দায়িত্বে অবহেলার সংবাদ প্রকাশ না করতে ইউএনওর অনুরোধ 
ইউএনও মুন্নী ইসলাম। ছবি সংগৃহীত

কুমিল্লা ব্রাহ্মণপাড়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উপস্থিত না হওয়ায় রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শন (গার্ড অব অনার) ছাড়াই দাফন করা হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারকে (৭৮)। সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেয়া হয়না জানিয়ে এ ঘটনায় সংবাদ প্রকাশ না করতে গণমাধ্যমকে অনুরোধ করেন ইউএনও মুন্নী ইসলাম। 

Advertisement

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ইউএনও মুন্নী ইসলাম বলেন, ‘সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেয়া হয় না। তারপরও আমরা প্রস্তুত নিয়েছিলাম, কিন্তু ঢাকা থেকে লাশ আনা নিয়ে দ্বিধা ছিল। মাগরিবের পর কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করেনি, তাই গার্ড অব অনার দেয়া সম্ভব হয়নি।’ 

এসময়, ইউএনও মুন্নী ইসলাম ব্রাহ্মণপাড়া তথা কুমিল্লার সম্মান বিবেচনায় এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করা না করতে গণমাধ্যমকর্মীদের অনুরোধ জানান।

Advertisement

এর আগে, বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকা তিনি মারা যান। ওই দিন ঢাকায় প্রথম জানাজা শেষে তার লাশ বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ব্রাহ্মণপাড়া সদর ইউনিয়নের মহালক্ষ্মী পাড়া গ্রামে তার নিজ বাড়িতে আনা হয়। পরে, সন্ধ্যা ৬টার দিকে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার (ছবি সংগৃহীত)

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার (ছবি সংগৃহীত)

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের পক্ষ থেকে এ বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করা হয়। পরিবার, এলাকাবাসী ও পুলিশ সদস্যরা ইউএনওর জন্য অপেক্ষার পর তিনি না আসায় গার্ড অব অনার ছাড়াই এ বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন সম্পন্ন করা হয়। এ ঘটনায় কুমিল্লাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন ২০১৮ ও বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শন আদেশ ২০২০ অনুযায়ী, বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শনের জন্য উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও বা তার অনুপস্থিতিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরকারের প্রতিনিধিত্ব করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আদেশের গেজেটে গার্ড অব অনার দেয়ার ক্ষেত্রে দিন বা রাতের কোনো সময়ের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ নেই।

মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার (৭৮) দীর্ঘ কর্মজীবনে যোগাযোগ ও আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। বার্ধক্যের শেষ দিনগুলো তিনি ঢাকায় ছেলের কাছে কাটিয়েছিলেন।  

মরহুমের ভাই শাহজাহান আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম আমার ভাইকে শেষ সম্মানটুকু জানিয়ে চিরবিদায় দিতে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। আমরা আজ লজ্জিত, যে মানুষটি ৯ মাস অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে, দেশের স্বাধীনতায় অবদান রেখেছে, মৃত্যুর পর সে তার প্রাপ্য সম্মানটুকুও পেল না।’

স্থানীয় মহালক্ষ্মী পাড়া গ্রামের আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মোল্লা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেয়া না গেলে অন্তত প্রশাসনের লোক এসে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে যেতে পারত, কিন্তু তাও করা হয়নি। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সহযোদ্ধার এমন অমর্যাদা সহ্য করার মতো নয়।’

ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া মাস্টার জানান, প্রশাসনের সাথে তারা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করে গার্ড অব অনার ও সশস্ত্র সালামের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ঢাকা থেকে লাশ আসতে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় ইউএনও মুন্নী ইসলাম সন্ধ্যার পর নাকি গার্ড অব অনার দিতে অপারগতা জানান।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহিরুল হক বলেন, ‘আমি মরহুমের জানাজায় উপস্থিত ছিলাম। তাকে গার্ড অব অনার না দেয়ায় পুরো এলাকায় তীব্র সমালোচনার চলছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।’

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: ফারুক হোসেন জানান, ‘আমরা গার্ড অব অনারের জন্য পুরো এক পিকআপ পুলিশ পাঠিয়েছিলাম এবং বিউগলের সুর বাজানোর জন্য কুমিল্লা পুলিশ লাইন থেকে বাদক দলও এসেছিল। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ উপস্থিত না থাকায় পুলিশ গার্ড অব অনার দিতে পারেনি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে আমরা জানাজায় অংশ নিয়েছি।’