
গত এক বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। দারিদ্র্যের হার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলিত ১৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সব শেষ হিসাব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থার ঢাকা অফিস গত মঙ্গলবার ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট : মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোস্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়— ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে বেড়েছে আয়বৈষম্য।
বিশ্বব্যাংকের মতে দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ— অর্থনৈতিক মন্দা, শিল্পায়নে মন্থরতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থবিরতা। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক বছরের ব্যবধানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান কমেছে।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী— ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমছে। এর কারণ দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার সাথে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগ কমেছে, রফতানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়ে পড়েছে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এই দুর্বলতার বড় প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যে।
বিশ্বব্যাংক যেসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে এবং যেসব সুপারিশ করেছে সেগুলোর একটিও নতুন নয়। দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সবসময়ই এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, সমাধানের সম্ভাব্য উপায় নির্দেশ করেছেন। অর্থনীতিতে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর এবং স্বৈরাচারের সাড়ে ১৫ বছরের নির্বিচার অপশাসনের প্রভাব অস্বীকারের উপায় নেই। অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলে বিবেচিত ব্যাংক খাত ধ্বংসের পুরো দায় ওই শাসকদের ওপর বর্তায়।
চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের সমন্বিত এক রূপরেখা তৈরি করা হয়। দেশের সব অংশীজনের সাথে ব্যাপকভিত্তিক আলোচনা ও সংলাপের ভিত্তিতে প্রণীত অন্তর্বর্তী সরকার সেই রূপরেখা প্রণয়ন করে। আজ বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে ঠিক সেই সংস্কারের ওপরই জোর দেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা এবং নতুন ও ভালো কর্মসংস্থান তৈরির জন্য সংস্কার জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমান নির্বাচিত সরকারের; কিন্তু সরকার সংস্কারের বিষয়ে কতটা আন্তরিক তা এখনো অস্পষ্ট।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে সংস্কারের সুপারিশ ছাড়াও বাস্তব করণীয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে— সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতাধীন একাধিক খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকি কর্মসূচি একীভূত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের সাথে বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচি যথাযথভাবে সমন্বয় করা হলে অতিরিক্ত সাড়ে ২৮ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব।
মূলত ২০১৯-২০ সালের বিপর্যয়কর কোভিড মহামারীর সময় থেকেই বাংলাদেশে গরিবির হার বৃদ্ধির প্রবণতা শুরু হয়। আর্থিক খাতে সংস্কার ও শত ভাগ সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া উত্তরণের কোনো উপায় নেই। এই বাস্তবতা সরকার যত দ্রুত অনুধাবন করবে দেশ ও জাতির জন্য ততই মঙ্গল।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








