প্রবৃদ্ধি, বিশ্বব্যাংক
বিশ্বব্যাংক। ইন্টারনেট

তিনটি খাতের দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি আটকে আছে। আর এই গতি ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

Advertisement

সংস্থাটির নতুন ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়েছে। জ্বালানি খাতের গভীর সঙ্কট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৩.৪ শতাংশ। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম জোরদার হলে আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।

অন্যদিকে, মঙ্গলবার আগারগাওস্থ বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসে এই বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংএ এসব তথ্য জানান বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানে বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম, মূখ্য অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা এবং অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান। সঞ্চালনায় ছিলেন, সিনিয়র এক্সটার্নাল অফিসার মেহরীন আহমেদ মাহবুব। 

বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে এখনই সংস্কার এগিয়ে নেয়ার সময়। সংস্থাটির বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেসম বলেছেন, ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্রদের সুরক্ষা এবং অধিক ও উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য জরুরি সংস্কারগুলো দ্রুত এগিয়ে নেয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।

৩ খাতের দুর্বলতায় প্রবৃদ্ধি আটকা
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান দুর্বলতার কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি বড় সমস্যা- ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি সঙ্কট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ কার্যক্রম মন্থর হয়েছে, রফতানি খাতের গতি কমেছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই সাথে ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়েছে। ফলে একদিকে সাধারণ মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও উচ্চ ব্যয়ের মুখে পড়েছে। আর্থিক খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বলতার প্রভাব এখন অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতেও পড়ছে বলে প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট। রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। জিডিপির মাত্র ৮.৩ শতাংশ হারে রাজস্ব আহরণ বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর ফলে প্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় ও উন্নয়নমূলক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।

খেলাপি ঋণ ৩৩.২ শতাংশ
বিশ্বব্যাংক বলছে, দেশের ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট কতটা গভীর হয়েছে। তার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০.৬ শতাংশ থেকে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকিং খাতের এই দুর্বলতা শুধু ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে না; এর প্রভাব পড়ছে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও। ঋণপ্রবাহ দুর্বল হলে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ কমে এবং শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থান তৈরির গতিও মন্থর হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে তাই আর্থিক খাতের সংস্কারকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দেখা হয়েছে।

রাজস্ব কম, বাজেট ঘাটতি বাড়ছে
সংস্থাটি প্রতিবেদনে বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা রাজস্ব আহরণে। তাদের হিসাবে, জিডিপির ৮.৩ শতাংশ রাজস্ব আহরণ সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। এর সাথে বাজেট ঘাটতিও বেড়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির ৩.৫ শতাংশ থেকে বাজেট ঘাটতি ২০২৬ অর্থবছরে বেড়ে ৩.৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। রাজস্ব আহরণ কম থাকায় সরকারকে একদিকে প্রয়োজনীয় ব্যয় চালাতে হচ্ছে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সরকারি বিনিয়োগের জন্য অর্থের সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। ফলে সীমিত রাজস্ব পরিসর অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকেও বাধাগ্রস্ত করছে। অর্থনীতিকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হলে শুধু ব্যয় কমানো নয়, বরং রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার আরও কার্যকর করার দিকে নজর দিতে হবে বিশ্বব্যাংক তাদের পর্যবেক্ষণে প্রকাশ করেছে।

দারিদ্র্য বাড়ছে, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক মন্থরতার সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। ২০২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও থমকে গেছে। বিশেষ করে নারীরা কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, যখন সেই প্রবৃদ্ধির সাথে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং আয় বাড়ে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে, অন্যদিকে বিদ্যমান আয়ের প্রকৃত মূল্যও কমেছে।

সামাজিক নিরাপত্তায় বড় ঘাটতি
বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ প্রতি বছর তার জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করে। সামাজিক সহায়তার আওতাও বেড়েছে- ২০১০ সালের ২৪.৬ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ৩৭.৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই এখনো কোনো ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতার বাইরে। অর্থাৎ সরকারি ব্যয় বাড়লেও প্রয়োজনের জায়গায় সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। সুবিধাভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়া বা ‘টার্গেটিং’ আরো উন্নত করা গেলে একই ধরনের সরকারি ব্যয়ে দারিদ্র্য বিমোচনের ফল অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

ফ্যামিলি কার্ডে ২৮.৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য রক্ষা সম্ভব
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। খাদ্য-সংক্রান্ত একাধিক ভর্তুকি একত্রিত করা এবং বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির ক্ষেত্রে উন্নত সুবিধাভোগী নির্বাচনের সাথে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সমন্বয় করা হলে আরো ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার উপরে নিয়ে আসা সম্ভব হতে পারে। বার্তায় বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১৫.৮ থেকে ২৮.৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। খাদ্য ও নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলো একত্রিত করার পাশাপাশি সুবিধাভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়া আরো উন্নত করলে এর সুফল বাড়তে পারে।

ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রির ওপর গুরুত্ব
দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সঠিক সময়ে সঠিক সহায়তা দেয়ার জন্য ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এটি এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা এবং তাদের ক্রমাগত তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি করা যায়। বিশ্বব্যাংকের মতে, ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি, ফ্যামিলি কার্ড এবং অন্যান্য সহায়তা কর্মসূচি- যেমন কৃষক কার্ড ও ভর্তুকি- পরস্পরের সাথে যুক্ত করা গেলে সঙ্কটের সময়ে দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত সেবা পৌঁছে দেয়ার সরকারি সক্ষমতা বাড়বে।

সংস্থাটির পরামর্শ, সাধারণ বা ব্যাপক ভর্তুকি পুরোপুরি বন্ধ না করে এর ধরন পরিবর্তন করা। ব্যাপক ভর্তুকির পরিবর্তে এমন লক্ষ্যভিত্তিক ও সঙ্কট-সহনশীল সহায়তা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যা তুলনামূলক কম আর্থিক ব্যয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে পারে।

বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তি
দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে নানা চাপ থাকলেও বৈদেশিক খাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিস্থাপক রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতি। তবে বৈদেশিক খাতের এই স্বস্তি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণ ও কর্মসংস্থানের মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে কাঠামোগত সংস্কার না হলে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা কঠিন হবে বলে প্রতিবেদনের সার্বিক বিশ্লেষণে ইঙ্গিত রয়েছে।