
হাওরাঞ্চল হচ্ছে বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডারের একটি। এ জন্য হাওরাঞ্চল আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিশেষ করে হাওরের উৎপাদিত বোরো ধান দেশের চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে অতুলনীয় ভূমিকা রাখে। কিন্তু এবার বোরো মৌসুমে কিশোরগঞ্জের হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার ধান আগাম বন্যায় তলিয়ে গেছে। সেখানকার অনেক কৃষকের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বর্ষার ঢল ও অতিবৃষ্টির ক্ষত কাটিয়ে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকরা যখন আশায় বুক বেঁধে রবিশস্য আবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই সারের সঙ্কট তাদের সেই প্রত্যাশায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
নিকলীসহ হাওরের একাধিক উপজেলার জমি থেকে পানি নেমে চাষের উপযোগী হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার, বিশেষ করে ইউরিয়া ও ফসফেটের অভাবে প্রস্তুতকৃত জমিতে বীজ বপন করা সম্ভব হচ্ছে না। সময়মতো সার না পাওয়ায় রোদে জমির আর্দ্রতা কমে মাটি শক্ত হয়ে যাচ্ছে; যা হাওরের ওই এলাকার রবিশস্যের উৎপাদন ও সার্বিক কৃষি অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে।
নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট যে, সমস্যাটি বহুমাত্রিক। একদিকে ডিলারদের কাছ থেকে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে প্রতি বিঘায় পর্যাপ্ত সার বরাদ্দের অভাব ও খুচরা বাজারে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির খবর। এসব কারণ হাওরাঞ্চলের সাধারণ কৃষকের দুশ্চিন্তা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও দীর্ঘ ছুটি বা বরাদ্দের প্রশাসনিক বিলম্বকে সঙ্কটের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবু মাঠপর্যায়ে কৃষি বিপণন ও তদারকির দুর্বলতাও এখানে প্রতিভাত হচ্ছে। অন্যদিকে ডিলারদের একাংশের মতে, কৃষকদের অতিরিক্ত সার ব্যবহারের প্রবণতা চাহিদায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে। এ কথা আংশিক সত্য হলেও, সঙ্কটমুহূর্তে পর্যাপ্ত ও সুষম সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব প্রশাসন এড়িয়ে যেতে পারে না।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে টিকে থাকা হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকের জমি তৈরি থাকার পরও শুধু সারের অভাবে পিছিয়ে পড়া কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বিলম্বে বীজ বপন করলে রবি ফলন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে, যা কৃষকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহে প্রভাব ফেলবে।
হাওরাঞ্চলে সারসঙ্কট মোকাবেলায় সময়ক্ষেপণ না করে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে আমরা মনে করি। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনকে কালবিলম্ব না করে হাওরের কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ইউরিয়া ও টিএসপি/ফসফেট সার পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। বাজার নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণেও নজর দেয়া। খুচরা বাজারে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি রুখতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা। যাতে কোনো অসাধু চক্র সঙ্কট পুঁজি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটতে না পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত সার ব্যবহারের অপকারিতা এবং সুষম সার ব্যবহারের নিয়মাবলি সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করতে মাঠপর্যায়ের কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তাদের তৎপরতা বাড়াতে হবে।
হাওরের কৃষকের পরিশ্রম ও শ্রম-ঘাম যেন প্রশাসনিক ধীরগতি কিংবা অসাধু চক্রের কাছে বন্দী হয়ে না যায়। তারা যেন অসহায় হয়ে না পড়েন। রবিশস্যের ভালো ফলন ও কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষায় দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেয়াই হবে এ মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট মাঠপ্রশাসনের অগ্রাধিকার।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








