রোবট,  শিক্ষা নিচ্ছে, মানবাকৃতির, যন্ত্রমানব,চীন,
আইসক্রিম পরিবেশন করছে রোবট। সংগৃহীত

‘পাখি সব করে রব, রাতি পোহাইল।
কাননে কুসুমকলি, সকলি ফুটিল।।
রাখাল গরুর পাল, ল’য়ে যায় মাঠে।
শিশুগণ দেয় মন, নিজ নিজ পাঠে।

Advertisement

 

কবিতার এই চেনা দৃশ্যের সঙ্গে এবার যোগ হতে পারে নতুন এক দৃশ্য। তবে এখানে যারা স্কুলে যাচ্ছে, তারা শিশু নয়। মানুষও নয়। তারা মানবাকৃতির রোবট। তাদের জন্যই স্কুল খুলেছে চীনের প্রযুক্তিনগরী শেনজেনে। সেখানে সিনায় সিনায় পড়া মুখস্থ করানো হয় না। শেখানো হয় বাস্তব জীবনের কাজ। কীভাবে পানির বোতল তুলতে হয়, ছড়িয়ে থাকা কাপড় গুছিয়ে রাখতে হয়, কাপড় ভাঁজ করতে হয় কিংবা মানুষের নড়াচড়া অনুসরণ করতে হয়—এসবই তাদের পাঠ্য।

চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া বুধবার (২৮ অক্টোবর) জানায়, দক্ষিণ চীনের কুয়াংতুং প্রদেশের শেনজেনে বাস্তব জীবনের কাজে রোবটকে দক্ষ করে তুলতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

গত মাসে চালু হয়েছে ‘জুবাওপেন এমবডিড এআই ইনোভেশন কমিউনিটি’। এখানে বিভিন্ন পরিবেশে রোবটের তথ্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা করা হয়। নামটির চীনা অর্থের ভাবার্থ হলো, যেখানে বুদ্ধিমত্তার সম্পদ এক জায়গায় জমা হয়। বাওআন জেলার এমবডিড ইন্টেলিজেন্স হাবের অংশ এই কেন্দ্রটি রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি উন্মুক্ত প্রশিক্ষণকেন্দ্র।

স্কুলের বিভিন্ন জায়গায় বিছানা, তাক ও বাথরুম সাজানো রয়েছে। কোথাও রোবট পানির বোতল বারবার তুলছে, আবার নামাচ্ছে। কোথাও ছড়িয়ে থাকা কাপড় কুড়িয়ে লন্ড্রির ঝুড়িতে রাখছে। বসার ঘর ও রান্নাঘরের অনুকরণে তৈরি পরিবেশে প্রযুক্তিবিদেরা ঘরের কাজ করেন। পাশেই রোবটগুলো তাঁদের নড়াচড়া অনুসরণ করে। প্রতিটি গতিবিধির তথ্য নিখুঁতভাবে রেকর্ড করা হয়।

এসব তথ্য যাচাই, পরিশোধন ও শ্রেণিবদ্ধ করে রোবটের শেখার উপযোগী ‘পাঠ্যবই’ তৈরি করা হয়। এরপর বাস্তব পরিবেশে তাদের দক্ষতা পরীক্ষা করা হয়। বোতল তোলা, কাপড় গুছিয়ে ভাঁজ করা এবং সাবলীলভাবে চলাফেরার মতো কাজগুলো কতটা ভালোভাবে করতে পারছে, তা দেখা হয়। ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে আবার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

মানুষের চলাফেরা নকল করছে

 

শেনজেনের ফাইসেন এআই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হুয়াং ঝিশেন বলেন, ‘এই স্কুলে বাস্তব কাজের পরিবেশেই তথ্য সংগ্রহ করা যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা করে দেখা যায়, তা কাজে লাগছে কি না। এতে তথ্য সংগ্রহের ব্যয় অনেক কমে যায়।’

শেনজেনের রোবটশিল্পে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটছে। ২০২৫ সালে সেখানে মানবাকৃতির রোবটের উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ৮৩ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৪০০টিতে পৌঁছায়। একই বছর রোবটশিল্পের মোট উৎপাদনমূল্য ২০ শতাংশের বেশি বেড়ে ২৪ হাজার কোটি ইউয়ান ছাড়িয়ে যায়। এর পরিমাণ প্রায় ৩৫৭০ কোটি মার্কিন ডলার।

শেনজেনে এই শিল্পের পুরো উৎপাদনশৃঙ্খলে যুক্ত ১ হাজার ১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শুধু বাওআন জেলাতেই এআই ও রোবট নিয়ে কাজ করছে ৬০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান।

ছয় হাজার বর্গমিটারের বেশি জায়গাজুড়ে থাকা রোবট স্কুলটিতে ছয়টি ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে আছে স্মার্ট বাড়ি, মানুষের চলাচলের তথ্য ধারণ, বয়স্কদের সেবা, নতুন ধরনের খুচরা বিক্রি, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন এবং বিজ্ঞানের গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার।

রোবট দৌড়

 

প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বাইরেও খেলাধুলার মাঠ, বয়স্কদের সেবাকেন্দ্র, সেমিকন্ডাক্টর কারখানা ও বাণিজ্যিক এলাকায় রোবটের কাজ পরীক্ষা করা হয়। এতে তথ্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণের পরিবেশ উন্নত করা এবং রোবটের মডেলকে আরো দক্ষ করে তোলার সুযোগ তৈরি হয়। চীনের কুয়াংতুং-হংকং-ম্যাকাও বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এখান থেকে তথ্য সংগ্রহ, অ্যালগরিদম প্রশিক্ষণ, মডেল উন্নয়ন ও পণ্য পরীক্ষার সেবা পায়। এতে গবেষণা ও উন্নয়নের ব্যয় কমে এবং পণ্য বাজারে আনার সময়ও কমে আসে।

শেনজেন রোবটিকস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব তান ওয়েইজিয়া বলেন, রোবটশিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন ধারণা বা প্রযুক্তিগত সাফল্য অর্জন নয়। পরীক্ষামূলক মডেল থেকে প্রকৌশলগত প্রয়োগ, তারপর বড় পরিসরে উৎপাদনে পৌঁছানোই কঠিন কাজ।

বাওআন জেলার বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন ব্যুরোর উপমহাপরিচালক ঝাং শুতাওয়ের মতে, রোবটের বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য কোটি কোটি ঘণ্টার প্রশিক্ষণ-তথ্য প্রয়োজন। জুবাওপেন সেই তথ্যের ঘাটতি পূরণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ের প্রযুক্তি উদ্যোগগুলোকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে। উচ্চ গবেষণা ব্যয়, বিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ-পরিবেশ এবং সংগৃহীত তথ্য পুনর্ব্যবহারের জটিলতা কমাতেও এই উদ্যোগ ভূমিকা রাখছে।

এভাবেই তৈরি হবে রোবট কর্মীবাহিনী। ঘরে যেসব গৃহকর্ত্রীকে প্রতিদিন ঘরের কাজ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়, কিংবা অফিসে যেসব বস কর্মীদের নিয়ে নানা ঝামেলায় পড়েন, তাঁদের জন্য একদিন হাজির হতে পারে অনুগত রোবট কর্মী। ঘরের কাজ করা, জিনিসপত্র গোছানো, মালপত্র বহন করা কিংবা কারখানায় নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন—সবই থাকবে তাদের কাজের তালিকায়। ছুটি, বেতন কিংবা কাজ ফাঁকি নিয়ে দর-কষাকষির ঝামেলাও থাকবে না। তবে এসব রোবটকে কতটা দক্ষ করে তোলা যাবে, তা নির্ভর করবে তাদের প্রশিক্ষণ ও বাস্তব পরিবেশে কাজ করার সামর্থ্যের ওপর।

জুবাওপেনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ওয়াং মাওলিন জানান, ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের কার্যক্রম কারখানা, বাড়ি ও দোকান পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়া হবে। সেখানে রোবট তথ্য সংগ্রহ করবে এবং বাস্তব কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদের দক্ষতা যাচাই করবে। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহ, মডেল প্রশিক্ষণ ও বাস্তব প্রয়োগের কার্যকারিতা যাচাইয়ের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র হয়ে উঠবে জুবাওপেন।

রবীন্দ্রনাথের কবিতায় শিশুরা পাঠে মন দেয়, রাখাল গরুর পাল নিয়ে মাঠে যায়। আর শেনজেনের এই স্কুলে মানুষের মতো দেখতে যন্ত্রমানবেরা শিখছে মানুষেরই কাজ। পার্থক্য হলো, কবিতার শিশুরা বই খুলে পড়তে বসে, আর রোবটদের পাঠ চলে বাস্তব কাজের মধ্য দিয়ে। সেই পাঠ শেষ হলে তাদের জায়গা হবে হয়তো কারখানায়, দোকানে, অফিসে, এমনকি মানুষের ঘরেও। তখন ‘শিশুগণ দেয় মন, নিজ নিজ পাঠে’র চেনা দৃশ্যের পাশে দেখা যাবে আরেক দৃশ্য—রোবট কর্মীরা ব্যস্ত নিজেদের কাজে।