বিশ্বব্যাংকের ঋণে আবারো ব্যাংক সংস্কারে ১,২৭৬ কোটি টাকার প্রকল্প

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু 

 

যন্ত্রপাতি কেনাকাটায়ই ব্যয় ৭১২ কোটি টাকা
প্রকল্পের সুফল নিয়ে শঙ্কা 
অনুমোদনের জন্য একনেকে উঠছে আজ

এক হাজার ২৬২ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর্থিক খাতের নিরাপত্তা ও ব্যাংক সংস্কার করতে চায় সরকার। বিশ্বব্যাংক থেকে নেয়া এই ঋণের বেশির ভাগই ব্যয় হবে যন্ত্রপাতি কেনার কাজে। যার পরিমাণ ৭১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এ প্রকল্পটির নাম দেয়া হয়েছে ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ (এফএসএসপি-২)। 
আজ বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেকে অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি উত্থাপন করা হবে।   
জানা গেছে, ২০১৫ সালে ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-১’ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল এটি বাস্তবায়ন হলে ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরবে এবং খেলাপি ঋণ কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরেনি এবং খেলাপি ঋণও কমেনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে এখন ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কোনো কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৭৫ থেকে ৯৫ শতাংশ হয়ে গেছে। এসব ঋণ আদায় করাও এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে। 
এ দিকে এই প্রকল্পের বিষয়ে বলা হয়েছে, উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি এবং পুরনো প্রযুক্তির মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে বড় ধরনের কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য বিশ্বব্যাংকের ঋণে এই প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। প্রকল্পের বেশির ভাগ অর্থই আসছে বৈশ্বিক সহায়তা হিসেবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক দেবে এক হাজার ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বাকি ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে। 
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো দেশের আর্থিক খাতের নিরাপত্তা বেষ্টনী (সেফটি নেট) শক্তিশালী করা, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং চলমান ব্যাংক সংস্কার কার্যক্রমকে দ্রুততর করা। 
প্রকল্পের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে আর্থিক সেবার চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশের আর্থিক খাতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। তবে উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের দুর্বলতা, পুরনো আইসিটি ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। 
আরো বলা হয়েছে, আর্থিক খাতের তদারকিতে ব্যবহৃত আইসিটি অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার অভাবের কারণে সাইবার হামলা ও আন্তঃসীমান্ত আর্থিকসহ উদীয়মান ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সমস্যা আমানতকারীদের আস্থা এবং দেশের আর্থিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলছে। 
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংক আগে যে ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেছিল, তার ধারাবাহিকতায় এফএসএসপি-২ নেয়া হয়েছে। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হবে। 
প্রকল্পটির তিনটি প্রধান উপাদান রয়েছে। এগুলো হলো- তদারকি সক্ষমতা ও ব্যবস্থার উন্নয়ন, আর্থিক খাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠনে সহায়তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা প্রদান। 
এর দ্বিতীয় উপাদানের আওতায় আর্থিক খাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। 
অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন 
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। 
তথ্যপ্রযুক্তি আধুনিকায়নে বড় বরাদ্দ 
প্রকল্পটির বেশির ভাগ অর্থই ব্যয় হবে ব্যাংকিং খাতের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) অবকাঠামো আধুনিকায়নে :
যন্ত্রপাতি ক্রয় : ৭১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা
সফটওয়্যার উন্নয়ন : ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা
ডাটাবেজ ও অন্যান্য : ৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন 
তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সমন্বিত তথ্য কাঠামোর অভাবে সাইবার হামলা ও আন্তঃসীমান্ত আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়ে ব্যাংক খাত। নতুন এই প্রকল্পের আওতায় আমানত বিমাট্রাস্ট ফান্ডের (ডিআইটিএফ) আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করা ও ব্যাংক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হবে। 
পরিকল্পনা কমিশন থেকে ইতোমধ্যে প্রকল্পটি একনেক অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশন আশা করছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকখাতের ঝুঁকি কমবে এবং দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা নতুন করে সুসংহত হবে। 
প্রকল্পের ঝুঁকি 
এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের বৈদেশিক অর্থায়ন মিললেও, এর সফল বাস্তবায়ন ঘিরে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির পূর্বাভাস দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রযুক্তিগত ও ক্রয়ের জটিলতা : প্রকল্পের বৃহত্তম অংশ (১,০৭১ কোটি টাকার বেশি) আইসিটি সরঞ্জাম ও সফটওয়্যার ক্রয়ে ব্যয় হবে। এর আগে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে আন্তর্জাতিক দরপত্র ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। সময়মতো প্রযুক্তি সরবরাহ ও ইনস্টলেশন না হলে পুরো প্রকল্প পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা ও কাঠামোগত দুর্বলতা : ব্যাংকিং খাতে সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থার ঘাটতি ও উদীয়মান সাইবার হামলার ঝুঁকি রয়েছে। দ্রুত প্রযুক্তি রূপান্তরের সময় নতুন কোনো নিরাপত্তা ত্রুটি দেখা দিলে সাইবার সুরক্ষা ব্যাহত হতে পারে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ : প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সুশাসন বৃদ্ধি ও পুনর্গঠন। তবে এসব ব্যাংকে প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারবিরোধী মানসিকতা থাকলে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হতে পারে।
খেলাপি ঋণ মোকাবেলার চ্যালেঞ্জ : শুধু কারিগরি ও আইসিটি অবকাঠামো আধুনিকায়ন করে ব্যাংকিংখাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, যদি না খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তা না হলে এই প্রকল্পের মাধ্যমে কেনাকাটা ও প্রশিক্ষণের নামে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিদেশভ্রমণও মূখ্য বিষয় থাকবে। 
প্রকল্প বাস্তবায়নের সার্বিক সাফল্যনির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও কঠোর সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর। এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।