সৌন্দর্য, কচুরিপানা, আপদ, ভিক্টোরিয়া হ্রদ
কচুরিপানা সৌন্দর্যের নামে আপদ! । সংগৃহীত

কচুরিপানার আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অববাহিকা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে শোভাবর্ধক ফুলের গাছ হিসেবে এটি বাংলায় আনা হয়। তবে কে প্রথম এনেছিলেন এবং কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

Advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ইফতেখার ইকবালের ২০০৯ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জের স্কটিশ পাট ব্যবসায়ী জর্জ মরগ্যান বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেরার পথে কচুরিপানার ফুল ও পাতার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এটি নিয়ে আসেন। আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, ১৮৯০-এর দশকে ব্রাজিল থেকে কচুরিপানা কলকাতার উদ্ভিদ উদ্যানে আনা হয়। পরে কয়েকজন নারী ফুলের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে সেখান থেকে গাছ নিয়ে ঢাকায় নিজেদের বাগানে লাগান।

সৌন্দর্যের জন্য আনা এই উদ্ভিদই একসময় আপদ হয়ে দেখা দেয়। তবে এ সমস্যায় শুধু বাংলাদেশ বা এ অঞ্চলের মানুষ ভুগছেন না। কচুরিপানা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের ৫৩টি দেশে। আফ্রিকার ভিক্টোরিয়া হ্রদের তীরের প্রায় ৯০ শতাংশ একসময় ঢেকে ফেলেছিল এই উদ্ভিদ। এর কারণে বছরে আনুমানিক ১৫ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে অঞ্চলটির।

কচুরিপানা ঢাকা জলাশয়

হিন্দুস্তান টাইমস শনিবার (১০ অক্টোবর) জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক গবেষণায় কচুরিপানার এই বিস্তারের চিত্র উঠে এসেছে। হালকা বেগুনি রঙের ফুলের জন্য একসময় বাগানের পুকুরে শখ করে লাগানো হতো গাছটি। কিন্তু ফেলে দেয়া কচুরিপানা সেখান থেকে আশপাশের জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। নাসার আর্থ অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, অনুকূল পরিবেশে মাত্র ৬ থেকে ১৮ দিনের মধ্যে এর বিস্তৃতি দ্বিগুণ হয়ে যায়।

দক্ষিণ আমেরিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল থেকে ১৮৭৯ সালের দিকে কচুরিপানা আফ্রিকায় আনা হয়। প্রায় ১১০ বছর পর এটি ভিক্টোরিয়া হ্রদে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮৯ সালে প্রথম হ্রদটিতে কচুরিপানার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়।

আফ্রিকার বৃহত্তম হ্রদ ভিক্টোরিয়া তানজানিয়া, কেনিয়া ও উগান্ডার মধ্যে অবস্থিত। আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির হ্রদ। কচুরিপানার ঘন স্তর পানির নিচে সূর্যের আলো পৌঁছাতে বাধা দেয়। এতে জলজ উদ্ভিদ, মাছ ও ব্যাঙ অক্সিজেনের সংকটে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মারা যায় বিপুলসংখ্যক প্রাণী। হ্রদে ছোট মাছ ধরার নৌকা চালানোও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ ছাড়া সেচের খাল ও শহর-গ্রামে পানি সরবরাহের পাইপ আটকে দেয় কচুরিপানা। মৎস্যসম্পদ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্যও এটি হুমকি হয়ে উঠেছে।

নাসার হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৮ সাল নাগাদ ভিক্টোরিয়া হ্রদের প্রায় ২০ হাজার হেক্টর এলাকা কচুরিপানায় ঢেকে গিয়েছিল, যা প্রায় ৭৭ বর্গমাইলের সমান।

বাংলাদেশেও কচুরিপানার ক্ষতি নিয়ে গবেষণা হয়েছে। পাবনার গজনার বিলে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কচুরিপানা পরিষ্কার করতে একজন কৃষক পরিবারের গড় ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার ৯৬০ টাকা, যা পরিবারের মোট আয়ের গড়ে ৭ শতাংশ। ২০২১ সালে জরিপ করা জমির ৩২ শতাংশে কচুরিপানা পাওয়া যায়; ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ শতাংশে। কচুরিপানা নিয়ন্ত্রণে ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে ফসল উৎপাদনের মোট লাভের হিসাবের গড়ে ১৫ শতাংশ ব্যয় করতে হয়েছে।

কচুরিপানার দাপটে বাংলাদেশে একটি অঞ্চলে নৌপথ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল

তবে বাংলাদেশের জন্য কচুরিপানার কারণে বছরে মোট কত টাকার ক্ষতি হয়, তার নির্ভরযোগ্য জাতীয় হিসাব পাওয়া যায়নি। কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও পানি নিষ্কাশনে ক্ষতির হিসাব একসাথে না করলে এর প্রকৃত আর্থিক প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন।