
আলমগীর কবির, টরেন্টো, কানাডা থেকে
টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ব্যস্ত সময়। ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা। প্রিন্সেস অব ওয়েলস থিয়েটারের ভিসা স্ক্রিনিং রুমে আলো নিভে পর্দায় ভেসে উঠল দক্ষিণ কোরিয়ার প্রখ্যাত নির্মাতা লি চ্যাং-দংয়ের নতুন চলচ্চিত্র ‘পসিবল লাভ’। আট বছর পর তার নতুন ছবি। এরই মধ্যে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জিতেছে ছবিটি। অস্কারের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিনিধিত্বের জন্যও নির্বাচিত হয়েছে। ফলে টরন্টোতে উত্তর আমেরিকার প্রথম প্রদর্শনী ঘিরে দর্শক ও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের আগ্রহ ছিল স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
কিন্তু প্রায় পৌনে ৩ ঘণ্টার ছবিটি এগোতে থাকলে বোঝা যায়, পুরস্কার কিংবা অস্কারের দৌড়ের চেয়েও বড় কিছু নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘পসিবল লাভ’। শ্রমিকের চাকরি হারানো, দীর্ঘ ধর্মঘটের ক্ষত, অর্থনৈতিক শ্রেণিবিভাজন, দাম্পত্যের ভাঙন, আকাক্সক্ষা এবং অন্যের জীবনকে ক্যামেরায় ধারণ করার নৈতিকতা; সব কিছুকে একই গল্পের ভেতরে এনে লি চ্যাং-দং এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন, যা দক্ষিণ কোরিয়ার গণ্ডিতে আটকে থাকে না।
ঢাকা থেকে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কাভার করতে এসে ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ছবিটি দেখার সময় সেই সর্বজনীনতাটিই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে। টরন্টোর বহুজাতিক দর্শকের সামনে পর্দায় যখন দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমিক পরিবারের সঙ্কট ফুটে উঠছিল, তখন সেটিকে দূরের কোনো দেশের গল্প বলে মনে হয়নি। শ্রমের অনিশ্চয়তা, চাকরি হারানোর অপমান, অর্থনৈতিক বৈষম্য কিংবা সচ্ছল মানুষের চোখে অসচ্ছল মানুষের জীবনকে দেখার ধরন এসব অভিজ্ঞতা পৃথিবীর বহু সমাজেই পরিচিত।
‘পসিবল লাভ’-এর গল্পের কেন্দ্রে দু’টি দম্পতি। এক দিকে মি-অক ও হো-সক। তারা শ্রমজীবী পরিবারের মানুষ। একটি কারখানার দীর্ঘ ধর্মঘট তাদের সংসারে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। হো-সক চাকরি হারিয়েছেন। আন্দোলনের পরিণতি, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও আত্মসম্মানে আঘাত তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছে। তিনি চুপচাপ থাকেন, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরে জমে থাকে রাগ, হতাশা, লজ্জা ও অসহায়ত্ব। স্ত্রী মি-অক তুলনামূলকভাবে প্রাণবন্ত। প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সংসার ও জীবনকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন।
অন্য দিকে ইয়েজি ও সাং-উ। তাদের জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল এই দম্পতির সমুদ্রের কাছে বিলাসবহুল বাড়ি, আরাম ও নিরাপত্তা রয়েছে। তাদের সাথে মি-অক ও হো-সকের প্রথম দিকের যোগাযোগই ছবির ভেতরে একটি অদৃশ্য শ্রেণিপ্রাচীর তৈরি করে।
এই দুই দম্পতির জীবনের সংযোগ ঘটে ইয়েজির কারণে। তিনি তথ্যচিত্র নির্মাতা। শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করতে গিয়ে মি-অককে সম্ভাবনাময় চরিত্র হিসেবে বেছে নেন। পরে তার আগ্রহ গিয়ে পড়ে হো-সকের ওপর। কারণ হো-সকের গল্পে রয়েছে শুধু শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস নয়, আন্দোলনের পর একজন মানুষের ব্যক্তিজীবনের বিপর্যয়ের গল্পও। কিন্তু হো-সক ক্যামেরার সামনে আসতে চান না।
এই অনীহা থেকেই ছবির একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে একজন মানুষের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা কতটা অন্য মানুষের গল্প হতে পারে? কেউ যখন ক্যামেরা নিয়ে অন্যের জীবনের কাছে যান, তখন তিনি কি শুধু বাস্তবতা ধারণ করেন, নাকি সেই বাস্তবতার ওপর নিজের দৃষ্টিও চাপিয়ে দেন?
লি চ্যাং-দং এই প্রশ্নের উত্তর দর্শকের হয়ে দেননি; বরং তিনি দুই দম্পতিকে কাছাকাছি এনে দেখিয়েছেন তাদের জীবনযাপনের ব্যবধান।
মি-অক ও হো-সক যখন ইয়েজি ও সাং-উয়ের বাড়িতে যান, তখন ছবির শ্রেণিবৈষম্য আরো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এক দিকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, অন্য দিকে স্বাচ্ছন্দ্য জীবন। এক দিকে ধর্মঘট ও চাকরি হারানোর ক্ষত, অন্য দিকে সমুদ্রের ধারে অবকাশ। কিন্তু পরিচালক এখানেও সহজ কোনো নৈতিক সিদ্ধান্ত দেননি। ধনী মানেই নিষ্ঠুর আর দরিদ্র মানেই নৈতিক এমন সরল বিভাজন তার ছবিতে নেই; বরং তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের সম্পর্কের ভেতরেও শ্রেণী কাজ করে।
এই শ্রেণিগত দূরত্বের মধ্যেই মি-অক ও সাং-উয়ের মধ্যে তৈরি হয় একধরনের আকর্ষণ। সেটিকে সরাসরি প্রেমের গল্প বলা কঠিন। এর সাথে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তার আকাক্সক্ষা, দাম্পত্যের ক্লান্তি, মানসিক শূন্যতা এবং অন্যের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার বাসনা। ফলে ছবির ‘ভালোবাসা’ শুধু একজন নারী ও একজন পুরুষের সম্পর্কের প্রশ্ন নয়; ভালোবাসা এখানে সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত মর্যাদার সাথেও যুক্ত।
ছবির নামটিও যেন সেই প্রশ্নই করে ভালোবাসা কি সম্ভব?
এই প্রশ্নের আরেকটি স্তর তৈরি হয় ইয়েজির চরিত্রে। তিনি শ্রমিক পরিবারের খুব কাছে যেতে চান। তাদের দুঃখ, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা বুঝতে চান। একপর্যায়ে তার বক্তব্য তিনি এসব মানুষের ভালোবাসতে চান। কিন্তু একজন নির্মাতা হিসেবে যার কাছে অন্য মানুষের জীবন একটি চলচ্চিত্রের বিষয়, তার এই ভালোবাসা কতটা নিঃস্বার্থ? মানুষের গল্পকে ভালোবাসা আর মানুষটিকে ভালোবাসা কি একই ব্যাপার?
‘পসিবল লাভ’ এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটিই বারবার সামনে আনে।
ছবির নির্মাণশৈলীর সাথে এই প্রশ্নের সম্পর্ক আরো গভীর। কারণ ছবির ভেতরেই রয়েছে আরেকটি ক্যামেরা ইয়েজির তথ্যচিত্রের ক্যামেরা। দর্শক এক দিকে নাটকীয় চলচ্চিত্রের ক্যামেরায় চরিত্রদের দেখছেন, আবার অন্য দিকে সেই চরিত্রদের জীবন ধারণ করা ক্যামেরার দৃষ্টিও দেখছেন। ফলে কে কাকে দেখছে, কে কাকে ধারণ করছে এবং কে কার গল্প বলছে এই দৃষ্টির খেলাটি ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
ইয়েজির ক্যামেরা যত মানুষের কাছে যায়, ততই স্পষ্ট হয় যে ক্যামেরা কখনো পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। মানুষ জানে, তাকে দেখা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টাও কখনো অভিনয়ে পরিণত হয়। আবার অভিনয় না করার চেষ্টাটিও একধরনের আচরণ তৈরি করে। এই দ্বন্দ্ব থেকেই ছবিতে কিছু দৃশ্যে সূক্ষ্ম হাস্যরস তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই হাসির নিচে রয়েছে অস্বস্তি।
অভিনয় নিয়ে লি চ্যাং-দংয়ের নির্দেশনাও এই ভাবনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইয়েজি চরিত্রে অভিনয় করা চো ইয়ো-জং টরন্টোতে ছবিটির উত্তর আমেরিকান প্রদর্শনী উপলক্ষে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পরিচালক তাদের বলেছিলেন অভিনয় না করে শুধু কথা বলতে। কথা বলার সময় কিছু প্রকাশ করার চেষ্টা না করতে। কোনো দৃশ্যে আবেগ অনুভব করতে হলে সেই আবেগ প্রকাশ না করে শুধু অনুভব করতে।
একজন অভিনেতার জন্য নির্দেশনাটি শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে তা ততটাই কঠিন। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে অভিনেতার স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে নিজের অনুভূতি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়ার। কিন্তু লি চ্যাং-দং সেই তাড়নাটিই কমিয়ে দিতে চেয়েছেন। ফলে তার ছবিতে আবেগের প্রকাশ অনেক সময় সংলাপের চেয়ে নীরবতায়, চোখের চেয়ে বিরতিতে, কিংবা কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানোর মধ্যেই ধরা পড়ে।
এই অভিনয়শৈলী ‘পসিবল লাভ’-এর বিষয়বস্তুর সাথেও অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। ছবির ভেতরের তথ্যচিত্রে যেমন চরিত্রদের বলা হয় স্বাভাবিক থাকতে, তেমনি মূল চলচ্চিত্রেও অভিনেতাদের স্বাভাবিকতার কাছাকাছি থাকতে বলা হয়েছে। ফলে বাস্তবতা ও অভিনয়ের সীমারেখা বারবার অস্পষ্ট হয়ে যায়।
এখানে লি চ্যাং-দংয়ের নির্মাণকৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। তিনি দর্শককে কোনো আবেগ নির্দিষ্ট করে দেন না; বরং দৃশ্যের মধ্যে এমন একটি পরিসর তৈরি করেন, যেখানে দর্শক নিজেই চরিত্রের অনুভূতি বুঝে নেয়ার সুযোগ পান।
ছবির পেছনে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমিক আন্দোলনের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা। একটি বড় প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ছাঁটাই এবং শ্রমিকদের ধর্মঘট দমনের ঘটনা থেকেই বহু বছর আগে এই গল্পের বীজ তৈরি হয়েছিল। সেই সময় বাস্তব ঘটনাটিকে সরাসরি কাহিনীচিত্রে রূপ দেয়া সম্ভব বলে মনে করেননি নির্মাতা। পরে সময়ের পরিবর্তনের সাথে তিনি সেই অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ পান।
ফলে ‘পসিবল লাভ’-এ শ্রমিক আন্দোলন শুধু পটভূমি নয়। সেটি চরিত্রগুলোর ব্যক্তিজীবনের অংশ। চাকরি হারানোর ঘটনা হো-সকের আত্মসম্মানকে আঘাত করে; সেই আঘাত তার দাম্পত্যে ছড়িয়ে পড়ে; দাম্পত্যের দূরত্ব আবার অন্য সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি করে; অর্থাৎ অর্থনীতির বড় সঙ্কট শেষ পর্যন্ত এসে আঘাত করে মানুষের সবচেয়ে ব্যক্তিগত জায়গায়।
এ কারণেই ছবিটি কেবল দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমিকদের গল্প হয়ে থাকে না। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য যখন ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা যখন প্রশ্নের মুখে, তখন ‘পসিবল লাভ’-এর চরিত্রগুলোর সঙ্কটও অনেক পরিচিত মনে হয়।
তবে ছবির গতি নিয়ে আপত্তির জায়গা আছে। প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্য এবং ধীরগতির বর্ণনা সব দর্শকের কাছে সমান স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে। কোথাও কোথাও মনে হতে পারে, গল্পটি আরো দ্রুত এগোতে পারত। কিন্তু লি চ্যাং-দং তাড়াহুড়ো করেননি। চরিত্রের নীরবতা, অস্বস্তিকর মুহূর্ত, ছোট ছোট আচরণ এবং সম্পর্কের সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তিনি গল্পের অর্থ তৈরি করেছেন।
এই ধীর গতির বিনিময়ে দর্শক যা পান, তা হলো চরিত্রগুলোর ভেতরে প্রবেশের সুযোগ। আর ছবিটি শেষ হওয়ার পর থেকে যায় কয়েকটি প্রশ্ন।
অন্যের জীবনের দুঃখ আমরা কতটা বুঝতে পারি? সহানুভূতিরও কি শ্রেণিগত সীমা আছে? একজন তথ্যচিত্র নির্মাতা যখন কোনো মানুষের জীবন ধারণ করেন, তখন সেই গল্পের মালিক কে? অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কি ভালোবাসার সংজ্ঞা বদলে দেয়? আর দাম্পত্য, আকাক্সক্ষা ও শ্রেণিগত দূরত্বের মাঝেও কি নতুন করে ভালোবাসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে?
১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় টরন্টোর প্রিন্সেস অব ওয়েলস থিয়েটারে ছবিটি দেখার পর সবচেয়ে বেশি মনে হয়েছে ‘পসিবল লাভ’ কোনো প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দিতে চায় না; বরং প্রশ্নগুলোকে আরো গভীর করে।
ভেনিসে পুরস্কার জয় ও অস্কারের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিনিধিত্বের মধ্য দিয়ে ছবিটি এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। টরন্টোর উত্তর আমেরিকান প্রদর্শনী সেই যাত্রায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা। কিন্তু পুরস্কার কিংবা অস্কারের সম্ভাবনার বাইরে ছবিটির শক্তি শেষ পর্যন্ত তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে।
এটি শ্রেণীর দূরত্বের গল্প, শ্রমিকের ক্ষতের গল্প, দাম্পত্যের ভাঙনের গল্প। একই সাথে এটি ক্যামেরার সামনে ও পেছনে থাকা মানুষের দূরত্বের গল্প।
সবশেষে তাই প্রশ্নটি খুব সরল, ভালোবাসা কি সত্যিই সম্ভব?







