
পোশাকশ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একইসাথে গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচার, গ্রেফতার নিরপরাধ শ্রমিকদের মুক্তি এবং বন্ধ কারখানা চালুসহ শ্রমিকদের অধিকার ও পোশাকশিল্পের সঙ্কট নিরসনে সরকারের কাছে ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে দলটি।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পোশাকশিল্পের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের ব্যয় বাড়লেও শ্রমিকদের আয় ও জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। একজন শ্রমিকের মাসিক আয়ে নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তার অধিকার।
সরকার রোববার (১ নভেম্বর) ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং বুধবার (৪ নভেম্বর) বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজারদর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বোর্ডকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশ দিতে হবে। শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে হবে।
গাজীপুরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনায় তৌফিক শেখ (২১) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন তিনি। নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানান। একইসাথে মৃত্যুর কারণ ও ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার আহবান জানান।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যানবাহনে হামলা, লুটপাট ও উৎপাদন ব্যাহত করার কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং শিল্প ধ্বংসের অপতৎপরতা এক বিষয় নয়। কোনো কারখানা ধ্বংস করে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এতে শ্রমিক কর্মসংস্থান হারান, মালিক বিনিয়োগ হারান এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় অর্থনীতি।
চলমান শ্রম অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগসহ রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল বা অন্য কোনো গোষ্ঠী উসকানি ও নাশকতার চেষ্টা করছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করার দাবি জানান তিনি।
তবে প্রমাণ ছাড়া সাধারণ শ্রমিকদের দায়ী না করার আহবান জানিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। শ্রমিকদের আন্দোলন দমনের নামে হয়রানি, নির্যাতন ও গণগ্রেফতারের পথও পরিহার করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিজিএমইএ ও সংশ্লিষ্ট শিল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলমান পরিস্থিতিতে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সহস্রাধিক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। শত শত কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি।
এছাড়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে শতাধিক গার্মেন্টস কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদেশী ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল, সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাস এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
জামায়াতের ১৫ দফা দাবি
পোশাকশিল্পের সঙ্কট নিরসনে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ১৫ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—
১. পোশাকশ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করতে হবে। মজুরি নির্ধারণে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিতে হবে।
২. গাজীপুরে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তি দিতে হবে। আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অযাচিত বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে।
৫. গ্রেফতার নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি এবং হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
৬. রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ের কারণে শ্রমিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
৭. শ্রমিক, কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৮. সঙ্কট নিরসনে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে অবিলম্বে কার্যকর সংলাপ আয়োজন করতে হবে।
৯. নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ বা অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি, ষড়যন্ত্র ও নাশকতার চেষ্টা থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা চিহ্নিত করতে হবে।
১০. বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালুর উদ্যোগ নিয়ে শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশে কাজে ফিরিয়ে আনতে হবে।
১১. বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ এবং কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয়টি পর্যালোচনা করে তাদের পুনরায় কাজের সুযোগ দিতে হবে।
১২. শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা, ওভারটাইম ও অন্যান্য আইনগত পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।
১৩. ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালু এবং স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।
১৪. নারী শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও সুরক্ষিত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
১৫. পোশাকশিল্প, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, মালিকদের বিনিয়োগ ও জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, পোশাকশিল্পের মালিকদের শ্রমিকদের প্রতিপক্ষ নয়, শিল্পের অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে শিল্পে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আবার ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমেও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে দেশের অর্থনীতি বাঁচবে।’
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো: আবদুর রব, অধ্যক্ষ মো: শাহাবুদ্দিন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মো: সেলিম উদ্দিন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপিসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








