
শাহেদ মতিউর রহমান
অর্থসঙ্কটে পরীক্ষা গ্রহণে অনিশ্চয়তা
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়মতি খরচ বা পরিচালনায় অর্থ সংস্থানের বড় একটি উৎস পিইডিপি প্রকল্প। গত অর্থবছরে এই পিইডিপি-৪ (প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প) শেষ হওয়ার পর এখন পিইডিপি-৫ অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু নতুন অর্থবছরের প্রায় তিন মাসেও প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ার সরকারি প্রাথমিকে বিদ্যালয়ের নিয়মিত খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি দেশের ৫৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের পরীক্ষার ফি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না অনেক বিদ্যালয়ে। অন্য দিকে ম্যানেজিং কমিটি গঠন এখনো পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন না হওয়ার বাধ্য হয়ে অনেক স্কুলের প্রধান শিক্ষককে নিজে পরীক্ষার ব্যয়ভার বহন করছেন। অবশ্য পরবর্তীতে স্লিপের (স্কুল লেভেল ইমপরট্যান্ট প্ল্যান) অর্থ পাওয়া গেলে তারা এই টাকা সমন্বয় করে নেবেন। যদিও অনেক স্কুলে নিয়মিত এবং অতি জরুরি ব্যয় নির্বাহ করাও সম্ভব হচ্ছে না। পিইডিপ-৪ শেষ হওয়ার পর গত দুই মাস ধরে স্লিপ ফান্ড না থাকার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে।
তবে নানা সমস্যা আর সঙ্কটের মধ্যে সুসংবাদ জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছেন, সরকার তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার্র্থীদের জন্য শিক্ষা উপকরণের সবগুলোই বিনামূল্যে সরবরাহ করবে। বিনামূল্যের পাঠ্যবই আগে থেকেই দেয়া হচ্ছে। নতুন সরকার আসার পর শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগ জুতা এবং মিড ডে মিলের ব্যবস্থা করেছে। আগামী বছর থেকে দেশের সব স্কুলেই সব শিক্ষার্থীর জন্য মিড ডে মিল চালু করা হবে। একই সাথে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে পাঁচ শ’ টাকার মধ্যে কলম পেন্সিল খাতা, জ্যামিতি বক্স, কাটার ইরেজারসহ সব উপকরণ বিনামূল্যে দেবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত একটি ডিসেমিনেশন ওয়ার্কশপে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন ইউনিসেফের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ জয় মিলান মালের। গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের টিচিং অ্যান্ড লার্নিং ম্যাটেরিয়ালসের ব্যয় তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, একজন শিক্ষার্থীর জন্য পেন্সিল, খাতা, ড্রয়িং খাতা, রুলার, রাবার, শার্পনার এবং পেন্সিল বক্স বা কালার পেন্সিল এই সাতটি মৌলিক উপকরণ প্রয়োজন। হিসাব করলে একজন শিক্ষার্থীর পুরো বছরের টিচিং অ্যান্ড লার্নিং এক্সপেন্স ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে হতে পারে। তিনি বলেন, টেক্সটবুক তো আমি দিয়ে দিচ্ছি। সামনে ইউনিফর্ম আমি দিয়ে দিচ্ছি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় স্লিপ ফান্ডের মাধ্যমে টিচিং অ্যান্ড লার্নিং ম্যাটেরিয়ালসের যে ব্যয় করা হয়, প্রয়োজনীয় এসব উপকরণ সরকার চাইলে আলাদাভাবে সরবরাহ করতে পারে। এভাবে করলে এ খাতে স্লিপ ফান্ডের প্রয়োজনীয়তাও কমে আসতে পারে। স্লিপ ফান্ডের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, স্কুলকে আগে নিজের পকেট থেকে খরচ করে পরে সরকারের কাছ থেকে টাকা নেয়ার ব্যবস্থা কার্যকর নয়। অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কা থাকলেও এর সমাধান হিসেবে অগ্রিম অর্থ না দেয়ার পরিবর্তে জবাবদিহি ও মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হেডটিচারকে পুরো স্কুলের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়া উচিত। একই সাথে স্কুলের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী সংখ্যা, ভবনের বয়স, কক্ষসংখ্যা ও অন্যান্য বাস্তব বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে পিপিআরসির পক্ষ থেকে স্লিপ ফান্ড ও স্কুল লেভেল ইম্প্রুভমেন্ট প্ল্যান নিয়ে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এসব সুপারিশের মধ্যে পাঁচটিকেই গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবায়নযোগ্য বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, পিইডিপি-৪ শেষ হওয়ার পর গত দুই মাস ধরে স্লিপ ফান্ড না থাকার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে। পিইডিপি-৫ এখনো অনুমোদিত না হওয়ায় এই অর্থ আটকে থাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘ইকুইটি-বেসড’ বা প্রয়োজনভিত্তিক বরাদ্দের ওপরও গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সরকারের সম্পদ সীমিত হওয়ায় যার আর্থিক প্রয়োজন বেশি, সরকারি সহায়তার ক্ষেত্রে তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। অনুষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, স্লিপ ফান্ডের ব্যবস্থাপনা, স্কুল পর্যায়ে জবাবদিহি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কমিউনিটি ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা এবং মনিটরিং ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শঙ্করসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।







