পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনের রূপরেখা নেই, সমাপনী অনুষ্ঠানে ক্ষোভ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 

এক বছর দায়িত্ব পালনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে অনুষ্ঠানে পরবর্তী ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডাকসুর নেতারা। দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবিও জানিয়েছেন তারা। 
গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠান শেষ হয় রাত সাড়ে ৯টায়। এতে ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ, কেন্দ্রীয় সংসদের নেতৃবৃন্দ এবং জগন্নাথ হল ছাড়া অন্যান্য হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন না। 
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, উপাচার্যের সিদ্ধান্ত ও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলেও তিনি উপস্থিত হননি। পরে তার সাথে যোগাযোগের জন্য ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। 
সমাপনী অনুষ্ঠানে হল সংসদের প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালনের  সময় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নেয়া উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। বক্তাদের বক্তব্যে পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবি গুরুত্ব পায়। 
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, কেন্দ্রীয় ও হল সংসদের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং দলগতভাবে কাজ করার কারণেই বিভিন্ন অর্জন সম্ভব হয়েছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যর্থতা থাকলে এর দায় নিজের ওপর নিয়ে তিনি বলেন, ব্যর্থতার কথা বললে সেটি তার একান্ত ব্যর্থতা এবং তার ‘সীমাহীন অযোগ্যতা’ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কোনো ঘাটতি ছিল না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 
ক্যাম্পাসে ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দ্রুত ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের ওপর জোর দেন সাদিক কায়েম। তিনি প্রশাসনকে দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আহ্বান জানান। একই সাথে ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ব, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরে না আসার বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। 
দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসনের অসহযোগিতা ও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগও করেন ডাকসু ভিপি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর বন্ধ করতে তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে ভয় বা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা উচিত নয়। শাহবাগ থানায় ডাকসু প্রতিনিধির ওপর হামলা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, এফএইচ হলের এক শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের অভিযোগ এবং ডাকসু ভবনে সাম্প্রতিক ‘মব’ তৈরির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি। 
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে সাদিক কায়েম বলেন, শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতেই ক্যাম্পাসের নেতৃত্ব থাকা উচিত। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতির কথাও জানান তিনি। 
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হল দখল, সঙ্ঘাত ও আধিপত্য বিস্তারের যে ধারাবাহিকতা ছিল, এবারের ডাকসু নির্বাচনের পর তা ভেঙেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও কোনো ছাত্র সংগঠন হল দখলের চিন্তা বা সাহস করেনি- এটিকে শিক্ষার্থীদের ভোটের বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। 
দায়িত্ব পালনের সময় ডাকসুর একাধিক প্রতিনিধি হামলা ও বিভিন্ন বাধার শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে ফরহাদ বলেন, এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও হল বা শিক্ষার্থীদের আবাসন দখল হতে দেয়া হয়নি। পরবর্তী ডাকসুর নেতৃত্ব যেন বর্তমান কমিটির অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করতে পারে- এমন প্রত্যাশাও জানান তিনি। 
ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দিন খান বলেন, বর্তমানে হলগুলোতে আবারো আবাসন সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। শিক্ষাজীবন শেষ করা শিক্ষার্থীদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে হল ছাড়ার কথা থাকলেও অনেকে তা না করায় নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। 
তার দাবি, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য কমসংখ্যক আসন দেয়া সম্ভব হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে কৃত্রিম আবাসন সঙ্কট তৈরি হয়ে গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। কোনোভাবেই অছাত্রদের হলে অবস্থানের সুযোগ না দেয়ার জন্য হল প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। 
পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মহিউদ্দিন খান বলেন, ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে অন্তত একটি ন্যূনতম রূপরেখা দেয়া প্রয়োজন ছিল। সর্বশেষ কার্যনির্বাহী সভাতেও বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও ডাকসুর সভাপতি ও উপাচার্যের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। 
এ ছাড়া ডাকসু পরিচালনার জন্য বাজেট নেই বলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিভিন্ন নিয়ম ও অধ্যাদেশের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সংবিধিবদ্ধ ছাত্র সংসদের নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে কেন সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেই- সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। 
সমাপনী অনুষ্ঠানে ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এইচ এম মোশারফ হোসেন বর্তমান কমিটির কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। তার মতে, ডাকসু নির্বাচনের পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা, শান্তি ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। অতীতের বিভিন্ন ডাকসুর সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, আগের সময়ে ছাত্র নেতৃত্বের সাথে মাস্তানি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের সংস্কৃতি জড়িয়ে থাকলেও বর্তমান ডাকসুর ক্ষেত্রে তিনি তার ব্যতিক্রম দেখেছেন। 
সম্প্রতি ডাকসু ও হল সংসদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত বা আইনি জটিলতার প্রসঙ্গেও দুঃখ প্রকাশ করেন কোষাধ্যক্ষ। তার দাবি, এসব কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি না হয়ে বরং তাদের কল্যাণ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের স্বার্থে দ্রুত ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের দাবিও জানান তিনি। 
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ ২৩টি পদে জয় পায়। ১৪ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন নির্বাচিত নেতারা। ডাকসুর গঠনতন্ত্রের ৬(গ) ধারা অনুযায়ী, নির্বাচিত পদাধিকারীরা ৩৬৫ দিনের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন। সময়মতো নির্বাচন না হলে তারা অনধিক ৯০ দিন অথবা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত- যেটি আগে হয়- দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এরপর সংসদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হওয়ার বিধান রয়েছে।