেকারত্বের সুযোগে 
বড় বড় মাফিয়ারা কোটি টাকার চোরাচালান অল্প পারিশ্রমে আনছে। এতে করে যুবসমাজ যেমন ধ্বংসের   পথে এগোচ্ছে তেমনি একটি পরিবারও অভিশপ্ত হয়ে উঠছে। তাই সীমান্তে যেসব বেকার যুবক রয়েছে তাদের তালিকা করে সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে।  এদিকে গতকাল মিয়ানমার সীমান্তে বিজিবির নজরদারি ও অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে নতুন দু’টি টিওবি উদ্বোধন করা হয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী আরচ্ছতলা টিলা ও হাতুরানী টিলা এলাকায় নবনির্মিত দু’টি টেম্পরারি ওপারেশন বেস (টিওবি) উদ্বোধন করা হয়েছে। 
পরিসংখ্যানে চোরাচালানের ভয়াবহতা : চলতি বছরের প্রথম আট মাসে শুধু মৌলভীবাজার সীমান্ত এলাকা থেকেই ৮৩০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের মাদক ও চোরাচালান পণ্য জব্দ করেছে বিজিবির ৪৬ ব্যাটালিয়ন (শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়ন)। জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে এসব পণ্য জব্দ করা হয়। শুধু আগস্ট মাসেই সারা দেশে বিজিবির অভিযানে অস্ত্রসহ ৩৪৭ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ হয় এবং ৪৫১ জন গ্রেফতার করা হয়েছে। 
মিয়ানমার সীমান্ত : সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে দেশে আসা স্বর্ণ, হুন্ডি, মাদকসহ চোরাই পণ্যের লেনদেন হচ্ছে মার্কিন ডলারে। আর কক্সবাজারের মিয়ানমার সীমান্তে কারবারিরা সোনাদানা দিয়ে ইয়াবার দাম মেটাচ্ছে। এ কারণে সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত ডলার ও অবৈধ স্বর্ণ ধরা পড়ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি টেকনাফে ১৪ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করে বিজিবি। এত ইয়াবা জব্দ করার পর অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা চমকে উঠে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, মিয়ানমার সীমান্তে মাদক, স্বর্ণ চোরাচালান এবং মুদ্রা পাচার বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, রাখাইন রাজ্যের চলমান সঙ্ঘাত এবং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের সক্রিয়তার কারণে এই সীমান্ত অপরাধের একটি ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। 
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লক্ষ্য করেছে যে, মুদ্রা পাচারের পাশাপাশি পণ্যের বিনিময়ে মাদক বা ‘বার্টার সিস্টেম’ সীমান্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ থেকে সার এবং সিমেন্টের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অবৈধ উপায়ে মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে। এর বিনিময়ে মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস)। নগদ টাকার পরিবর্তে অপরাধীরা এক ধরনের ‘নার্কো-কারেন্সি’ বা মাদক-কেন্দ্রিক লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা প্রচলিত ব্যাংকিং বা হুন্ডি চ্যানেলকেও ফাঁকি দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অবৈধভাবে স্বর্ণের বড় বড় চালান প্রবেশ করছে। এই স্বর্ণের একটি বড় অংশ আবার বাংলাদেশ হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার হয়ে যায়। সীমান্তে মাদক ও অস্ত্র কেনার অর্থায়নে অবৈধ স্বর্ণকে অন্যতম প্রধান মাধ্যম বা বিনিময়-মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মুদ্রা পাচার ও হুন্ডি নেটওয়ার্ক মাদক ও স্বর্ণের অবৈধ বাণিজ্য সচল রাখতে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক হুন্ডি সিন্ডিকেট কাজ করছে। সীমান্ত অঞ্চলের ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দৈনিক কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত অপরাধীরা মোবাইল ব্যাংকিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ডিজিটাল মাধ্যমগুলোকেও মুদ্রা পাচারে কাজে লাগাচ্ছে। 
সিলেট সীমান্ত, পুরনো করিডোরে নতুন চাপ : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিলেট সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় গরু-মহিষের পাশাপাশি মসলা, শাড়ি, থ্রিপিস, মোটরসাইকেল ও স্মার্টফোন পাচার হয়ে আসছে, আর এসবের আড়ালে ঢুকছে মাদক ও অস্ত্র, যাতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হুমকিতে পড়ছে। নির্দিষ্টভাবে সিলেটের কলাসাদেক, গোয়াইনঘাট, ধলাই ব্রিজ এলাকা, পিয়াইন নদী তীরবর্তী অঞ্চল, বাল্লাঘাট ও জাফলং ব্রিজ এলাকা- এই পয়েন্টগুলোতে অবৈধ কার্যক্রমের প্রবণতা বেশি বলে বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিটগুলো নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জোরদার করেছে। 
জানা যায়, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট থানা এলাকার ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডাউকি অঞ্চল অবস্থিত। ডাউকি সীমান্ত দিয়েই মূলত অবৈধভাবে গরু ও মহিষের বড় বড় চালান বাংলাদেশে ঢোকে। গোয়াইনঘাটের হাজিগঞ্জ এবং কানাইঘাট এলাকার সুরইঘাট দিয়ে চোরাচালান বেশি হচ্ছে। এছাড়া বিছানাকান্দি ও গোয়াইনঘাট সীমান্তের হাদারপাড় বাজার এবং হরিপুরের দরবস্ত বাজার চোরাচালানের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত। রাত ২টা থেকে ভোররাত ৪টা-এই সময়টিকে বেছে নেয় চক্রটি। দিনে বিছানাকান্দি সীমান্ত দিয়ে গড়ে ৫০০ এবং জৈন্তাপুর-দরবস্ত দিয়ে ৩০০ গবাদিপশু অবৈধভাবে ঢোকে। গবাদিপশু বা পণ্য ঢোকানোর জন্য নির্দিষ্ট হারে গুনে গুনে ‘লাইন ফি’ পরিশোধ করতে হয়। অভিযোগ রয়েছে প্রতি জোড়া গরুর জন্য একটি বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তাদের দিতে হয় তিন হাজার টাকা।এছাড়াও সিলেটের জাফলং ও গোয়াইনঘাট সীমান্তের রাধানগর বাজারটি চোরাচালানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্ট। এটি গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ইউনিয়নে অবস্থিত। এখান থেকে সীমান্তের মূল চোরাচালান পয়েন্ট এবং বিভিন্ন খাসিয়া পুঞ্জিগুলো খুবই কাছে। সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ ভারতীয় চিনি, কসমেটিকস ও শাড়ির অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুট এই রাধানগর বাজারসংলগ্ন এলাকা। সাধারণত প্রতি রবি ও বুধবার এই বাজারে একটি বড় গরুর হাট বসে। এই রুটেই বিদেশী মুদ্রা পাচারসহ বিভিন্ন মাদক চোরাচালানি প্রবেশ করে।  
যশোর-বেনাপোল করিডোর : দেশের পশ্চিম সীমান্তেও চোরাচালান চক্র সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি যশোর ব্যাটালিয়নের (৪৯ বিজিবি) টহলদল আমড়াখালী চেকপোস্ট ও বেনাপোল আইসিপি এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিদেশী মদ, সিরাপ, শাড়ি ও প্রসাধনীসামগ্রীসহ চোরাচালানি মালামাল জব্দ করে। এই রুটটি ঐতিহ্যগতভাবে ভারত থেকে ভোগ্যপণ্য পাচারের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে চিহ্নিত। 
‘গডফাদার’ নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্ক : বিজিবির নিজস্ব অনুসন্ধানেই উঠে এসেছে ভিন্ন এক বাস্তবতা- সীমান্তের ওপার মিয়ানমার ও ভারত থেকে আসা মাদক ও চোরাচালানি পণ্য বহনকারী দালালরা (কেরিয়ার) চালানপ্রতি মাত্র ৫০০ থেকে এক হাজার টাকায় কাজ করে, অথচ পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে ঢাকায় বসে থাকা ‘গডফাদাররা’। এ থেকে স্পষ্ট, সীমান্তে ধরপাকড় বাড়লেও মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে। 
ডলার পাচার : বাণিজ্যের আড়ালে বড় ফাঁক : মাদকের মতো প্রকাশ্য ভৌত চোরাচালানের বাইরে ডলার পাচারের চিত্র ভিন্ন। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এক দশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে সাত-আট বিলিয়ন ডলার পাচার হয় এবং এই পাচার থেকেই দেশের ডলার সঙ্কটের সূত্রপাত। 
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের সীমান্ত এলাকায় শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত বেকার যুবকদের একটা বড় অংশকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিলে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চোরাচালানের সাথে যুক্ত হবে না। তাদের সঠিকভাবে আলোর পথে না আনলে এটি চরম আকার ধারণ করবে। 
তিনি আরো বলেন, শুধু সীমান্ত টহল নয়- গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে সমন্বয়, ঢাকাকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রকদের চিহ্নিতকরণ, ব্যাংকিং চ্যানেলে ট্রেড-বেজড মানিলন্ডারিং রোধে কঠোর নজরদারি এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক পুনর্বাসনই এই সঙ্কট মোকাবেলার মূল চাবিকাঠি। 
বিজিবির কক্সবাজার রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী সামশের উদ্দীন বলেন, নবনির্মিত টিওবি দু’টির মাধ্যমে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বিজিবির নজরদারি ও টহল কার্যক্রম আরো কার্যকর ও গতিশীল হবে। পাশাপাশি মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ এবং সীমান্তবর্তী জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিজিবির সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, বিশেষ করে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো সম্ভব হবে।