ইসরাইল
ইরানের সাথে চুক্তির ইঙ্গিত ট্রাম্প-ভ্যান্সের, হামলার পক্ষে ইসরাইল। সংগৃহীত

ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার ইঙ্গিত দিয়েছে, তেহরান কঠোর শর্তসাপেক্ষে হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়ার প্রস্তাব করার পর ইরানের সাথে একটি আলোচনার মাধ্যমে চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। তবে অন্যদিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফের বিমান হামলা শুরুর জন্য লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

Advertisement

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের  ঠিক এক দিন আগে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পোস্ট করা এক মন্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, 'তেল প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০ ডলার কমে ধসে পড়েছে, যা একটি রেকর্ড। কারণ মানুষ মনে করছে ইরানের সাথে আর কোনো যুদ্ধ হবে না। ইরান যত দ্রুত সম্ভব একটি সমঝোতা চায়। এটি হতেও পারে!'  চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরানকে লক্ষ্য করে যৌথ মার্কিন-ইসরাইলি হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া সংঘাতের পর থেকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবারের নির্বাচনে একটি প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে ভোটগ্রহণ শেষ হলে তিনি ইরানের ওপর আবার হামলা শুরু করতে পারেন। কিন্তু সোমবার ওয়াশিংটনের রিফ্লেক্টিং পুল-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এর ভিন্ন চিন্তার ইঙ্গিত দেন। মূলত বড় ধরনের হামলার হুমকি দেওয়া এবং চুক্তির জন্য চাপ দেয়ার যে পর্যায়ক্রমিক ধারা তিনি বজায় রেখেছিলেন, সেটিই পুনরায় অব্যাহত রেখেছেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার কথা ভাবছেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন 'না', যদিও তিনি অতীতেও হামলার নির্দেশ দেওয়ার আগে এমন সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন।

এদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন যে 'ইরানিদের সাথে বেশ কয়েকটি ভালো আলোচনা হয়েছে।'

সাংবাদিকদের ভ্যান্স বলেন, 'প্রেসিডেন্ট এবং আমি—উভয়েই একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়ে বেশ আশাবাদী।' এক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্পের সাথে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, "আমরা নিশ্চিতভাবেই কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করেছি। দেখা যাক আমরা আরও অগ্রগতি করতে পারি কি না।"

'আমরা এটি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাব... তবে ইরানিরা সবসময়ই কিছুটা অপ্রস্তুত ও অনিশ্চিত আচরণ করে,' বলেন তিনি।

ভ্যান্স আরো বলেন, ট্রাম্পের সামনে 'সামরিক ও অসামরিক দুটি বিকল্পই উন্মুক্ত রয়েছে, তবে আমরা নিশ্চিতভাবেই কিছু অগ্রগতি করেছি। দেখি আরও এগোনো যায় কি না।'

হামলার হুমকি বাস্তবায়নের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা (ডিমার্কেশন বা ডেডলাইন) দিয়েছে কি না জিজ্ঞেস করা হলে ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো বাধ্যবাধকতা বেঁধে দেয়নি।

ভাইস প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দিয়েছে—যদিও ট্রাম্প এখনো অন্যান্য পারমাণবিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে বোমা হামলার সম্ভাব্য প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন এবং ইরান এখনও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ধরে রেখেছে।

'যেহেতু আমরা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করেছি, তাই আমরা নিশ্চিত করতে চাই যেন তারা এটি পুনর্বাসন করতে বা আবার গড়ে তোলার চেষ্টা করতে না পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,' বলেন ভ্যান্স। অতীতে তিনি বলেছিলেন যে ওয়াশিংটনের প্রধান অগ্রাধিকার হলো হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল স্বাভাবিক করা, যা বন্ধ থাকার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে।

'তারা তাদের সার্বভৌমত্বকে অনেক মূল্য দেয়। তারা অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোকে অগ্রাধিকার দেয়। আমরা মনে করি যে সেখানে একটি পথ রয়েছে, তবে এর জন্য তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্নির্মাণ না করার বিষয়ে একটি দৃঢ় ও যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন,' বলেন ভ্যান্স।

সোমবার তার বক্তব্যে ট্রাম্পও জোর দিয়ে বলেন, তার মূল দাবি হলো ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না।

'আমরা ইরানকে কখনই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে দেব না, এবং তারা তা বোঝে। তারা এটি অনুধাবন করেছে এবং সম্প্রতি তারা এটি স্বীকারও করেছে,' বলেন ট্রাম্প।

তিনি আরো বলেন, 'আমরা যদি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে দিই, তবে এই বিশ্ব আর আগের মতো চলবে না। পুরো পৃথিবীটাই এক ভিন্ন জায়গায় পরিণত হবে।'

তিনি দাবি করেন, এ অপারেশনটি বাস্তবে কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ছিল না, কারণ ফেব্রুয়ারির শেষভাগে মার্কিন ও ইসরাইলি বড় আকারের হামলার পর সম্প্রতি 'আমরা খুব অল্পসংখ্যক সংঘাত করেছি।'

ট্রাম্প আরো দাবি করেন, 'আমরা তাদের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের—প্রথম স্তরের নেতা, দ্বিতীয় স্তরের নেতা—সবাইকে নির্মূল করেছি। এবং তারা আমাদের অনুরোধ করেছে, 'দয়া করে এটি বন্ধ করুন', এবং আমরাও থামব।'

'অত্যন্ত নিবিড়' আলোচনা

ভ্যান্সের বক্তব্যের সাথে সুর মিলিয়ে দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে কথা বলা দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এগিয়েছে। কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা গত সপ্তাহে ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে দুই দফা আলোচনা করেছেন।

আমেরিকান এবং এক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ইসরাইলি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া গোপন ব্রিফিংয়ের ওপর ভিত্তি করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই দুই কর্মকর্তা এ তথ্য জানান।

আলোচনার সাথে পরিচিত এক কূটনীতিক দ্য টাইমস অব ইসরাইলকে জানিয়েছেন, একটি সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা আবার শুরু করতে কাতারীয় মধ্যস্থতাকারীদের একটি প্রতিনিধিদল সন্ধ্যায় তেহরানে পৌঁছেছে। আলোচনাধীন চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরান দ্রুত হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেবে এবং এর পর তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সামগ্রিক আলোচনা শুরু হবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সাথে 'নিবিড়' আলোচনা চলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ-য় প্রকাশিত মন্তব্যে আরাঘচি বলেন, 'মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে চলছে। আমরা আমাদের শর্ত ও প্রস্তাব উপস্থাপন করেছি, এখন সবকিছু ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ওপর নির্ভর করছে।'

ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে উদ্ধৃত করে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে যে, সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যস্থতাকারীদের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারকে 'নির্দিষ্ট কিছু এখতিয়ার ও ক্ষমতা' দিয়েছেন।

আইআরএনএ নিউজ এজেন্সির মতে, পেজেশকিয়ান বলেছেন ইরান 'আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চায়।'

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র শর্তে রাজি হলে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য তারা একটি দুই দিনের পরিকল্পনার কথা বিবেচনা করছে, যেখানে আগে তারা এক সপ্তাহের সময়সীমার কথা বলেছিল।

'দুই দিনের মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনাটি ইরানের সদিচ্ছার আরেকটি নির্দেশক। আমরা স্পষ্ট জানিয়েছি যে, ইরানের দাবি পূরণ হলে অল্প সময়ের মধ্যেই হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা এবং আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব," জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তিনি আরও যোগ করেন যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে "বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।'

বাঘাই জানান, সংঘাত নিরসনে সেপ্টেম্বরে ইরান যে প্রস্তাব জমা দিয়েছিল সেটিই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু রয়েছে। তবে শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বরাতে প্রকাশিত প্রস্তাবের সময়সীমা সংক্ষেপ করার তথ্যটি তিনি নিশ্চিত করেন।

'মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার মূল ভিত্তি এখনও ইরানের সেই সাত-দফা প্রস্তাব, যা এখন সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে, যাতে এটি দুই দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়,' বলেন তিনি।

তবে সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প ইরানের সেই সাত-দফা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। প্রস্তাবটিতে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানি বন্দরের ওপর থেকে অবরোধ তুলতে হবে, ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেল বিক্রির ওপর ছাড় দেবে, নতুন নিষেধাজ্ঞা বাতিল করবে এবং তারপর অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হবে।

বাঘাই আবারো বলেন, পরিকল্পনা সংক্ষিপ্ত করার অর্থ এই নয় যে ইরানের মূল অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে; পারমাণবিক আলোচনা কেবল তখনই শুরু হতে পারে যখন ইরান যাচাই করে নিশ্চিত হবে যে তার সব শর্ত পূরণ হয়েছে।

ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ অন্য দেশে স্থানান্তরের বিষয় আলোচনায় এসেছে কি না বা ইরান তাতে রাজি হবে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি 'না' সূচক উত্তর দেন।

আবার বিমান হামলার জন্য চাপ দিচ্ছেন নেতানিয়াহু

কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাঝেই দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তৃতীয় এক ব্যক্তি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন যে, মঙ্গলবার মার্কিন নির্বাচনের পর ইরানের ওপর নতুন করে বিমান হামলার তরঙ্গ চালানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন নেতানিয়াহু।

এ বিষয়ে অবহিত এক ব্যক্তির মতে, উইকএন্ডে ট্রাম্পের সাথে এক ফোনালাপে নেতানিয়াহু সামরিক পদক্ষেপের জন্য চাপ দেন, তবে ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।

অন্য এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য মিত্ররা নতুন করে হামলার বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেছে, এতে ওই অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে এবং ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হাউছি (হুথি) বিদ্রোহীরা সৌদি আরব ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হামলা বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে ইরাকের ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারাও জড়িয়ে পড়তে পারে।

সেই কর্মকর্তা এবং নেতানিয়াহু-ট্রাম্পের ফোনালাপের বিষয়ে অবগত ব্যক্তি—উভয়েই বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার এখতিয়ার না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানান।

ইরানের সাথে সংঘাতের পুনরুজ্জীবন নেতানিয়াহুকে একটি জরুরি সরকার গঠন করতে সাহায্য করতে পারে, কারণ গত সপ্তাহের নির্বাচনে তিনি এবং তার মিত্ররা নেসেটে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন। নির্বাচনের আগেও নেতানিয়াহু পুনরায় হামলার জন্য চাপ দিয়েছিলেন, কারণ তিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় গভীরভাবে আঘাতপ্রাপ্ত জনগণের কাছে নিজের 'নিরাপত্তা বিষয়ক দক্ষতা' তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

ইসরাইলি সরকার তাৎক্ষণিকভাবে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। উইকএন্ডের ফোনালাপে নতুন হামলার আশঙ্কা নিয়ে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের আলোচনার বিষয়ে হোয়াইট হাউস সরাসরি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি, আর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও এটি নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।