
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ও কয়েক দিনের সংঘর্ষ-ভাঙচুরের পর পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চললেও কিছু কারখানা এখনো বন্ধ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ১০টা পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। কোথাও সংঘর্ষ, ভাঙচুর কিংবা বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কঠোর অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে।
গত কয়েক দিনের ভাঙচুর ও নাশকতার ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নাশকতায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’
বুধবার রাতে শতাধিক বখাটে ও বহিরাগত দুষ্কৃতকারী জেলার শ্রীপুর গড়গড়িয়া মাস্টার বাড়ি এলাকায় কয়েকটি পোশাক কারখানায় ভাংচুর চালায় এবং শ্রমিকদের বের করে কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের চেষ্টা করছে বলে শ্রীপুর থানা সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গতিবিধির ওপর স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরাও নজর রাখছেন। শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে নাশকতা ও ভাঙচুরে জড়িত করার চেষ্টা ঠেকাতে শিল্পকারখানার আশপাশে তাদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে। কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈর ও টঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীরা শ্রমিকদের কাজে ফেরাতে এবং শিল্পকারখানার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে তৎপর রয়েছেন।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের এসপি জানান, অধিকাংশ কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু কারখানা বৃহস্পতিবারও বন্ধ রাখা হয়েছে।
ভোগড়া বাইপাস এলাকার এক পোশাকশ্রমিক নিজের নাম ও কর্মস্থলের পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, সবাই বুঝে গেছে এটা কিসের আন্দোলন। তাই সবাই রুজি-রুটির কাজে মনোযোগ দিয়েছে। যে হাত শিল্পের চাকা বন্ধ করতে চায়, নিজের রিজিকের পবিত্র স্থান কারখানায় ভাঙচুর চালায়, সেই হাত কোনো শ্রমিকের হতে পারে না। সেটা দুষ্কৃতকারী ও সন্ত্রাসীদের হাত।
দেশের কলকারখানা রক্ষায় শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কারখানা বন্ধ হলে ক্ষতি হবে শ্রমিকদের, উসকানিদাতাদের নয়। তার মতে, শ্রমিকদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বাড়ির মালিকদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি সরকারিভাবে যৌক্তিক ও সহনীয় বাড়িভাড়া নির্ধারণের দাবি তোলা প্রয়োজন।
এদিকে গাজীপুর, মিরপুর, আশুলিয়া ও সাভারে শ্রমিক আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টির পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। বুধবার নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, গাজীপুরে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের অনুসারীরা এবং মিরপুর, আশুলিয়া ও সাভারে আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচির অর্থায়নে শ্রমিক আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। তার অভিযোগ, জাহাঙ্গীর আলমের অর্থায়নে অনুসারীরা শ্রমিক সেজে গাজীপুরে তাণ্ডব চালাচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাশেদ খাঁন তার পোস্টে আরো দাবি করেন, পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং জানুয়ারি মাসের বেতনের সাথে শ্রমিকরা নতুন মজুরি পাবেন। এ বিষয়ে মালিক ও শ্রমিক নেতারা একমত হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তার ভাষ্য, এরপরও আন্দোলন অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও শিল্পকারখানার নিরাপত্তা রক্ষায় সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
উল্লেখ্য, এস এম মান্নান কচি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি। জাহাঙ্গীর আলম গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র।
শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্দোলন নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাদমা গ্রুপের পরিচালক এইচ এম শাকোত ইমরান। তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং তাদের বেতন বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক। শ্রমিকদের দাবির প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল। সরকার গঠিত মজুরি বোর্ডে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধি রয়েছেন। বোর্ড সম্মিলিতভাবে যে মজুরি নির্ধারণ করবে, তারা তা মেনে নেবেন।’
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বা কর্মবিরতির অধিকার রয়েছে। কিন্তু ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ, দোকানপাটে আগুন দেয়া কিংবা যানবাহন ভাঙচুর শ্রমিকদের কাজ হতে পারে না।’
এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে তিনি অভিযোগ করেন, সাদমা গ্রুপের কারখানায় শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলেও বাইরে থেকে ফোন আসার পর তাদের কেউ কেউ বেরিয়ে যান। অন্য কারখানার লোকজন এসে হামলা ও ভাঙচুরের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘শ্রমিক বাঁচলে আমি বাঁচব, শ্রমিক বাঁচলে আমার ফ্যাক্টরি বাঁচবে, আমার ফ্যাক্টরি বাঁচলে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল হবে।’
শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কারখানার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ও প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা কামনা করেন তিনি। একই সাথে শ্রমিকদের ধৈর্য ধরে মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানান।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








