পবিত্র মক্কা শরিফ,সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা,প্রতিরক্ষা খাত, ব্যয়, রিয়াদ, ঠেকান, হাউছি হামলা, 
পবিত্র মক্কা শরিফের কাছে বসানো সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সিএনএন

সামরিক খাতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করছে সৌদ আরব। এ সত্ত্বেও ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার এবং পাইপলাইনের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনা রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে পাওয়া অত্যাধুনিক অস্ত্র আর বহুপক্ষীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে দেশটির। এত সমর আয়োজনের পরও গত সপ্তাহে দেশটির রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে।

Advertisement

মার্কিন নিউজ চ্যানেল সিএনএন বুধবার (১৪ সেপ্টেম্বর) জানায়, স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী গত বছর সামরিক খাতে ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে সৌদি আরব।  বিপুল এই ব্যয় বিশ্বের শীর্ষ প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশগুলোর তালিকায় ধরে রেখেছে দেশটিকে। দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিওট ও থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য থেকে উন্নত সমরাস্ত্র সংগ্রহ করেছে। তবে সৌদি আরবের ভৌগোলিক ব্যাপ্তি বিশাল, দেশটি আমেরিকার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগের সমান। অন্যদিকে দেশটির তিন দিকে সীমান্ত ঘিরে ঝুঁকিও রয়েছে।

 চলতি বছরের সংঘাতের তীব্রতম সময় পূর্বে ইরান থেকে সৌদি স্থাপনা লক্ষ্য করে প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয়। উত্তরে ইরাকের ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশটির মূল পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে ড্রোন দিয়ে হামলা প্ররোচিত করেছে। আর দক্ষিণে ইয়েমেনের পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে এবং সেখান থেকে ভ্রাম্যমাণ লঞ্চারের মাধ্যমে হাউছি বিদ্রোহীরা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে।

রিয়াদ বা কেবল একটি তেল শোধনাগার নয়, পুরো সৌদি আরবকে রক্ষা করার অর্থ হলো এক বিশাল লক্ষ্যবস্তু নেটওয়ার্ককে সুরক্ষিত রাখা। অর্থনীতি সংক্রান্ত স্বাধীন পর্যালোচনাকারী প্ল্যাটফর্ম 'ভিশন২০৩০.আই' জানাচ্ছে, মধ্য আকাশে সম্ভাব্য হুমকি সনাক্ত করা, কোনটি ধ্বংস করা হবে তা নির্ধারণ করা এবং বেসামরিক নাগরিকদের সতর্ক বার্তা পাঠানো—সবই অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে সারতে হয় সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে।

সৌদি সামরিক বাহিনী হাউছিদের অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম। তারপরও কিছু কিছু প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। এক সৌদি সূত্র জানিয়েছে, বহু স্পর্শকাতর স্থাপনা উন্মুক্ত অবস্থায় থাকায় বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে বসানো হবে, তা নিয়ে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে।

হাউছিদের সমরকৌশল ও শক্তিবৃদ্ধি

সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পরাস্ত করতে ব্যালাস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে দীর্ঘপাল্লার ড্রোনের সমন্বয় ঘটাচ্ছে হাউছিরা। এই পদ্ধতি অনেকটা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার কৌশলের মতো, যেখানে তারা ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোনের সাথে  ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করে। নিচু দিয়ে উড়ে আসায় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সনাক্ত করা তুলনামূলক কঠিন। পাশাপাশি তারা নতুন প্রজন্মের মোড় ফেরাতে সক্ষম ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করছে।

হাউছি সমরাস্ত্র

বিশ্বের কোনো একক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষেই সব ধরণের হামলা শতভাগ আটকে দেয়ার নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে হাউছিরা একা কাজ করছে না। আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও আট বছর আগেই জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা ইয়েমেনে ইরানি প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ ও সামরিক ড্রোনের উপস্থিতি চিহ্নিত করেছিলেন। দুই বছর আগে একই প্যানেল জানায়, বাহির থেকে সরবরাহ করা সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ব্যাপকতা আগে কখনো দেখা যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাউছিদের হাতে থাকা নতুন 'হাতেন-২' ও 'ফিলিস্তিন-২' ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা ইরানি অস্ত্রের সাথে গভীরভাবে মিলে যায়। এগুলো বেশ দ্রুত ও নির্ভুল। ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আল-নাজিলি জানান, বিমান ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের জন্য তারা ইরানি প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটিয়েছে। গত বছর একটি হাউছি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা এড়িয়ে বিন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হানে।

রিয়াদের কঠিন হিসাব-নিকাশ

অন্যান্য সহযোগী গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়ে পড়লেও হাউছিদের শক্তি দিন দিন আরো বেড়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মূল লক্ষ্য দেশকে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পর্যটনের বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করা। কিন্তু বিমানবন্দর ও তেল শোধনাগারে হামলার ফলে সেই লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

হাউছিদের ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চলে গিয়ে স্থল অভিযানে পরাস্ত করা কঠিন। তাদের বাহিনী প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সেনা নিয়ে গঠিত বলে ধারণা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র গত বছর কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়েছে। তারপরও হাউছি প্রতিরোধ চূর্ণ করতে পারেনি।

এমতাবস্থায় সৌদি আরব পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের মতো আঞ্চলিক ও মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতা নিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সংকট থাকায় মার্কিন প্রশাসন  মধ্যপ্রাচ্য কোনো নতুন যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‌্যাটনির মতে, সৌদি আরব আক্রমণের মুখে পড়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে তাদের জবাব দিতে হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত সবাইকে আবার সেই কূটনীতির পথেই ফিরতে হবে—যা হয়তো শতভাগ সমাধান দেবে না, তবে সংঘাতের মাত্রা কিছুটা হলেও প্রশমিত করবে।