
বিশ্বসাহিত্যের বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক আনাতোল ফ্রঁসের সেই কালজয়ী হাসির নাটিকাটির কথা মনে আছে? নাটকের নাম ছিল ‘দ্য ম্যান হু ম্যারাইড এ ডাম্ব ওয়াইফ’, অর্থাৎ ‘যে ব্যক্তি এক বোবা নারীকে বিয়ে করেছিল’।
নাটকের প্রধান চরিত্র মাস্টার লিওনার্ড বোতাল—প্যারিসের এক বিচারক। নিরিবিলি জীবনই তাঁর পছন্দ। তিনি এক বাকপ্রতিবন্ধী নারী ক্যাথরিনকে বিয়ে করে বেশ শান্তিতেই দিন কাটাচ্ছিলেন। ঘরে কোনো শোরগোল নেই, নেই ঝগড়া-ঝাটি। বই পড়া ও লেখালেখির জন্য যেন আদর্শ পরিবেশ।
কিন্তু একসময় স্ত্রীর প্রতি মায়া থেকে তিনি তাঁর চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। শহরের নামজাদা চিকিৎসক ও শল্যচিকিৎসকদের ডাকা হলো। চিকিৎসা সফল হলো। ক্যাথরিনের মুখে ফুটল জীবনের প্রথম কথা।
কিন্তু আসল সমস্যা শুরু হলো তখনই। কথা বলতে পারার আনন্দে ক্যাথরিন যেন বাঁধভাঙা নদীর মতো টানা কথা বলতে শুরু করলেন। সংসারের খুঁটিনাটি থেকে শুরু করে সারাদিনের নানা বিষয়—কথার যেন শেষ নেই। বোতালের পড়ার ঘরের শান্তি গেল চুরমার হয়ে। লেখালেখিতে মন দেয়া তো দূরের কথা, ঘরে টেকাই দায় হয়ে পড়ল।
স্ত্রীর এই ‘কথা-সুনামি’ থামানোর কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বোতাল আবার চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হলেন। তাঁর অনুরোধ ছিল, ক্যাথরিনকে যেন আবার বোবা করে দেয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানালেন, তাঁকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত এমন এক সমাধান বের হলো, যা সমস্যার চেয়েও হাস্যকর—স্ত্রীর কথা বন্ধ করা গেল না, তাই বোতালকেই বধির করে দেয়া হলো।
আর এভাবেই নিজের ঘরের নীরবতা ফিরে পেলেন মাস্টার বোতাল।
আজকের যুগে দাঁড়ালে মনে হয়, সেই পণ্ডিত যদি আর কিছুটা দিন সবুর করতেন! তাঁকে আর অত কাঠখড় পোড়াতে হতো না। ছড়ার ভাষায়, 'রসুন বুনতেও হতো না!' তাঁকে বধির হওয়ার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে হতো না। কারণ, আধুনিক সমাজ নিজেই যেন এক নীরবতার ওষুধ গিলে ফেলেছে। মানুষ নিজেই এখন ধীরে ধীরে কথা বলা কমিয়ে দিচ্ছে।
তথ্য এখন আর কোনো কাল্পনিক ধারণা নয়, একদম সত্যি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর তথ্য। গবেষকরা ২০০৫ থেকে ২০১৯ সালের বিশাল উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, মানুষ প্রতি বছর গড়ে তার দৈনিক কথামালা থেকে ৩৩৮টি শব্দ হারিয়ে ফেলছে।
চিন্তা করে দেখুন, ২০০৫ সালে একজন মানুষ দিনে গড়ে প্রায় ১৬ হাজার শব্দ বলত। ২০১৯ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ১২ হাজার ৭০০-তে। প্রতি বছর যদি ৩৩৮টি শব্দ কমতে থাকে, তবে দিনে দিনে আমরা কতটা নীরব এক সমাজের দিকে হেঁটে যাচ্ছি?
কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?
গবেষকদের মতে, মানুষ কোনো একটা বড় গল্প করা হুট করে বন্ধ করেনি। বরং আমাদের সারাদিনের ছোট ছোট সামাজিক সম্পর্কের মুহূর্তগুলো থেকে কথা হারিয়ে গেছে। সুপারমার্কেটে গিয়ে ক্যাশিয়ারকে আর 'কেমন আছেন' বলতে হয় না, সেলফ-চেকআউট কাউন্টারে স্ক্যান করে বেরিয়ে আসা যায়। অচেনা শহরে পথ হারানোর ভয় নেই। জিপিএস স্ক্রিন দেখে হেঁটে যাওয়া যায়। রেস্তোরাঁয় এখন ওয়েটারকে ডাকার দরকার পড়ে না। ডিজিটাল কিয়স্কে এক টাচেই খাবার চলে আসে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অনানুষ্ঠানিক কথাগুলো প্রযুক্তি আর স্বয়ংক্রিয়তা একাই গিলে ফেলেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া বা টেক্সট মেসেজে হয়তো আমরা প্রচুর লিখছি। কিন্তু মুখের শব্দ কমে গেছে। টাইপ করা হাজারটা শব্দের মধ্যেও মানুষের মুখের সুর, ক্ষণিক হাসি, আর জীবন্ত উপস্থিতি থাকে না। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ ম্যাথিয়াস মেহল মনে করেন, এই ছোট ছোট কুশল বিনিময়ের বিলুপ্তিই আমাদের সমাজে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও গভীর একাকীত্ব তৈরি করছে।
সেই নাটকের পণ্ডিতের কাছে আবার ফিরে যাওয়া যাক।
আজকের দিনে বেঁচে থাকলে হয়তো তাঁকে বধির হওয়ার চরম সিদ্ধান্ত নিতে হতো না। বরং বাকচতুরা স্ত্রীকে স্মার্টফোনে আসক্ত করে তুলতে পারলে বা একটা ডিজিটাল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত করলেই কেল্লা ফতেহ! তিনি পেয়ে যেতেন কাঙ্ক্ষিত পরম নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতা কি তাঁকে শান্তি দিত, নাকি নিঃসঙ্গতার অতলে ঠেলে দিত? যে অতি-কথামালার হাত থেকে বাঁচতে একদিন মানুষ ব্যাকুল হয়েছিল, আজ দিনে দিনে সেই অতিরিক্ত নীরবতাই মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় দীর্ঘশ্বাস হয়ে দাঁড়াচ্ছে।







