
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিকীকরণে প্রধানমন্ত্রীর আশ^াসে পুরোপুরি পাল্টে গেল পুঁজিবাজার চিত্র। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে টানা বিক্রয়চাপে পর্যুদস্ত দেশের পুঁজিবাজারগুলো গতকাল আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গলবার সকালে লেনদেনের শুরু থেকে বড় কোনো বিক্রয়চাপ ছাড়াই সাবলীল আচরণ ছিল বাজারে। এ সময় বাজারের সব সূচকই ছিল বেশ ঊর্ধ্বমুখী। লেনদেনের শেষপর্যায়ে এসে মৃদু বিক্রয়চাপের সৃষ্টি হলেও দ্রুতই তা কাটিয়ে ওঠে বাজারগুলো। আর এভাবে দিনশেষে উভয় পুঁজিবাজারই সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি গতকাল ৯৩ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। পাঁচ হাজার ৩৭৯ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বিকেলে লেনদেন শেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৪৭২ দশমিক ৪৬ পয়েন্টে। দিনের শুরু থেকে টানা ঊর্ধ্বমুখী আচরণ করা সূচকটি ১০০ পয়েন্টের কাছাকাছি উন্নতি ঘটলেও মৃদু বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হওয়ায় আবার সাময়িকভাবে নি¤œমুখী হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ফের ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সূচকটি লেনদেন শেষ হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে ১১০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। এ সময় সূচকটি পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৪৮৯ দশমিক ৭৭ পয়েন্টে। কিন্তু দিনের সমন্বয় শেষে পাঁচ হাজার ৪৭২ দশমিক ৪৬ পয়েন্টে স্থির হয় সূচকটি। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৮৯ ও ১৬ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট।
তবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। এখানে সূচকের আচরণে ছিল যথেষ্ট সতর্কতা। বাজারটির প্রধান সূচক সার্বিক মূল্যসূচক ৪৪ দশমিক ৬১ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে গতকাল। ১৪ হাজার ৫৫৩ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি লেনদেন শেষে ১৪ হাজার ৫৯৮ দশমিক ৪৬ পয়েন্টে স্থির হয়। এদিন বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩৯ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৩৯ দশমিক ৫২ ও ২৬ দশমিক ২৪ পয়েন্ট।
প্রসঙ্গত গত আগস্ট মাসের শুরু থেকেই দেশের পুঁজিবাজারে মন্দার ভাব তৈরি হয়। ওই সময় দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কথা বিভিন্ন সংবাদমাধমে উঠে আসে। একই সময় সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকেও জ্বালানি সঙ্কটের বাস্তবতা স্বীকার করে নেয়া হলে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। এতে বাজারে ধারাবাহিক পতন ঘটতে শুরু করে। এক মাসের ব্যবধানে ঢাকা শেয়ারজারে প্রধান সূচকটি চার শ’ পয়েন্টের বেশি হারায়। দুই সপ্তাহ আগে থেকে পতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। গত ৬ সেপ্টেম্বর ও ১৩ সেপ্টেম্বর যথাক্রমে ১০৩ পয়েন্ট ও ৯৬ পয়েন্ট অবনতি ঘটে ঢাকা শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকটির। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সমাধানের চেষ্টা করেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি ঘটাতে পারেনি। রোববার প্রধানমন্ত্রী শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহ আগের মতো স্বাভাবিকীকরণের আশ^াস দিলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে।
গতকাল দিনের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাজারের সব খাতেই গতকাল কমবেশি মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। বিশেষ করে গত কিছুদিন যেসব কোম্পানি বেশি দরপতনের শিকার ছিল মূল্যবৃদ্ধির দিক থেকে সেগুলোই বেশি এগিয়ে ছিল গতকাল। তবে বরাবরের মতো সূচকের উন্নতিতে ব্যাংকিং খাতের প্রাধান্য দেখা যায়নি। এদিক থেকে এগিয়ে ছিল বীমা খাত। শতভাগ কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় উঠে আসে এ খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি। তাছাড়া স্বল্প মূলধনের কোম্পানিগুলোর মধ্যে যেগুলো গত কয়েকদিন টানা দরপতনের শিকার ছিল এরাই হারানো দরের একটি অংশ ফিরে পায়। এ ধরনের কোম্পানিগুলোর মধ্যে কয়েকটি আবার দিনের সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরে লেনদেন হয়েছে।
দিনের বাজার আচরণ দীর্ঘদিন পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনে। তবে এর মধ্যেও অনেকে পুঁজিবাজারের আবার গতি ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছেন না। তাদের মতে, কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতেই জিম্মি হয়ে আছে পুঁজিবাজার। এরা যেভাবে চায় সেভাবেই চলে বাজার। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ডিএসই কর্তৃপক্ষও যৌক্তিক কারণে এদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। বাজারে এদের দৌরাত্ম্য যতদিন থাকবে ততদিন বাজারের স্বাভাবিক আচরণ ফিরে পাওয়া দুরূহ হবে বলে মনে করেন তারা।
তবে টানা পতনের পর হঠাৎ সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটলেও ঢাকা বাজারে বিনিয়োগকারীরা ছিলেন বেশ সতর্ক। এরই প্রতিফলন ঘটে লেনদেনে। প্রথম আড়াই ঘণ্টা বাজারের গতি ছিল না বললেই চলে। একদিকে টানা দরপতনের ফলে শেয়ারের মূল্যস্তর কমে যাওয়ায় শেয়ার বিক্রির সুযোগ ছিল কম। আবার মূলধন স্বল্পতার কারণে কম মূল্যস্তরেও বিনিয়োগ বাড়াতে পারেনি কেউই। তবে দিনের শেষভাগে তার কিছুটা কাটিয়ে ওঠে বাজারটি। দিনশেষে ডিএসইর লেনদেন ৫০০ কোটির ঘর অতিক্রম করে। দিনশেষে বাজারটি ৫০৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ১৮ কোটি টাকা বেশি। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৪৮৬ কোটি টাকা। একই কারণে চট্টগ্রামে ২১ কোটি টাকা থেকে ১৯ কোটিতে নেমে আসে লেনদেন।
ঢাকা স্টকে গতকাল লেনদেনের শীর্ষস্থানটি ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসির দখলে। ১৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৬০ লাখ ৪২ হ্জাার শেয়ার হাতবদল হয় এ দিন। ১৯ কোটি ২৫ লাখ টাকায় ১৭ লাখ ৭০ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে সাধারণ বীমা কোম্পানি রিলায়ান্স ইন্স্যুরেন্স ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইস্টার্ন ব্যাংক, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, এনভয় টেক্সটাইলস, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, সায়হাম টেক্সটাইলস, মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্স, মালেক স্পিনিং ও প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস।







